লকডাউনের জীবনটা ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমময়। ঘুম থেকে উঠা থেকে শুরু করে ঘুমানো আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই সময় কাটাতে হতো। কারণ, বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাও অনেকটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিল। অন্যান্য চিত্র ভিন্ন হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে এখনো সেই অবস্থাই বহাল আছে। পাশাপাশি অনলাইন বিজনেস তো আছেই৷ দৈনন্দিন জীবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বর্তমানে বিশাল একটি অংশ দখল করে আছে।
লকডাউনের এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ খোলা প্রকৃতির দেখা না পেয়ে রীতিমত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। অপরদিকে প্রকৃতি মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক আঘাত থেকে রেহাই পেয়ে এক অপরুপ সাজ দিয়েছিল। প্রতিবছর ভ্রমনকে কেন্দ্র করে বিনোদন পেতে আমরা অজান্তে প্রকৃতির উপর অনেক নির্যাতন করি।
কিছুদিন পূর্বে একটি ভিডিওতে দেখলাম এক রমণী তার প্রিয়তম'র জন্য ঘন্টা দু'এক ব্যয় করে একটা সুন্দর সাজ দেয়ার চেষ্টা করছে। কেনো এই সাজ বলতে পারেন? কারণ হতে পারে প্রিয়তমকে তার সৌন্দর্য প্রদর্শন। সুদর্শন চেহারা দেখিয়ে দাবিকৃত ভালবাসার পরিমাণ বৃদ্ধি করা। অতিরিক্ত আদর-সোহাগ আদায় করা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লেখা স্ক্রল করতে করতে কত গুরুত্বপূর্ণ আর্টিকেল অদেখাই থেকে যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থাকতে থাকতে একপ্রকার একঘেয়েমি তৈরি হয়। এই একঘেয়েমি দূর করতে নির্মলা প্রকৃতির একরাশ শীতল বাতাস প্রয়োজন। সারাদিনে সীমিত পরিসরে হলেও প্রকৃতির সাথে কিছু সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা পরোক্ষভাবে বন্দি হয়ে আছি। মাঝেমাঝে ইচ্ছে করলেও আমরা এটা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারিনা। এই বন্দি দশার কারণে হয়না আর প্রকৃতি দেখা। তৈরি হয়না প্রকৃতির প্রতি মায়া কারণ।
প্রকৃতি প্রতিনিয়ত নতুন নতুন অপরূপ সাজে নিজেকে সাজিয়ে আমাদের নিকট প্রেমিকার ন্যায় দর্শন দেয়। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ চাঁদনী রাত, শীতের সকালে মিঠেল রোদ, রোদেলা দুপুর, গোধুলি লগ্ন ইত্যাদি। যারা কবি তারা এই প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে হাজারো কবিতা, গল্প, উপন্যাস লেখার ক্ষমতা রাখেন।
বাইরে বের হয়ে খোলা মাঠে কিংবা বাড়ির ছাদে দাড়িয়ে রাতের আকাশটা দেখলে দেখা যায় এক অপরুপ দৃশ্য। লক্ষ তারার মাঝে একটি চাঁদ প্রকৃতিকে সুন্দরভাবে আলো উপহার দিচ্ছে। এই দৃশ্য অবলোকন করে হয়তো কোনো মমতাময়ী মা তার সন্তানকে সুন্দর একটি মুহূর্ত উপহার দিচ্ছেন। মানবজাতির স্বভাব হচ্ছে কোনো না কোনো ব্যক্তি কিংবা বস্তুর দিকে আকৃষ্ট হবে। কবি-সাহিত্যিকেরা প্রকৃতির প্রতি চরমভাবে আকৃষ্ট হতেন। জীবনানন্দ দাশ তাঁঁদের একজন৷
আমাদের চারিদিকে তাকালে দেখা যাবে প্রকৃতি তার যৌবনকে অপরুপ সাজে অলঙ্কৃত করে দর্শন দিচ্ছে। এই দর্শন পেতে হলে আপনার একাডেমিক কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন নেই। শুধু কাঁচের ন্যায় স্বচ্ছ একটি মন হলেই চলবে। কারণ, বাংলার মাঠ-ঘাট, পথ-প্রান্তর, সোনালি ধানের ক্ষেত এসব যেনো চোখ জুড়িয়ে দেয়ার মতো। এই সৌন্দর্যের প্রতি মুগ্ধ হয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ লেখেছেন,
"বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি,
তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।"
প্রকৃতির এই বিলিয়ে দেয়া অপরুপ দৃশ্য আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কাছে তুচ্ছ মনে করে এড়িয়ে চলি। গুরুত্বহীন ভেবে ইচ্ছেও হয়না তাকাতে। যেখানে প্রকৃতির প্রতি একটা দৃঢ় আকর্ষণ থাকা দরকার, সেখানে আমরা পড়ে আছে মিথ্যে মায়ার এই সামাজিক মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যম আমাদের জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু এর প্রতি আসক্তি আমাদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। কিন্তু ক্ষতিকর দিক বিবেচনা না করেই আমরা প্রায় পড়ে থাকি আমাদের বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
যেহেতু প্রকৃতি আমাদের নিকট তুচ্ছ। তাই আর হয় না ভোরের সূর্য উদয় আ দিনের খোলা আকাশ দেখা সুযোগ। হয় না রাতের জোৎস্না দেখা। ভোরবেলা ঘাসের উপর লেগে থাকা শিশির দেখা হয়না। সবকিছুই কেমন যেনো যান্ত্রিক হয়ে গেছে। আর আমরা হয়েছি অমানবিক। শুধু পশু আর পাখিরাই মানবিক। নিয়ম ভাঙার ক্ষেত্রে মানুষ যতটা অনিয়ম করেছে তার সিকিভাগ করেনি অবলা প্রাণীরা। তাই হয়তো প্রকৃতি মাঝে মাঝে আমাদের খুব বিপদে ফেলে।
প্রকৃতি আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা রত্ন ভেবে থাকেন। রত্নের যত্ন নেয়া প্রয়োজন। তাই প্রকৃতি গুরুত্ব বিবেচনা করে প্রতিদিন অন্তত একটি বৃক্ষ রোপণ করা প্রয়োজন। নাহলে ভবিষ্যতে টিকে থাকার লড়াইয়ে অংশ গ্রহণ করার প্রস্তুতি নিতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মকে ভালো একটি সময় উপহার দিতে আপনাকে অবশ্যই প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হতে হবে।
কেলি বিডেনওয়েগ নামে একজন গবেষক বলেছেন,
"প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ যত গভীর হবে, বা যত বেশি সময় প্রকৃতির সঙ্গে কাটবে আমাদের ভাবনার স্বচ্ছতা, চিন্তার গভীরতা ও বোঝার ক্ষমতা ততই উন্নত হবে।"
প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকনের পাশাপাশি প্রকৃতির প্রতি যত্নবান হওয়া প্রয়োজন৷ নাহলে একদিন প্রকৃতির সাথে আমরাও হারিয়ে যাবো।
Device: Redmi Note 7s