জীবনটা বড় অদ্ভূত।
সম্পর্কগুলো আজ ঠুনকো। একসময়কার সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের অনেকের সাথে এখন আর কথা হয় না, অন্যদিকে এখনকার ভালো বন্ধুদের অনেককেই গত দুই বছর আগেও হয়তো চিনতাম না। সবচেয়ে পছন্দের মানুষদের অনেকেরই আজ অপছন্দের লিস্টে নাম ওঠানোর পায়তারা। প্রতিদিন কথা হওয়া মানুষগুলোর মধ্যে অনেকের সাথেই আজ যোগাযোগের সব পথ বন্ধ।
চারদিকে কতরকমের দাবি।
প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কে প্রতিদিন কেউ না কেউ দাবি নিয়ে আসে। নতুন দাবি, নতুন পোস্টার। আমি বক্তাদের দিকে মাঝে মধ্যে তাকিয়ে থাকি। যারা বক্তব্য শুনতে আসে তাদের দিকেও তাকাই। তাদেরকে বেশি আগ্রহী মনে হয় না। চারদিকে বিরক্তিকর চোখ। মানুষের কত দাবি দাওয়া...
চারদিকে কত গোমরা মুখ।
শাহবাগ কিংবা বাইতুল মোকাররম মসজিদের পাশের ওভারব্রিজ অথবা ফার্মগেটের বিশাল ওভারব্রিজের উপর চলন্ত ছুটে চলা মানুষ। এই পাড়ে উঠে ওই পাড়ে নেমে যাচ্ছে তারা। উদাসীন কেউ হয়ত দাঁড়িয়ে যায় হটাত। গাড়ি রিকশার বিশ্রী হর্ণের আওয়াজ কিংবা ফুটের ফেরিওয়ালার একদামের আওয়াজ তাদের কানে ভাসে না। তারা কি ভাবে এতো?
শহরে কতজায়গায় আমার গল্পরা ঘুরে বেড়ায়।
যেমন: শত শত রিকশাওয়ালা জানে আমার গল্প। আমার চরিত্র জানে খুচরা দোকানদার। আমার অভ্যাস জানে খাবার সাজিয়ে দেয়া অল্পবয়সী ছোকরা।
আমি অবশ্য তাদের গল্প জানি না। আমার সব রিকশাওয়ালাকে একরকম মনে হয়। মানে তাদের চেহারা মনে রাখতে পারি না। আচ্ছা রিকশাওয়ালারা কি আমার কথা কিংবা আমাদের দুইজনের কথা মনে রাখে? রিকশা কি আজব বাহন! একটা মানুষ প্রতিদিন কত বিবিধ রকমের গল্প শুনে যায় নীরবে!
একসময় স্কুল ফাঁকি দিয়ে মাঝে মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ঘুরতাম। কোনো কোনো দিন গুলিস্থানে। ক্যানভাসার কিংবা ম্যাজিশিয়ানের জটলার মধ্যে দাঁড়াতাম। মানুষ খুব সহজে কোনো কিছু বিশ্বাস করতে চায় না আবার হুট করে অবিশ্বাস করে কিছু পাওয়ার সুযোগ একবারে নষ্ট করতে চায় না। এই জন্যই হয়ত মানবমনের এতো কৌতুহল। একবার এক ম্যাজিশিয়ানের কাছ থেকে একটা জাদু কিনেছিলাম। বেচারা! যখনই আমাকে জাদুর রহস্য বলেছিলো, ম্যাজিশিয়ানটাকে আমার মনে হলো সে একজন প্রতারক এবং ভন্ড। এতো সহজে কিভাবে সে আমাকে এবং সবাইকে বোকা বানাচ্ছে ভেবে জিদ হয়েছিলো খুউব।
শহরটা কেমন জানি এখন! এখন স্কুল ফাঁকি দেই না, ফাঁকি দিলে নিজেরেই দেই। নির্মাণাধীন ভবনের ঝুলে থাকা শ্রমিক যেমন জানে তার সাজানো এই বহুতল ভবনে তার কখনো জায়গা হবে না আমিও জানি একইরকম আরেকটা সত্য। এইসব সত্য এবং মিথ্যার মধ্যে আমি নিজেরে খুঁজি, কোনো এক মিছিলের মধ্যভাগে, ওভারব্রীজের উপর বসে থাকা কোনো নেশাগ্রস্থ কুকুরের পাশে কিংবা কোনো ম্যাজিশিয়ানের সামনে মুগ্ধ চোখা জটলার মধ্যে। আমার গল্পগুলো রেখে দিয়েছি স্মৃতি করে বিভিন্ন জায়গায়, তাদের খুঁজে ফেরার তাড়া নেই একটুও....