কতইনা বিস্ময়কর আমাদের জীবন । আমরা প্রতিদিনই নতুন নতুন জিনিসের সাথে সাক্ষাৎ করছি আবার কিছু কিছু জিনিস পিছনে ফেলে আসছি । যেগুলো আমাদের মস্তিষ্কে স্মৃতির পাতায় জমা হচ্ছে ।আমরা দিন দিন আধুনিক হচ্ছি আর আমাদের বর্তমানে ব্যবহৃত জিনসপত্র ব্যাকডেটেড হয় যাচ্ছে । এমনই একটি পিছনে ফেলে আসা জিনিস হচ্ছে "হারিকেন"।
হারিকেন নিয়ে কিছু কথা
হারিকেন এক সময় গ্রাম বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে দেখা যেত । যখন বিদ্যুতের আলো সব গ্রামে পৌঁছে নাই । তখন গ্রাম বাংলা কিংবা শহর অঞ্চলের এই হারিয়ে যাওয়া বস্তুটি নিভু নিভু করে জ্বলতে দেখা যেত। সেই আলোয় বাচ্চা ছেলে মেয়েগুলো পড়ালেখা কিংবা পরিবারের সকল সদস্য সেই আলোতেই খাওয়া-দাওয়া করতো। তখন গহের ভিতরটা আলোকিত রাখার, একমাত্র অবলম্বন ই ছিল এই হারিয়ে যাওয়া বস্তুটি।
তাছাড়া বর্তমানে ব্যবহৃত বিভিন্ন চার্জার লাইটের মত এত বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বর্তমান সময়ের মতো সহজলভ্য ছিল না । তখন রাতের অন্ধকারে বিশেষ করে গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে মিট মিট করে আলো জ্বলতে দেখা যেত ।আর সে আলোর উৎস ছিল হারিকেন।
হারিকেন এর নিচের দিকে তেল ভর্তি করার জন্য একটু জায়গা ছিল । কারণ হারিকেনে জ্বালানি হিসেবে কেরোসিন তেল ব্যবহার করা হতো। অতীত কাল থেকেই আমাদের বাপ দাদারা এটি ব্যবহার করে এসেছে ।এমনকি খুব ছোটকালে আমরাও এর আলোতে পড়ালেখা করেছি ।
রাতের অন্ধকারে বের হলেই যুবক কিংবা বিদ্যা মধ্যবয়সী সকলের হাতে হারিকেন জ্বালানো থাকতো। এমনকি মানুষ যখন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে রাতে যাতায়াত করতো তখন প্রধান আলোর উৎস ছিল হারিকেন। আজ কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে এই বস্তুটি।
বর্তমানে এটি সহজলভ্য নয়।চাইলেও সহজে এটি পাওয়া যায় না।বাজারেও এর চাহিদা প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে এসেছে। পুরনো এই জিনিসটি দেখতে পেয়ে খুব ভাল লাগল আর ফেলে আসা সেই অতীতের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল।
হারিকেন চেনেন না এমন মানুষের সংখ্যা খুব কম সংখ্যক ই পাওয়া যাবে।কারন এর সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের শৈশব কিংবা কৈশর কালের রাতে এর আলোয় পড়ার স্মৃতি ।
হারিকেন এর গঠন
হারিকেন এর নিচের এবং ওপরের অংশ অনেকটা টিন জাতীয় পদার্থ দিয়ে তৈরি। মাঝখানে একটি কাঁচের গ্লাস সংযুক্ত করতে হয়।নিচের দিকে একটি ক্লিপের মতো অংশ আছে, এটি নিচের দিকে টান দিলে এবং হারিকেনের মাথায় একটি আংটা আছে । সেই আংটা ধরে উপরের দিকে টান দিলে হারিকেনের মধ্যবর্তী অংশে গ্লাস ( যাকে আমাদের স্থানীয় ভাষায় হারিকেন এর চিমটি বলে) লাগানো কিংবা বের করা যায়।
হারিকেন এর নিচের দিকে একটি ট্যাংক এর মত খালি অংশ থাকে। সেখানে একটি ছিপি লাগানো থাকে। ছিপি খুলে কেরোসিন তেল ভরা হয়। সেই ট্যাঙ্ক এর সাথে উপরদিকে একটি সইলতা (সুতার তৈরি ফিতার মতো লম্বা একটি অংশ) লাগানো থাকে। চাবি ঘুরিয়ে সেই সইলতা বাঁড়ানো কিংবা কমানো যায় ।আর এই সইলতাতে আগুন জ্বালিয়ে হারিকেনটি কে আলোকিত করা হয়।
হারিকেন এর হারিয়ে যাওয়ার কারণ
বর্তমান বিশ্বের আধুনিকায়নের সাথে সাথে আমরাও আধুনিক হয়ে যাচ্ছি। হাত বাড়ালেই হাতের কাছে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি খুঁজে পাচ্ছি। যেগুলো আমাদের ঘরকে করে দিনের মতো আলোকিত। যেগুলো বৈদ্যুতিক খরচ ও তুলনামূলক কম। আবার তেমন ঝামেলা পোহাতে হয় না । কিংবা কোন জ্বালানি পুড়াতে হয় না। তাই দিন দিন এর চাহিদা কমে আজ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তাই এই দিনে একটি গানের কলি মনে পড়ে,
যখন তোমার কেউ ছিলনা
তখন ছিলাম আমি
এখন তোমার সব হয়েছে
পর হয়েছি আমি।
হ্যা, আমরা এমনই। নতুন অতিথির আগমন, পুরনো অতিথি কেবল মাত্র স্মৃতি হয়ে যায়। নতুন কিছু পাবার আশায়, পুরোনো কিছু হারিয়ে যায় আমাদের মস্তিষ্ক থেকে।
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এবং ঝামেলা এড়াতে হারিকেন নামক যন্ত্রটি ব্যবহার ছেড়ে দিয়েছি।
যদিও এখনো এই যন্ত্রটি মাঝেমধ্যে ব্যবহার করা হয় ।বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে আউস ঘরে (যে ঘরে সদ্য বাচ্চা জন্ম হয়, সেই ঘরটি আউস ঘর নামে পরিচিত।অবশ্য আমাদের এলাকায় এটি ছডি ঘর নামে পরিচিত) এর ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
এরকম অনেক বস্তু কিংবা আমাদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র গুলো আমাদের চোখের সামনেই হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মস্তিষ্ক থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে এই যন্ত্রপাতির শব্দগুলো। একসময় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এর কাছে হয়তো এটি একটি গল্পের মতো মনে হবে । হয়তো এই যন্ত্রটি দেখতে হলে জাদুঘরে যেতে হবে। কিন্তু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে কিনা আমার জানা নেই।
যাইহোক এই যন্ত্রটি কিছুদিন আগে অনেক খোঁজাখুঁজি করার পর ,বাজারে একটি দোকানে শুধু মাত্র 1 পিছ হারিকেন খুঁজে পাই। এবং দোকানদার যত দাম বলে ঠিক তত টাকা দিয়েই কিনতে হয়। এটি কেন প্রধান কারণ হচ্ছে ,আমার সদ্য জন্মানো ছেলের নাভি গরম সেক দেয়ার জন্য এটি খুবই দরকারি।তাই আগেই এটি অনেক খোঁজাখুঁজি করে বাজার থেকে কিনে নিয়েছিলাম। এই হারিকেন কেনার পর যে দেখে সেই বলছে,
অনেক দিন পর একটি হারিয়ে যাওয়া বস্তু দেখে খুবই ভালো লাগলো। কোথায় পেলেন এটা? অনেকেই এমন মন্তব্য করলেন ,অনেক বছর পর হারিকেন দেখলাম।
যাই হোক, ধন্যবাদ সকলকে লিখাটি পড়ার জন্য। হারিকেন এর মত আমাদের জীবনে যেন ,অন্য কিছু যাতে হারিয়ে না যায়।