পরোপকার।
মানুষ মানুষের জন্য,কথাটা কানে এসে পড়ছে ভীষন,সকাল থেকে সন্ধ্যাবেলা পর্যন্ত একই মুহূর্ত মনের মধ্যে বন্দী হয়ে থাকাটা নিশ্চয়ই প্রমান করে অভিজ্ঞতাটা গুরুতর। এ পৃথিবীতে সব মানুষ একই রকম নয়,কেউ কেউ খুব ভালো হয়ে থাকে,এক মুহূর্তের পরিচয়ে আপন হয়ে যায় আবার কেউ আগন্তুক হয়েও উপকার করে।এ সবই মনের প্রসারতার সাক্ষী দেয়,কারো হৃদয় হয়তো আন্তরিকভাবেই দরাজ,কারো হৃদয় ততটা টানে না যতটা মন পাশে এসে দাঁড়ানোর সাহস সন্চার করে।
আজ,আপনাদের আমার সাথে ঘটা একটি ঘটনার কথা বলবো,তারপর কেন ঘটনাটি এত শত ঘটনার ভীড়ে মনে রেখাপাত করে তার স্বপক্ষের কিছু পরিশিষ্ট বিবৃত করবো।ঘটনাটা এহেন চমকপ্রদ কিছু নয়,তারপরো আমার কাছে ভালোই লেগেছে, কারন ভালোলাগার কিছু উপকরন এই ঘটনাটিতে ছিল, ইন্টারেস্টিং তবে সর্বোপরি, যখনই মনে করি তখন অকৃত্রিম ভালোলাগা আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায় মন,কিন্তু এ তো সম্ভব নয় পুরনো অতীতে ফিরে গিয়ে ঘটনাটা আবার মঞ্চস্থ করা।
Image
২ বছর আগে বেড়াতে যাচ্ছিলাম হালিশহর থেকে কদমতলী গ্রামে।বেশ আঁটঘাট বেঁধে রওয়ানা হয়েছিলাম,শহর ছেড়ে নদীর পাড় দিয়ে ঘুরে গ্রামের সৌন্দর্য উপভোগ করবো আর মনে মনে ভেবে রেখেছিলাম কীভাবে একটু ব্যস্ততার ফাঁকে পাওয়া সময়টা উপভোগ্য করে তোলা যায়। ব্যাগে করে নিজের লেখার ডায়েরিটা,পানির বোতল,মানিব্যাগে কিছু টাকাপয়সা,চশমাটা আর জামা কাপড় নিয়ে বেশ প্রস্তুতি নিয়েই হাঁটা ধরলাম।রেল স্টেশন বাড়ি থেকে বেশি দূরে নয়,৫ মিনিটেই পৌঁছানো যায় এমন রাস্তা, তাই হেঁটেই চলতে লাগলাম।দুপুর বেলা মাত্র ভাত খেয়ে বের হলাম এমন সময় তখন, দুপুরের কড়া রোদ ঝলমলে তপ্ততা নেই তখন,নরম আঁচের মিহি কিরনদীপ্তি পাচ্ছে,একটু জেঁকে বসা সুনসান ফুরফুরে বাতাসে শরীর রোমাঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি এক সময়ে বেলা গড়িয়ে কাত হচ্ছিল,আর আমি একেলা পথে হাঁটছি, আর মনে মনে ভাবছি,কি হতে পারে সামনে।মনে মনে একটা দৃশ্যপট আগে থেকে তৈরি করে রাখলাম,তারপর ভাবতে না ভাবতে চলে এলাম রেলওয়ে প্লাটফর্মে।
Image
ওখান থেকে একটা টিকিট কাটলাম, জানালার পাশের সিটটা দখলে নিলাম এবং ব্যাগটা চেক করতে থাকলাম।দেখলাম যে এই ৩ ঘন্টার জার্নিতে হাতে করে বসে থেকে আর বোকার মতো বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করা যাবে না, যদিনা একটা ভালো গল্পের বই,উপন্যাস টাইপের বই হাতে না থাকে।এ জন্য আগে ভাগে একটা ছোটগল্পের বই ব্যাগে জায়গা করে রেখেছি।এই মতো বসে থেকে বই পড়ছিলাম আর জানলা দিয়ে কতক্ষণ পরপর বাইরে তাকিয়ে খোদার হাতে গড়া অকৃত্রিম সৌন্দর্য অবলোকন করছিলাম, কি সুন্দর এই প্রকৃতি,আহা! চোখ জুড়ানো, ভুবন ভুলানো রূপ তার!দেখেই মন ঠান্ডা হয়ে যায়,যেমনটা এখন এই হাইভ ব্লগে বসে বসে লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে, সুশীতল রৌদ্রময় বিকেলের হৃদয়হরনীর পরশের যেই মোহাচ্ছন্নতা তাই টের পাচ্ছিলাম, এই অপরুপ সৌন্দর্য দেখে। এভাবে প্রথম ঘন্টা কাটলো,বিকেলের গোধূলি তখন শুরু হয়েছে, সন্ধ্যার আকাশে যেমন সূর্যমামা যাই যাই করে, তেমন করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল, অন্যদিকে ট্রেনটা ঝিকঝিক ঝিকঝিক করে সোজা পথে হেলেদুলে এগুতে থাকলো।আমি প্রথম গল্প পড়া শেষ করলাম মাত্র তখন।
ফ্লাক্সে করে কফি এনেছিলাম, ওটা গরমই ছিল তখন পর্যন্ত, কোন ভান্ড জাতীয় জিনিস মানে মগ বা কাপ না থাকায় ফ্লাক্স এ মুখ লাগিয়ে পান করছিলাম, এমন সময় এক আমড়াওয়ালার প্রবেশ আমার কম্পার্টমেন্টে।ঢুকেই হকারি রীতিতে আমড়া বিক্রি করার টোন দিল, একরকম পরিচিত শব্দ আওড়ানো, যা আমরা জানি সবাই,তেমন করে আমড়া বিক্রি করছিল।আমি ভাবলাম একটু আদা, লং, এলাচ জাতীয় কিছু মশলা ওনার কাছ থেকে কিনি,তাই ডাকলাম ওনাকে।উনি যথারীতি এলেন এবং আমার পাশের সিটটাতে বসলেন যেটা খালি ছিল।তো, আদা একটু মুখে দিয়ে চাবাতে লাগলাম, ৫ মিনিট পর একটু কেমন যেন অনুভব হতে লাগলো,মাথাটা হঠাৎ করে ঝিমঝিম করতে লাগলো,সাথে প্রচ্ড খিচুনি আর মাথাধরা, কিছুক্ষণের মধ্যেই নিদ্রামগ্ন হয়ে গেলাম,অজ্ঞানের মতো অচেতন হয়ে রইলাম,আর তেমন খেয়াল নেই পরের কয়েক ঘন্টা।
জ্ঞান ফিরে যখন হুঁশ হলো, তখন বুঝতে পারলাম,শালার আমড়া বিক্রেতার দেয়া আদা খেয়ে আমি এতক্ষণ অচেতন ছিলাম,একরকম লোকাল এনেস্থেটিক এজেন্ট যেটার কারনে এতক্ষণ জ্ঞান ফিরেনি।চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমার ব্যাগে রাখা টাকাপয়সা সব গায়েব,মোবাইলটা হাওয়া করে দিসে,একটা উপহার হিসেবে কেনা দামী ঘড়িটা ফুস হয়ে গেছে,এমনকি গল্পের বইটাও চুরি।সব হারিয়ে আমার তখন দিগ্বিদিক কিংকর্তব্যশূন্য অবস্থা, এমন সময় বসে রইলাম, কতক্ষণ চুপ করে।ট্রেনটা ঠিকই স্টেশনে থামলো। আমি আশা করছিলাম,পরিচিতজন কাউকে দেখে তার সাথে পুরো বৃত্তান্ত বলে ক্ষনিকের জন্য আশ্রয় নিব,কিন্তু নিয়তির ফেরে কাউকে দেখতে পেলাম না।
তখন রাত ৮ টা বাজে,আমার কাছে তখন ভাড়ার টাকা পর্যন্ত ছিল না,এমন সময় এক মাঝবয়সী লোক যাচ্ছিল পথ ধরে,তিনি এসে আমাকে দেখেই বুঝে নিলেন আমি বিপদে পড়েছি।কিছু মানুষ আছে যারা চোখের ভাষা বুঝতে পারে, অবস্থা বোঝানোর জন্য যাদের কাছে বাক্যবিনিময় করতে হয়না,একান্ত আপন মানুষের মতো পড়ে নেয় মনের কথা,তেমনি এক মানুষরুপি অবতার হয়ে তিনি এসে আমার কাছে হাজির হলেন তিনি।
এসেই বললেন,ভাই আপনি কি পথ হারিয়েছেন?কেউ আসেনি,আপনাকে নিতে,আমি বললাম, না ভাই,আমি অজ্ঞান পার্টির সজ্ঞানে চুরির শিকার একজন মানুষ, পথে ভ্রমনের সময় সব নিয়ে গেছে যা ছিল,এই কথা বলার পর তিনি সহমর্মি হয়ে আমায় বললেন,চলেন ভাই,আজ রাতটা এ গরীবের ঘরে আশ্রয় নিয়েন না হলে,আপনি আমার অতিথি, হয়তো মহান রাব্বুল আলামিন আপনাকে পাঠিয়েছেন আমার সাথে পরিচিত করানোর জন্য,আজ না হলে এখানেই থাকুন।
বিশ্বাস করবেন কিনা জানিনা,বেশ কিছু সময়, আমার সবকিছু ছিনতাই হয়ে যাবার পর আমার মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা একেবারে উঠে গিয়েছিল।কেমন নিঠুর হলে, একটা ট্রেনযাত্রীর সবকিছু টাকাকড়ি নিয়ে চম্পট দেয় অজ্ঞানে ছিনতাইকারীর দল, এ বিষয়টা আজো আমায় পীড়া দেয়,মনে মনে ভাবী আর এখনো তার হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়। এ ঘটনার পর যখন এই আগন্তুক লোকটা আমায় তার ঘরে আশ্রয় নেয়ার জন্য বললো, আমি প্রথমে দ্বিধান্বিত হলেও পরে তার মহানুভবতায় খুশি হয়ে তার সাথে চললাম।
একটু পরেই ঝড় বওয়া শুরু হলো।ভাগ্যিস ওনার ঘরে এসে পড়লাম, না হলে ঐ দিন আমার কি যে তা আর বলার অপেক্ষা রাখিনা। যা হোক,তারপর তার ঘরে গিয়ে গোসল সেরে ফেললাম,তারপর হাত ধুয়ে বাড়িতে যা ছিল তা দিয়েই আহার করলাম,কৈ মাছ ভাজী,মসুরের ডাল,পোড়া মরিচের সাথে কলমি শাক,হুমম,পুরো গ্রামীণ খাবার খেয়ে খুব পরিতৃপ্ত হলাম। খাবার শেষে উনাকে অশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানালাম, উনি এসবের উত্তরে শুধু বললেন, এ আমার কর্তব্য, বিপদে পড়া মানুষের সাহায্য করা।
রাতে সুন্দর করে আলাদা কক্ষে বালিশ পেতে দিয়ে বিছানা করে দিল,যেন আমি কতদিনকার পরিচিত এক অতিথি, প্রানপ্রিয় মেহমান, যাকে দেবতুল্য আতিথ্য দিতে হবে,এই ভেবে আমি এখনো পুলক বোধ করি কতটুকু মহানুভব ও নির্মল হৃদয়ের মানুষ ছিলেন তিনি।
তারপরের দিন, আমার হাতে ২০০০ টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, ভাই, আপনাকে আমার বাসায় নিয়ে দুমুঠো ভাত আপন করে, যত্নে খাইয়ে দেয়ার মধ্যে যে তৃপ্ততা পেলাম,তা ভুলবার নয়,ভালো থাকবেন,আমি একটি কাগজে ওনার নাম্বার নিলাম,কীভাবে যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো, বিদায়বেলায় তা ভেবে পাচ্ছিলাম না,তাকে আলিঙ্গন করে দু ফোঁটা চোখের জ্বল বয়ে গেল,আর আমি কদমতলীর উদ্যেশ্যে রওয়ানা দিলাম।
Image
এতক্ষণ যা বললাম,তাতে নিশ্চয়ই মনে হতে পারে এ লোকটি এত কিছু কেন করলো আমার জন্য?আমি তো তার পূর্বের পরিচিত নই,নইবা আপন কেউ, তবু কেন এতো আতিথেয়তা? কিন্তু, কি বলবো ভাই,সব প্রশ্নের উত্তর হয়তো দেয়া যায়না,তেমনি করে ঐ অজানা লোকটির হৃদয়ের স্বচ্ছতাও মাপা যায়না,কি অপরিমেয় হৃদ্যতা ছিল,আমার মতো অসহায়ের জন্যে, একটুক্ষণের ব্যবহারে ও খাতিরে বুঝতে বাকি রইলো না।
এ বৈপরীত্যে, দুটি ঘটনার বৈপরীত্যে, প্রথমে হৃদয়হীনতা ও নিঃস্ব করে দেয়ার মধ্যে যে পাশবিকতা,দ্বিতীয়ে এসে নিজেকে রক্ষা করার সম্বল ও দরবেশী আশ্রয়দানের মধ্যে কি দেখা যায়? শেষের ভালোতে এসে একটা শব্দই চোখে ভাসছে,পরোপকার হুম পরোপকার, এটাই সত্য, ভালো গুনগুলো বেঁচে থাকে মানুষের মাঝে,খারাপ অন্ধকারে হারিয়ে যায়, যেমনি কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সব খারাপ কাজ,মনের অগোচরে,সবখানে।এই ভেবে আবার আগের মতো হাঁটা ধরলাম,তারপর আমার পথ শেষ হলো,ভ্রমনের রমন ফুরালো,তারপর সমাপ্তি।