একটা এড ছিল, গ্রামীণ ফোনের বোধহয়,
"স্বপ্ন যাবে বাড়ি আমার
পথও দেব পাড়ি তোমার
কাছে যাব ফিরে বারে-বার..."
ঈদের মৌসুমে খুব আমেজ এনে দিত হাবিবের গলায় গাওয়া এই এডটা।
দল বেঁধে পারিবার-পরিজন নিয়ে নাড়ির টানে বাসে, ট্রেনে, লঞ্চে, প্লেনে করে বাড়ির পানে, শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে পালিয়ে মানুষের হুলুস্থূল হয়ে ছোটার যে তীব্র আকাঙ্খা, আকুলতা, সেইটা যেন হাড়ে হাড়ে অনুভব করিয়ে দিত এই গান।
বন্ধু-বান্ধবরা যখন দোল বেঁধে বাক্স-পেটরা নিয়ে স্বপ্নের সাথে ভেসে বাড়ি যেত, আমি বাড়িতে বসে স্বপ্নালুদের কথা ভাবতাম।
তখন গানটার সুরটাই ভালো লাগতো কিন্তু যাকে বলে জীবন থেকে নেয়া মর্মটা উপলব্দিতে আসেনি। কারণ এমনকি পড়াশুনার জন্যও আমাকে বাড়ির চৌহদ্দি পেরোতে দেয়নি।
তাই আমার স্বপ্ন কখনো বাড়ি যায়নি আগে।
যে স্বপ্ন বাড়িই ছাড়েনি কখনো সে বাড়ি ফিরবেইবা কিরূপে!
যখন চাকরি নিয়ে বাড়ি ছাড়লাম তখন আমার স্বপ্ন বাড়ি যেতে পারতো, কিন্তু যায়নি তখনও, বহুবছর ধরে।
বাড়ি হলেই সেটা কি সবসময় ঘর হয়?
হয়না।
ঘর হলে সেখানে "ফিরে ফিরে" যাবার আকুলতা থাকে, না ফিরতে পেরে মন ব্যাকুল হয়, মনের অসুখ হয়।
আমার হয়নি কিছুই, হবার কারণও ছিলোনা।
আমার বাড়ি ছিল, বিশাল বাড়িতে মানুষও ছিল, উৎসবও ছিল, আমেজও ছিল, কিন্তু কেবল ঘর ছিলোনা।
না আসলে, তার অভ্যন্তরে যে ঘর ছিল সেখানে যাওয়ার কথা আমি অবচেতনভাবেও ভেবে দেখিনি কখনো, অতসব অবহেলা আর অনাচারের দায়ে।
আমাদের নৈবৃত্তিক মান-অভিমান জমে যে পাহাড় হয়েছিল, সে পাহাড়ের কোল ঘেঁষেই অবস্থান নিয়ে থেকেছি। এই নানাবিধ আর্থ-সামাজিক ঘনঘটার মাঝে একদিন সে বাড়ি থেকে আমার একান্ত ঘরটিকে বের করে নিয়ে আমি দেশান্তরী হলাম।
ঘরকে বললাম, আমি যা খাবো, তুইও তা খাবি, যেখানে থাকবো সেখানেই থাকবি।
যাবি আমার সাথে, দেশান্তরি হবি?
ঘর বললো যাবো।
না যেয়ে কি করবো, তুই ছাড়া আর এখানে থাকার অর্থ কি।
আমি বাড়ির মধ্যিখান থেকে ঘর তুলে নিয়ে এসে আবার ঘর বাঁধলাম।
"...একচালা টিনের ঘর,
আমি এক যাযাবর,
তবু বানাই ঘর।"
ভাঙা ঘরে নতুন করে ভালোবাসা, বন্ধন জুড়লাম, ক্ষমা করবার কারণ পেলাম, উদার হলাম। জানলাম অভিমানে সব পুড়িয়ে দেয়া যতটা সহজ, পুনঃরায় জুড়িয়ে নেয়া ততটা সহজ না।
পুড়িয়ে দিলেতো দেয়াই যায়, তাই আরেকবার জুড়ে নেবার চিন্তা করলাম।
অনেকটা হেঁটে এসে দেখলাম, সম্পর্ক যখন বিধান হয়ে যায়, তখন সেটা ধরে রাখাটাই কঠিন, ছেড়ে দেয়াটাই সোজা। স্বাধীনতার মতো।
অথবা এমন হয়, যখন ছেড়ে দিব না ধরে রাখবো ক্ষমতটা নিজের হাতে চলে আসে, যখন অপরাজিত মনে হয়, তখনই না ছেড়ে ধরে রাখার প্রচেষ্টাটার সত্যিকার আনুগত্য প্রকাশ পায়।
কিন্তু এই যে এত বছর কেটে গেলো, আমার স্বপ্ন বাড়ি যেতে পারেনি কখনো।
এই প্রথম।
স্বপ্ন আমার বাড়ি যাচ্ছে।
যাচ্ছে ঈদের দিন সকাল বেলা।
ঝড়ে উড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে।
স্বপ্ন যাচ্ছে পথ চেয়ে বসে থাকা আমার ঘরে।
সারা জেগে কাজ করে, নির্ঘুম তবুও উচ্ছ্বাস স্বপ্ন ছুটছে বাতাসের সাথে।
বাবা, মা, নানুর কাছে।
আবার সেই অফিসের আরেক শাখা থেকে শৈল, আমার প্রিয়তমা উড়ে এসে বিদায় জানিয়ে গেলো!
কতবছর পর ঈদ কার্ড পেলাম ওর কাছ থেকে!
স্বপ্ন, আবেগ, পূর্ণতার প্রাপ্তিতে ভেসে যাই।
ততদিন ভালো থেকো যান্ত্রিকতাবাদী-প্রেমিক আমার।
চিন্তা করছি, এই ঈদের সকালে যাচ্ছিতো বটে, আদৌ কোনো গাড়ি-ঘোড়া পাবো নাকি এয়ারপোর্টেই বসে থাকতে হবে আধ বেলা। আজকে ড্রাইভার যা ভাড়া চাইবে তাই দিব, দর কষাকষি করবোনা মাছের বাজারের মতো।
কারণ আজকে স্বপ্নর বাড়ি যাবার দিন।
আশা করি আপনাদের সবার স্বপ্ন বাড়ি যাচ্ছে, গেছে।
এবার না হলেও, আগে গিয়েছে, পরে যাবে আবারও।
ঈদ মোবারাক 😊
All the contents are mine, until it’s mentioned.