অনেকদিন কেটে যায়, কেন যে মন খারাপের রাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়, ঠিক যেন দূর থেকে ভেসে আসা এক চিলতে সোনালী আলো, প্রভা হয়ে উড়ে এসে দূরে দূরে জোনাকির রংগুলোকে ধূসর করে দেয়, জানা নেই। বোধহয় তার খোজ করি নি অনেকদিন, হঠাৎ কখন কেমন করে চোখের কোণে জল এসে খুব বেশি বেসামাল করে দিল মনটাকে। তবু খেই হারাতে দেই নি, বেশ অনেকটা সময় যখন পেরিয়ে গেছে, এ পৃথিবীর লোকালয়ের টানারেখা নতুন রূপ পেতে শুরু করলো।
Source
কারো জীবনে ঝড়ের সমন্বয় এসে পড়ে সময়ের বাঁকে বাঁকে, মনের অন্তরালে থেকে যখন বোধশক্তি পেয়ে বসে যে ঘটনাপঞ্জিমালা এমন না হয়ে অন্যরকমও হতে পারতো।হয়তো, একরাশ ভালোবাসাই জীবনটাকে অতৃপ্তির চরম শূন্যতা থেকে তুলে নিয়ে পরিপূর্ণ করে দিতে পারতো। আশার ওপর ভর করে মানুষ বেঁচে থাকে, পৃথিবীর বিরূপ রূপকে জয় করে নিতে চায়, খুব করে পেতে চায় যেটা বলে যায় অনেককিছু- ছোট্ট গল্প থেকে অপার সিন্ধু।
নিজের দিকে চেয়ে বুঝলাম, জীবনে অনেক গল্প মিলিয়েছি,চোখের দেখা যা অনেক দৃষ্টিপাতের সন্ধান দিয়েছে, অলখের অনিবারিত ছায়াঘেরা সৌন্দর্য হৃদয়কে হরণ করে নিয়েছে বারবার। জগতের দুঃখসুখ মিলেমিশে একাকার হয়েছে এ বাতিঘরে, তারপরো যখন অনেকগুলো বছরের পর আবার সে দিনগুলোর ছিটেফোঁটা ভেসে আসে, ঠিক যেমন করে শৈশবের শেষের সাদা মেঘ তুলোর মতো শরতের আকাশটাতে উড়ে যেত, ডানা মেলে তার ঠিক মাঝখানটাতে শঙ্খচিলের দল মুক্ত আকাশে পাখা জাপটে সারা, বোধহয় সে সময়, সে মুহুর্তে দিন বলে কিছু নেই, সারাবেলা হেসেখেলেই পার করা যায়, কিচ্ছু চাই না জীবনে আর !
কিন্তু, সেই সময়, আমার ছিল - আমারই রয়ে যাবে, এই মিনতি এই আক্ষেপ কোথায় পাব আর, যখন দিনগুলোকে খেয়াঘাটে বাঁধতে চেয়েছিলাম, এই ভেবে - কোন একদিন আমি রইবো না, যদি নবাগত নাবিকের দূত এসে পুনরায় শুরু করে আমার সেই রেখে যাওয়া সুর,তার আলোয় ভরা রজনীগন্ধার ঘ্রান, ফুলের মতো মোহের পরশে ছোঁয়া নির্মল অনুভূতি- তাহলেই আমি সার্থক।
মাঝখানে বছর পেরিয়ে যাবার ক্ষত খুব চড়া হয়ে দেখা দেয় যখন ব্যাথা অনুভূতি মিইয়ে যেতে থাকে। অচেনা অদেখা অদৃশ্য এক ব্যাথা যেটা ভালোবাসতে বলে আবার নতুন করে যখন ফিরে গিয়ে সেই সময়টাতে সে বলতে চেয়েছিল অনেক কিছু, কিন্তু পারে নি তার স্বভাবসুলভ লজ্জাবোধ তাকে আগলে রেখেছিল। পরিচয়পর্ব স্বল্প থেকে বাড়তে বাড়তে বেশ অনেকটা জেনে নেয়া হলো, বন্ধুত্ব আগন্তুকের পর্যায় থেকে গাঢ়তর হলো বৈকি - ঐ ভালোবাসাটাই হলো না। নিজের কাজ এসে ভীড় করে দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে - মনের নোঙর তীরে এসে ভিড়েছে, কিন্তু যাবার বেলা হয়ে আসলো৷
Source
জীবনের একটা পর্ব শেষ হয়, আরেকটা শুরু ; ঠিক যেমন পথচলা শেষ হয়, দীর্ঘ মুসাফিরের পথকষ্ট তার মন্জিলে এসে ভাটা পড়ে, তেমনি করে সেই আখ্যান ভোরের চিলতে রোদের মতো ত্বরায় যেতে লাগলো। তার সাথে শেষ দেখা যেদিন, সে সকালটি রোদ ফুটফুটে, আহা, সে বেলা কি যে অপরূপ প্রাণের মেলা পাখপাখালির আনাগোনা, আলোছায়া পুকরের ধারের গাছে গাছে, তার সাথে থাকা মাঠটির সবুজ ঘাসে ঘাসে শ্যামলীমার স্নিগ্ধতা ফুটে উঠেছে। একটি বিদায় অনুষ্ঠান মঞ্চস্থ হবে বলে, সারি সারি পুষ্পগুচ্ছ হাত থেকে হাতে,আর কিছু বন্ধুকে অনেকদিনের ছুটি দিতে হবে, তার রেশ ফুরোয় না।
আমার সাথে তার পূর্ণপরিচয়ের সুযোগ হয়ে ওঠে নি, স্বাভাবিক যখন নিজের জীবনের ঝড়ের মোকাবিলা করতে করতে জীবন ভাবতে সময় দেয় নি। মনের মন্দিরে যার আসা যাওয়া, তাকে চিনতে পারে এমন অনুভূতি ফুটে ওঠে নি৷ স্বপ্নরা খেলা করে বেড়ায়, কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে ছোঁয় - এমন দিন আসে নি যার জন্য অনেকদূরের পথ ক্রমশ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। সে আমাকে নিয়ে ভেবেছ অনেকটা কাল,আজো হয়তো ভাবে,কে জানে আজো তার মায়াবী কাজলকালো চোখ দুটো ভিজে ওঠে আমার কথা ভেবে, তার উত্তর পাই নি, সে যে দূরের আকাশে বাতাসে হাহাকার হয়ে উঠেছে।
বিকেলের দিনটাতে সবার থেকেই বিদায় নিলাম, সূর্য তার সবটুকু শক্তি নিগড়ে দিয়ে ক্লান্ত হয়ে নিজের ঘরে যাবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে, আলোরা অন্ধকারের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু, তার থেকে বিদায় নিতে পারলাম না, সে আমার সাথে দুদন্ড কথা বলতে চেয়েছিল, আমি তাকে বিদায়বেলার করূন সুরে জড়াতে চাইনি, বোধহয় তার চলে যাওয়া আমার হৃদয় কখনো মেনে নিতে পারেনি।
Source
সে দিন চলে গেল, তাকে আর কখনো বাস্তবের চোখের দেখায় দেখতে পাইনি। সোশ্যাল মিডিয়া ঘেঁটে হয়রান হওয়া প্রতিদিন, তবু তার দেখা মেলা ভার হলো। সে প্রান্তর যখনই ফুটে ওঠে আবার, খালি খালি চোখ অশ্রুজলে মিশে যায়, এক স্বপ্নে মিলতে চেয়েছিল আকাঙ্খা, সে অব্যাক্ত ওয়াদা নির্মোহে ভেঙে যাবে, এই যদি ছিল ভাগ্যে, তবে হেরে যাওয়াই শ্রেয়,হারিয়ে যাওয়াই ঢের ভালো, মুহুর্তের পালে মিশে যাওয়াই কীর্তিরাখা।