অনেক দিন আগের কথা। সময়টা ২০০৫ কি ২০০৬ সাল। বাসা বদল করে নতুন বাসায় উঠেছি মাত্র। আমাদের বাসার সামনেই যে বারান্দাটা দেখা যেত সেখানেই আমার এক বান্ধুবি ছিল। তার নাম ছিল শ্রেয়া।
সেই বার স্কুলে পূজোর ছুটি চলছিল। ইট কাঠের এই শহরে চার দেয়ালের মাঝে ওই বারান্দাটুকুই ছিল ভরসা। বারান্দা দিয়ে আকাশ দেখা যায়, রিক্সা দেখা যায় আর পরিচিত কিছু মুখ। দুপুরে হঠাৎ আমার নাম ভেসে আসলো কানে, কেউ ডাকছে। হুম, পরিচিত কন্ঠ। দৌড়ে বারান্দায় গেলাম। দুপুরে গোছলের পর পিসি যে জামাগুলো বারান্দায় টানিয়ে গেছে সে জামাগুলোর আড়াল থেকে ছোট্ট একটা মুখ উকি দিয়ে বলছে, "আজ বিকেলে বাসায় আসো, আমাদের বড় পূজো। বাকিরাও আসবে।"
ধুপ করে মুখে আমার শ্রাবণের মেঘ জমে গেলো। এত দিন ধরে ঘর বন্দি, শেষ মেশ একটা নিমন্তন্ন পাবার পর চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া আমি খুশিতে আত্মহারা না হয়ে আরো বেশি দুঃখ পেলাম। কারন? কারন এক সেকেন্ডেই আমি ধারনা করে ফেলেছিলাম যে আম্মু আমাকে যেতে দিবে না। আমি কোনো ভাবে নিজেকে সামলে উত্তর দিলাম, "আম্মু দিলে আসব।"
ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে আম্মুকে বলবই না। এই কথা বললে আম্মু না জানি আমাকে কি না কি বলে এর থেকে না বলাই ভালো। এক সেকেন্ড পর ভাবলাম "জীবনে কোনো দিন তো এমন কোনো আবদার আম্মুকে করিনি, একবার বলে দেখব নাকি"। পরে আবার ভাবলাম যে "এই অনুমতি পাবার কোনো চান্সই নাই, বাদ"। সকল সিদ্ধান্ত দুই মিনিটে নিয়ে নেওয়ার পর আমার মুখে উত্তর, দক্ষিন, পূর্ব ও পশ্চিম আকাশের সকল মেঘ এসে জমে গেল। যে কোনো সময় বৃষ্টি মানে চোখের পানিও পড়তে পারে। কিন্তু ততদিনে আমি খুব স্ট্রেটিজিক পদ্ধতিতে চোখের পানি মুছে ফেলতে শিখে গিয়েছিলাম।
আম্মুর সামনে এসে একটু তিরিং বিরিং করে খুব স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করছিলাম। ঘরে বসে হয়তো আম্মু সব কিছুই শুনেছে কিন্তু শুনেও না শোনার ভান করে অন্য দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, "ওদের কি আজকে পূজো?" আমি উত্তর দিলাম "হ্যা"। আম্মু আবার জিজ্ঞেস করলো, " ও কি বললো, তোমাকে দাওয়াত দিলো?"। আমি বললাম, "হ্যা, যাইতে বলসে, বাকিরাও যাবে। কিন্তু আমি যাব না থাক।"
এরপর আম্মু যা বলেছিল তা খুবই সাধারন কয়েকটি শব্দ, একটা কি দুইটা বাক্য, একটা স্বাভাবিক স্বরের সহজ অনুমতি। কিন্তু সেই কথা গুলোই আমার পরবর্তী জীবনের একটা বড় শিক্ষার অংশ হয়ে সাথে ছিল, আছে এবং থাকবে।
ধর্ম যে সত্যিই মানুষ মানুষে, বন্ধু বন্ধুতে বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে না তা আমি সেদিনই জেনেছিলাম, সেদিনই শিখেছিলাম আমার পরিবার থেকেই।
যারা মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করছে তারা জেনে রাখুক সে যে ধর্ম বিশ্বাসী হোক না কেন, সৃষ্টি কর্তা কখনোই তাদের ক্ষমা করবেন না। আমি প্রতিজ্ঞা করছি আমার হাত ধরে আসা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমি মানুষ হতে শেখাবো, বিভেদকারী না। ধর্মের নামে সমাজে বিভেদ সৃষ্টিকারীদের সুষ্ঠ বিচারের আওতায় আনা হোক।