বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি), বিশ্ববিদ্যালয় বললে যেন একটু ভুলই বলা হবে। এর নাম হওয়া উচিত ছিল বাংলাদেশ কৃষি কিন্ডার গার্ডেন স্কুল। সকাল ৮ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত ত্বত্তীয় ক্লাস, ১.৩০ থেকে ৪.৩০ পর্যন্ত ব্যাবহারিক ক্লাস। আবার অ্যাসাইনমেন্ট, ব্যাবহারিক খাতা, ক্লাস পরীক্ষা তো আছেই। এই নিয়ম মাফিক রুটিন একটানা আর কত ভাল লাগে ? তাই একটু সুযোগ খুজে বিনোদনের আশায় আমরা পশু-পালন ও অন্যান্য অনুষদের লেভেল-২, সেমিস্টার-১ এর কজন (ব্যাকবেঞ্চারস - ক্লাসের দুষ্ট,অমনোযোগী, পেছনের সারির ছেলে-মেয়েরা) গিয়েছিলাম বাকৃবির পাশদিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রক্ষ্মপুত্র নদের মাঝে জেগে ওঠা নিঝুম দ্বীপে।
দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। পূর্ব নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আমরা ব্রক্ষ্মপুত্র নদের পাড়ে হাজির হই সকাল ১০ টায়। সবাই এসে উপস্থিত হলে আমরা একটি নৌকা ভাড়া নেই এবং রওনা দেই নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশ্যে। নৌকায় উঠেই আগে সবার পরিচয় আর তার সাথে রূপক নামতো আছেই। সুমন-মটর লুলা, ইয়ামিন-মিচকা শয়তান, তরিকুল-হিরো, শাপলা-হিরোইন, দিশা-মটু, লিমি-নেত্রী, পলি-মরিচ, রাসেল-মোরগ, আব্দুল ওয়াহাব-বাউ, মোমিন-মামা, মুন-ল্যাটকা ; এছাড়াও রয়েছে- তৃষা, নোমান, পাপড়ি, সুমি, নওরিন, মুন, ইসরাত, বন্যা ও তুলেশ। এভাবেই অনেক হাসি-ঠাট্টার মধ্য দিয়ে শেষ হল পরিচয় পর্ব। আরও দুজনের কথা বলাই হলনা, লাভগুরু জাহিদ আর ভন্ড প্রেমিক নীরব, যারা আগে থেকেই নিঝুম দ্বীপে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। যাহোক নদীরবুক চিরে নৌকা চলেছে সামনের দিকে, ইসরাতের মুখের সুমিষ্ট গান আর নদীর দুই ধারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে রাস্তা প্রায় শেষ হয়ে এলো। আমরা দুপুর ১২ টার দিকে পৌঁছালাম সেই অরণ্যে ঘেরা নিঝুম দ্বীপে। সেখানে পৌঁছে সবাই একটু বিশ্রাম নেওয়ার পর শুরু হল মেয়েদের মেকাপ আর ফটোসুট। এই দেখে ছেলেরাও আর বাদ রইলনা, তারাও সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজেদের ক্যামেরায় বন্দিকরা নিয়ে।
তারপর দুপুর ১.৩০ ; এখনও খাবার আসেনি, সবার পেট ক্ষুধায় চো-চো করছে। কিছু করার নেই, শুরু হল গান-গান খেলা। সবাই গোল হয়ে বসে একের পর এক গান গাইতে থাকলাম। ঠিক ২.০০ টার সময় আমাদের খাবার আসল, কাচ্চি বিরিয়ানী। সবাই পেটটা পুরে নিয়ে পরবর্তী খেলাধুলার জন্য প্রস্তুতি নিল। খেলার মধ্যে ছিল- অন্ধের হাড়ি ভাঙ্গা, ছেলেদের মোরগ লড়াই, মেয়েদের- ঝুড়িতে বল ফেলা আর ক্রিকেট। প্রথমেই ছিল অন্ধের হাড়ি ভাঙ্গা খেলাটি। পাপড়ি আমাদের মাঝে সেরা অন্ধ নির্বাচিত হল কারণ সেই দুই বার হাঁড়িটি ভাঙ্গতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর মোরগ লড়াই, মোরগ লড়াই এ প্রথম হল আব্দুল ওয়াহাব। এই শোকে তুলেশ প্রায় কেঁদেই দিল, কারণ সে ছিল দ্বিতীয় কিন্তু পুরস্কার ছিল একটি। ঝুড়িতে বল ফেলার পালা, অনেক তপস্যার পর ঝুড়িতে বল ফেলতে সক্ষম হল বন্যা। এরপর, মেয়েদের ক্রিকেট খেলা, জয়ী হল শাপলা, তৃষা, দিশা ও লিমির টিম। অন্য টিমে ছিল নওরিন, বন্যা, ইসরাত ও সুমী। এদিকে দল হেরে যাওয়াই নওরিনের তো প্রচন্ড মন খারাপ হল। তাই তাকে একটি সৌজন্য পুরষ্কার দেওয়া হল তার হাতে আটকে যাওয়া হঠাৎ একটি ক্যাচ ধরার জন্য। এদিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে পা দিচ্ছে সূর্যি মামা। এবার আমাদের শেষ ইভেন্ট লটারি ড্র। সবার একটাই আশা পুরষ্কারটা যেন আমি পাই। যাহোক তৃতীয় পুরষ্কারটি পেল পলি, দ্বিতীয়টি পেল মোমিন এবং শেষ আকর্ষণ প্রথম পুরষ্কারটি পেল বন্ধু মুন। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে, এবার ফেরার পালা। যদিও মন চাইছেনা তবুও কিছু করার নোই, ফিরতেই হবে। সবাই রওনা দিলাম সেই চির-পরিচিত সবুজে ঘেরা, স্মৃতি তাড়িত ক্যাম্পাসের দিকে।
সত্যিই সেই দিনটি কোন দিনও ভুলার নয়। তাই সেই স্মৃতিকে আজীবন জীবিত রাখার জন্য সবাই এক প্রতিঙ্গায় বদ্ধ হলাম- ”বন্ধু আমরা সবাই ব্যাকবেঞ্চারস, চিরদিন থাকব একসাথে, সকল বিপদে আপদে।”
এ ভাবেই শুরু এবং শেষ হল বাকৃবির ব্যাকবেঞ্চারস গ্রুপের প্রথম কোন প্রোগ্রাম। সত্যিই আজীবন স্মৃতির পাতার ফ্রেমে ছবি হয়ে বাধা থাকবে এই দিনটি।
NB. The feature is written from 4 years old memory. All Image are taken by author