কাল রাত থেকে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। দিব্বি একটা ঘুম দিয়েছি। আহা লম্বা ঘুমের সফর। সফরের যাত্রা শেষ হয়েছে সকাল ১১ টার দিকে। তাও হয়তো শেষ হত না। ঘুমের মধ্যেই শুনছি মা আমাকে ইচ্ছেমত বোকা দিচ্ছে। মায়ের শব্দের ঝংকারে ঘুমটা আর টেকসই হল না।
অবশ্য মায়ের বোঁকা ঝোকা গুলো সাময়িক খারাপ লাগলেও পরে ভাবতে খুব ভালোই লাগে। হয়তো একদিন এসব নিয়েই মায়ের অভাব পূরণ করতে হবে। যেমন বাবার আদর গুলো নিয়েই এখন বাবার অভাব পূরন করতে হয়। ধূর, ইমোশনাল হয়ে যাচ্ছি। মূল কথায় আসা যাক।
ঘরে টিনের ছাঁদ। উপরে গাছের পাতা পরে পরে নষ্ট হয়ে কয়েকটা ছিদ্র হয়ে গেছে। ফুটোর জন্য দুনিয়া পাগল, আর বৃষ্টির পানি? সে তো ফুটো ইস্তেমালের কোন সুযোগেই মিস করে না।
এই টিন পরিবর্তনের জন্য কতদিন মা বলেছে। আমি বরোই অলস মানুষ। সহজে কি আর কাজ করি। আলসতার শাস্তি আজ সকল সকাল।
চোখ ঘোষতে ঘোষতে ঘুম থেকে উঠেই মাকে বললাম এতোটুকু পানিতেই এই অবস্থা আর যারা বন্যার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। খায়ে না খায়ে মানবতর জীবন যাপন করছে। আমার কথা শেষ করতে না করতেই ঠিক যেন আগুনের মধ্যে তেল ঢেলে দেওয়া অবস্থা। ঝাড়ু হাতে নিয়ে বার হো নবাব জাদা, আমাকে জ্ঞান দিচ্ছে। তোর বাপ থাকলে আমাকে এইভাবে কষ্ট করতে হত না। বউ আসুক তখন বুঝবি। আমিও আস্থে করে বিয়েটা দিয়েই দাও বলে সাইট কাটতেই বলে কি বললি আবার বল? কই না তো বলেই সাটকি কাটলাম।
যাক বাবা পরিবেশ শান্ত। নাস্তা করবো পরাটা ঠান্ডা। শক্ত হয়ে গেছে টেনে টেনে খাচ্ছিলাম। মা বলে আরো দেরি করে উঠ নবাবজাদা, তোর বউ নাই যে গরম গরম পরাটা বানায় দিবে। আমি তো মুচকি মুচকি হাসছিলাম। আসলে বউয়ের কথা বললে আমাদের মত অবিয়াইত্তাদের ভালোই লাগে।
তারপর মা এখন নরম সুরে কাছে এসে বসে জিজ্ঞাসা করে বন্যায় খুব খারাপ অবস্থা, না বাবা। আমি, হুম। মানুষের কত কষ্ট। তারা কিভাবে থাকবে, কি খাবে, সরকার তাদের ত্রান দিচ্ছে কিনা এইসব গভীর চিন্তা শুরু করে দিল মা। আবার ত্রান চোরদের কয়েকটা গালিও দিল🤣। আসলে এদের দু একটা গালি দিয়েই নিজেকে সান্তনা দেওয়া ছাড়া আমাদের মত ম্যাঙ্গো ম্যানদের কিই বা করার আছে।
এবার অতিমাত্রায় বৃষ্টি আর প্রতিবারের মত ভারত পানি চুক্তি অমান্য অবাধে পানি ছেড়ে দেওয়ার ফলে বন্যার সৃষ্ট। মারাত্মক ক্ষয় ক্ষতির আশংকা করা হচ্ছে।
আচ্ছা আপনি কি কখনো দেখেছেন একজন কৃষক ডাকাতি বা চুরীর ভয়ে গরুর গলা ধরে ঘুমাতে? আমরা তো ফেবুকে ভাইরাল হতে দেখেছি বন্যায় বুক ভরা পানিতে গরুকে কাঁধে করে নিয়ে যেতে। এটাকে আমরা কেউ ফানি পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করেছি কেউ আবার মিমি। তবে তাদের কষ্ট দূর্দশাটাকে আমরা কখনো দেখি না। আবার কেউ বা পশুর প্রতি ভালোবাসার জন্য বাহবা দিয়ে নিজের দায় এড়িয়ে যাই।
আচ্ছা চারিদিকে অথৈ পানির স্রোত, মাঝে কয়েক ঘরে পানিবন্দী মানুষ, ডাকাতি আর ঘরের নারীদের ইজ্জতহানির আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে দেখেছেন?
সারাদিন একমুঠো চিরা মুড়ি আর পানি খেয়ে বন্যার্তদের দিন কাটাতে দেখেছেন? কি বিশ্বাস হচ্ছে না?
বন্যায় উপদ্রুত উত্তরবঙ্গের দুর্গম চরগুলোতে ঘুরলে এর থেকেও অধিক মানবেতর জীবনযাপন দেখবেন, দেখবেন কি করুন জীবন তাদের, দেখবেন মানুষ কিভাবে পশুর মত বাঁচে। সুখে আছেন তো তাই বুঝবেন না। একবার দেখে আসুন।
প্রতিবার বন্যায় বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু হলেও ত্রাণ কার্যক্রম চলে, এবার তা নেই। সরকারের ত্রাণ কার্যক্রম যতটা গর্জায় ততটা বর্ষে না। এবার সরকারের খাতে কোন টাকা নেই। সব হরিলুট হয়ে গেছে। তার উপর করোনা। বহু জায়গায় আশ্রয়কেন্দ্রও খোলা হয়নি, দুর্গম এলাকাগুলোর অবস্থা দুর্বিষহ, ভয়াবহ।
আচ্ছা এসব বাদ দেই। আজ বৃষ্টিতে বার হয়েছিলাম শহরের বাইরে উপজেলার শেষ প্রান্তে। প্রকৃতির সবুজে নিজেকে খুঁজতে। আজ সকালে আবার বড় বড় চুল গুলো কেটে ফেলেছি। আমার আবার চুল কাটার পর মানুষের সামনে আসতে লজ্জা লাগে। তার উপর আবার ছবি তুলা। কিন্তু প্রকৃতির লোভ কি আর লজ্জা মানে? চুল কাটার পর নিজেকে কেমন কেমন যেন ইয়ে টাইপের মনে হয়।