কেমন আছেন সবাই?
আমার সালাম নিবেন৷ আজ একটি শিক্ষামূলক বিষয় নিয়ে লিখবো ভাবছি। এর জন্য যথেষ্ট অধ্যয়ন করেছি কয়েকদিন। যে বিষয়টা নিয়ে গভীর উপলব্ধি আর চিন্তা করে বের করেছি, তা আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।
আশা করি, আপনারা আমার সাথেই থাকবেন👍
দেখুন, আমরা যারা বাঙালি নামধারী, তারা কিন্তু যুগে যুগে একই জাতি গোত্রের সীমার মধ্যে ছিলাম না কখনোই। যুগের পর যুগের পরিবর্তনে নতুন নতুন নামধারী হয়ে, নতুন সভ্যতার পালাবদলে, বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, বিচিত্র মাটি ও প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে, লোকসংস্কৃতিতে আচ্ছন্ন হয়ে, বিভিন্ন রুপধারন করেছি, পরিচিত হয়ে উঠেছি নানা ঢংয়ের নানা নামে।
Source
হয়তো আমাদের কারো এ ব্যাপারে জানতে ইচ্ছা করে, আমাদের পূর্বপুরূষরা কেমন ছিল, কী তাদের পরিচয়, তাদের সবার জীবন আচরন কেমন ছিল ইত্যাদি। আজ, এই বিষয়টা সামনে রেখেই, ঠিক পুরো ভাব তুলে ধরতে না পারলেও ঐ সত্য ইতিহাসের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করবো।
আমি প্রায়ই মাটি ও মানুষের কথা, পূর্ব পুরুষদের জীবনকাহিনী নিয়ে আলোচনা করি কেন এ প্রশ্ন জাগতে পারে।
কিন্তু, বিষয়টা হলো, যদি নিজেকে চিনতে হয়, নিজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটা ফর্দ দেখতে হয়, তাহলে ঐ পূর্ব পুরুষদের ইতিহাস টাকে এড়িয়ে যাওয়া চলেনা।
যা বলছিলাম, যেকোনো ঐতিহাসিক পুরো বাঙালি জাতিটাকে দুটো ভাগে মোটাদাগে ভাগ করবেন।
একটা হলো আর্য আরেকটা হলো অনার্য।
অনার্য কারা, এ বিষয়টা হয়তো অনেকেই জানা আছে।আর্যদের এ উপমহাদেশে আসার আগেই যারা এ অন্ঞলের আদি বাসিন্দা ছিল তারা অনার্য (নেগ্রিটো, অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, ভোটচিনীয়) এই ৪টি শাখা মিলে ছিল অনার্য গোষ্ঠী।
বাঙালি জাতির প্রধান অংশ কিন্তু আবার অস্ট্রিক জাতি থেকে উঠে আসা, যা হোক সে বিষয়ে পরে আরেকদিন বলা যাবে।
আজ, মূলত, অনার্যের বাইরে যারা, অর্থাৎ আর্যদের নিয়ে বলবো।
দেখুন, আর্যদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল অনেক সুবিশাল ও বিস্তৃত ছিল, খ্রীস্টের জন্মেরও আগে, পুরো পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সম্পদের নীলনকশা তাদের হাতেই ছিল। এশিয়ার ককেশাস অন্ঞল, ইরান, তুরান, কাবুল, কান্দাহার, তুর্ক, ইউরোপ ছিল আর্যদের আদি নিবাস।
Source
যখন তারা, ডায়াস্পোরা বা অভিবাসিত হয়ে আরো পূর্বদিকে গিয়ে ভারতীয় অন্ঞল দখল করলো, সিন্ধু বিজয় করে স্থায়ী বসতি স্থাপন করলো তারপর থেকে আর্যদের থেকেই এই বাংলায় ও ভারতে আধুনিক সভ্যতার সূত্রপাত বা গোড়াপত্তন হতে শুরু করলো।
যা হোক, কেতাবি কর্কশ আলোচনায় না গিয়ে আমি একটু সহজভাবে, সাহিত্য ঢংয়ে তাদের জীবনের কিছু দিক তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
আমাদের সবারই একটা misconception বা ভুল ধারনা আছে, আর্যদের সম্পর্কে। তা হলো, আদৌ কি আর্য একটা জাতি???
না, আর্য মূলত একটা জাতি না, পৃথিবীর বিশাল একটা ভাষার স্রোত, যেটাকে আমরা ইন্দো ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী বলে থাকি, ঐ ভাষার যেকোন একটি ভাষায় কথা বলে, তারাই হলো আর্য।
আর্য শব্দের অর্থ কি?
আভিধানিক অর্থ হলো সৎ বংশজাত ব্যক্তি,
বিশেষ অর্থে, বিশ্বস্ত মানুষ বা 'একই জাতির মানুষ '।
সিন্ধু বিজয় হয় (১৮০০-১৩০০)খ্রীস্টপূর্বে, ভারতে অভিযান চালনাকারীরা নিজেদের আর্য বলতো, সংস্কৃতিতে এ শব্দটিকে (Arya), ফার্সীয় ধর্মগ্রন্থ জেন্দাবেস্তায় (Airya) বলা হতো। তার মোক্ষম ঐতিহাসিক প্রমান পাওয়া যায়।
★আর্যদের ভারতে আগমন ও সভ্যতা
ইতিহাসের বইগুলো থেকে যা জানা গেল, তা থেকে বলা যায়, মূলত ইরানের মালভূমি থেকে তাদের আগমন ঘটেছিল, তারা একদিন দুদিনে এদেশে আসেনি, বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ ভারতে পাড়ি জমানো শুরু করে তারা।
বেশিরভাগ সময়েই সমুদ্র পথে ভারতীয় উপকূলে জাহাজ বোঝাই করে এদেশে আসা শুরু করে, তবে স্থলপথ ধরেও কিছু সম্প্রদায় এদেশে এসেছিল বলেও ধারনা করা হয়।
Source
আমি যখন আর্যদের সামাজিক জীবনব্যবস্থা নিয়ে জানা শুরু করলাম তখন একটি বিষয়ে অবাক হলাম, যে তাদের সমাজে আধুনিক বিশ্বের মতো শ্রমবণ্টন ও বিবিধ পেশা নির্বাচনের কৌশল জানা ছিল।তখনকার দিনে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে ও ব্যবহারে অনেক এগিয়ে ছিল,
ভারত অভিযানে এসে প্রথম বসতি গড়ে ওঠে শতদ্রু ও যমুনা নদীর মধ্যবর্তী অন্ঞলে, যা মূলত 'আর্যাবর্ত ' নামে পরিচিতি লাভ করে। তারা স্থানীয় অনার্য গোষ্ঠী ও উপজাতিদের পরাস্ত করে সেখানে শক্তিশালী একটি সভ্যতা বিনির্মানে হাত লাগায়।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ৩৫০০ বছর আগে তারা সপ্তসিন্ধু অন্ঞলে গড়ে তুলে মধ্য ও দক্ষিণ ভারত জয় করে কলকাতা সংলগ্ন বাংলা অন্ঞলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
★সামাজিক জীবন :
আর্য সমাজ মূলত পিতৃতান্ত্রিক ছিল, নারীদের খুব একটা অধিকার দেয়া হতোনা, পরিবারগুলো ছিল একান্নবর্তী, আর পরিবারের প্রধানকে গৃহপতী বলা হতো।
আরেকটা বিস্ময়কর জিনিস ছিল, চিরায়ত হিন্দু সমাজের বর্ণ ব্যবস্থার মতো আর্যদের গোত্রগুলোও বর্ণবাদে বিভক্ত ছিল।
আর্যদের সমাজে মুদ্রার ব্যবহার ছিলনা তেমন, তখন দ্রব্যের বিনিময় প্রথা বলবৎ ছিল।
মোটকথা, আধুনিক ভারতবর্ষ বিনির্মানে ও এখনকার সভ্যতার যে রূপ আমরা দেখতে পাই, তার পুরোটা জুড়েই আর্যদের প্রভাব আছে।
পরবর্তী সময়কালীন যে প্রাচীন ভারতীয় সাম্রাজ্যগুলোর নাম জানি আমরা, সভ্যতার প্রাচীন যুগ হিসেবে যে সাম্রাজ্যগুলোকে ধরা হয়, অর্থাৎ, মৌর্য ও গুপ্ত সাম্রাজ্য সরাসরি আর্যদের থেকে আসা।
অন্যদিকে যে স্থানীয় বাসিন্দা গুলো আর্যদের আদি বাসভূমি, যেমন ইউরোপ, ককেশীয়া, ইরান, তুরান,কান্দাহার থেকে আসেনি, এদের থেকে একটু পূর্বে মঙ্গোলীয় বেল্টের তৃণভূমি, চারনভূমি অন্ঞল থেকে আর্যদের বহু পূর্বে এদেশে এসে বসেছিল, তাদের থেকেই এখনকার আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম, প্রান্তিক পাহাড়ী জনগোষ্ঠীগুলো হাজার বছর ধরে বসবাস করে আসছে, তারা প্রায় অনেকাংশেই পশ্চাৎপদ আর পশ্চিমা জ্ঞান বিমুখ জাতি।
আরেকটা বিষয় লক্ষ করার মতো আছে, তা হলো আফ্রিকা ছিল পৃথিবীর আদিভূমি, হিউম্যান রেইসের আদি প্রজাতিগুলোর ফসিল পাওয়া গেছে সেখানে, ভারত তাই অনেক যুগ ধরেই অনাবিষ্কৃত ছিল।
ইউরোপীয় সভ্যতার গোড়াপত্তনের অনেক পরে এসেই ভারতবর্ষে সভ্যতার ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছিল।
Source
আমি প্রাগৈতিহাসিক যুগে না গিয়ে এদেশীয় ইতিহাসে যতটুকু কুলোয়, যতটুকো সভ্যতার ইতিহাস আর আমার অনুমানে উঠে আসে তার আঙ্গিকে তুলে ধরতে চাইলাম। কারন, ভারতবর্ষে কারা এসেছিল, ঠিক কোন সময়ে, কীভাবে এখনকার সভ্যতা গড়ে উঠলো, ইউরোপীয়দের ও আমাদের ভারতীয় ও বাঙালী সমাজের মধ্যে একটি তুলনা করতে চাই, যাতে কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশজ সভ্যতার সন্ধানে তাই, আজ আর্যদের সম্বন্ধে সংক্ষেপে বললাম।
এতে করে পরবর্তী সময়কালীন অধুনা ইতিহাসটা জানা ও এর সভ্যতার ধারা জানা সহজ হয়ে যাবে।
আর্যদের ধর্ম, আবিষ্কার ও জ্ঞান বিজ্ঞান, প্রযুক্তিগত অবদান, সাহিত্য সংস্কৃতি নিয়ে পরবর্তী পর্বে একসাথে আর্যদের জীবনের বাকি অংশটুকু এবং অনার্য ও তার পরবর্তী সভ্যতার গল্পগুলো ও নানাদিক নিয়ে তুলে ধরবো আশা করি।
আজ এ পর্যন্তই রইলো। আমি ইদানীং একটু উৎসুক হয়ে প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস নিয়ে অনুসন্ধান চালাচ্ছি। আপনাদের থেকে ভালো রেসপন্স পেলে এ বিষয়ে আরো লিখব ইচ্ছা করি।
ধন্যবাদ।
সবার জন্য শুভকামনা ✌️👍💖