প্রাইমারি স্কুল শেষ করে রাফাত এখন হাই স্কুলে ভর্তি হবে। আবারও সেই নতুন চিন্তা। নতুন স্কুল নতুন পরিবেশ নতুন বন্ধু বান্ধব। প্রাইমারি স্কুলের সব বন্ধু হাই স্কুলে থাকলেও আসেপাশের সব স্কুল থেকে নতুন নতুন ছেলে মেয়েরা আসবে। এই স্কুলে ছেলে মেয়ে একসাথে পড়ে। রাফাত প্রথম দিন স্কুলে গেলো। তার মনের ভিতরে সেই ভয় আরও বেশি কাজ করছে। নতুন ক্লাসে ঢোকার পরে দেখে অনেক ছাত্র একসাথে বসে আছে। ক্লাসে পুরা হইচই অবস্থা। ক্লাসে বসার কিছুক্ষন পরে বেল বাজলো পিটির জন্য। সবাই ক্লাস থেকে বের হয়ে পিটি শেষ করে আবার ক্লাসরুমে চলে আসলো। ঠিক দশটায় স্যার ক্লাসে প্রবেশ করলেন। প্রবেশ করে কিছুক্ষন কথা বলার পরে স্যার নাম ডাকা শুরু করলেন। রাফাতের রোল নাম্বার ছয়। ওর হার্টবিট অনেক বেড়ে গেছে। চোখের পলকে ছয় নাম্বার চলে আসলো। যা হবার তাই হলো। রাফাতের জড়তার সমস্যা শুরু হয়ে গেলো। স্যার সহ ক্লাসের সবাই রাফাতের দিকে তাকায় আছে। অনেকে হাসাহাসি করতে শুরু করলো। রাফাতের খুব অশস্তি লাগতেছে। স্যারকে তখন সে অনেক কষ্টে বললো তার জড়তার সমস্যা আছে। একে একে সবার নাম ডাকা শেষ হলো। স্যার রাফাতকে কাছে ডেকে নিয়ে শুনলেন কবে থেকে এমন সমস্যা নাকি জন্ম থেকেই। স্যার এর সামনে রাফাত কথা বলতে পারতেছিলো না। কিছুক্ষন কথা বলে স্যার সবার পরিচয় নেয়া শুরু করলেন। রাফাতের হার্টবিট এখনও কমেনি। প্রথম ক্লাস শেষ হবার পরে দেখে অনেকে ওর দিকে তাকায় আছে মুচকি মেরে হাসতেছে। এই ব্যাপারটা রাফাত কোন ভাবেই নিতে পারতো না। ওর শুধু মনে হতো সবাই কতো সুন্দর করে কথা বলতে পারতেছে। ও কেনো পারে না দুনিয়াতে মনে হয় এরকম আর কারও নেই। প্রথম দিন আজকে সব স্যার ক্লাসে এসে পরিচয় নিচ্ছে। প্রতিটা ক্লাস হচ্ছে আর রাফাতের হার্টবিট বেড়েই চলছে। বেশি আতংকিত হলে ওর এই সমস্যা বেশি হয়। প্রথম দিনটা অনেক অনেক বাজে কাটলো রাফাতের। সবাই স্কুলে কতো মজা করলো কিন্তু শুধু মাত্র এই সমস্যার কারনে ও নিজেকে সবসময় গুটিয়ে রাখতো। এভাবে নতুন স্কুলে বেশ অনেকদিন কেটে গেলো। হাতেগোনা তিন চার জন বন্ধু রাফাতের। প্রাইমারি স্কুলের যারা ছিলো তারাই। সবার সাথে কথা হতো কিন্তু সেরকম না। রাফাত প্রায় সবার থেকেই দূরে দূরে থাকতো। সবাই কথার মাঝে হেসে দিতো অথবা কেউ এসে খোঁচাতো। এইসব রাফাত একবারেই নিতে পারতো না। কোন দিকে না তাকায় মাথা নিচু করে বাসা থেকে স্কুলে যেতো আর আসতো। সবসময় মনে হতো সবাই হয়তো তার দিকে তাকায় আছে ওকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। এইটা মাথায় ঘুরতেই থাকতো এটা ভেবেই ওর আসেপাশে তাকানোর সাহস হতো না। আস্তে আস্তে রাফাত সব মানায় নিছিলো। কিন্তু আবার নতুন করে ঝামেলা হলো যখন ক্লাস এইটে উঠলো। তখন ছেলে মেয়ে একসাথে ক্লাস করতে হবে। আবার নতুন করে মনে ভিতরে সেই ভয় কাজ করতে শুরু করলো। ওকে ক্লাসে পড়া ধরলে তো পুরো ক্লাস হেসে দেয় আর এদিকে মেয়েরা আছে। ক্লাসের পড়া হলেও রাফাত চুপ করে থাকতো। এরকম একটা প্রেসার নিয়ে বড় হতে হচ্ছে।
রাফাতের কারো সামনে যেতেই ভয় করতো। মাথায় ঘুরতেই থাকতো সে মনে হয় কারো সামনেই কথা বলতে পারবে না আর সবাই হেসে দিবে। স্কুল জীবন এভাবে শেষ করার পরে কলেজে যেয়ে আরও বড় বিপদে পরলো রাফাত। প্রত্যেক ক্লাসে নাম ডাকে। এখানে সবাই নতুন। পরিচিত কেউই নেই। সবাই অদ্ভুত ভাবে তাকায় থাকে। এখানে এসে সিনিওর ভাই বন্ধু বান্ধব মশকরা কোন কিছুই নিতে পারছিলো না রাফাত। শুধু মনে হতো সবকিছু ছেড়েছুড়ে চলে যাই। এভাবে বড় হতে হতে রাফাতের সব কিছুতেই ভয় লাগতো। কোন একটা কাজ করতে গেলে সব সময় আতংকিত থাকতো। কাজ ঠিক ভাবে করতে পারবে কি না সবার সাথে ঠিক ভাবে কথা বলতে পারবে কি না। এই জন্য রাফাত কোন কাজে গেলে কাছের কোন বন্ধুকে নিয়ে যেতো কথা বলার জন্য।
যারা নাকি এরকম উপহাস ভয় ভীতির ভিতরে বড় হয় তারা নাকি যেকোনো কাজের ক্ষেত্রে অনেক ভয় পায়।যেই ভয় রাফাত এখনও পায়। অনেক চেষ্টা করে এইটা থেকে বেরোবার জন্য। কিছুক্ষণের জন্য পারলেও আবার সেই ভয় চলে আসে। তবে ইদানিং রাফাত অনেক কথা বলার চেষ্টা করে। আসেপাশের মানুষের সাথে খুব আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলার চেষ্টা করে। এখন অনেকটাই ভয় কমে গেছে তবুও মাঝে মাঝে চলে আসে। আমাদের দেশে আসলে শিশুদের মানসিক অবস্থা অনেক খারাপ। সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য যে পরিবেশ দরকার খুব কম শিশুই পেয়ে থাকে। এই বিষয় গুলোর উপরে যদি সবাই একটু গুরুত্ব দিতো তাহলে অনেকের জীবন সুন্দর হয়ে যেতো।