জীবনের সবচাইতে ভালো সময় স্কুলজীবনটাকেই বলা চলে। সেই সময়টায় ছিলোনা কোন বাধা আর পিছুটান। বন্ধুত্বের মধ্যে ছিলোনা কোন স্বার্থ। ইচ্ছেমতোএখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো যেতো৷ বন্ধুদের সাথে স্কুলের আশেপাশে অনেক আড্ডা দেওয়া হলেও কখনও দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া হতো না। ছোট ছিলাম তাই রাস্তাঘাটও ঠিকমতো চিনতাম না। শুধু মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের সাথে আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম।
আমি তখন নতুন নবম শেনীতে পদার্পন করেছি। স্কুলে এবার জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল খুবই ভাল হয়েছে। চারদিকে স্কুলের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। তা নিয়ে শিক্ষকরাও খুবই খুশি৷ হঠাৎ করে শিক্ষার্থীদের আরো বেশি উৎসাহ দিতে প্রথমবারের মতো কোথাও শিক্ষা সফরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় স্কুলের ম্যানেজমেন্ট এবং শিক্ষকেরা।
শিক্ষা সফর স্পট হিসেবে বেছে নেয়া হয় নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্ককে। চাদা হিসেবে নির্ধারণ করা হয় ৭০০ টাকা জনপ্রতি। স্কুলের সবাই এ বিষয়টা নিয়ে খুবই উচ্ছাসিত ছিলো৷ দুই দিনের মাথায় আমার অনেক বন্ধুবান্ধব রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করে ফেলে। আমিও খুব করে চাচ্ছিলাম সবার সাথে শিক্ষা সফরে যাওয়ার।
কিন্তু বাবা মা আমাকে কখনো কোথাও একা যেতো দিতোনা। সবার মতো তাদেরও ভয় ছিলো যদি আমার ছেলে হারিয়ে যায়! কিন্তু আমি কখনো তাদের কথা শুনতাম না। তাই মাঝে মাঝে কেলানিও খেতাম খুব। তাই ভয় ছিলো বাবা মা আমাকে শিক্ষা সফরে যেতে দিবেনা । ঠিক তাই হলো! সাহস করে বললাম ঠিকই, কিন্তু শোনা মাত্রই একদম না।
সেদিন থেকে বাবা-মায়ের সাথে রাগ করে খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। একটা পর্যায়ে এই ছোট্ট মানুষটার বিষন্নতা দেখে বাবা আর মানা করতে পারেননি। একেবারে শেষ সময়ে রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করি আমি।
শিক্ষা সফরের দিন আমার ঘুম ভোররাতেই ভেঙ্গে যায়। উঠেই গোসল কোনমতে খাওয়াদাওয়া শেষ করে আমি হাজির স্কুল ক্যাম্পাসে। এসে দেখি দু-একজন ছাড়া কেউ ই নাই ক্যাম্পাসে। খুব তাড়াতাড়ি এসে পড়েছি আমি। যাইহোক একঘন্টা পর সবাই আসতে লাগলো। সকাল নয়টায় আমাদের বাস রওনা হলো নরসিংদীর ড্রিম হলিডে পার্ক এর উদ্দেশ্যে। বাসেই আমাদের জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। তাই আবারো নাস্তা সেরে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে দিতে আমরা পৌঁছে যায় গন্তব্যে।
আজ সারাদিন এখানেই অবস্থান করবো আমরা। প্রথমে গেইট পাস করেই আমরা পুরো জায়গাটা একবার ঘুরে নেই। তারপর শুরু হয় আমাদের বিভিন্ন রাইডে চড়া। প্রথমে এক চড়কিতে উঠে প্রায় এক ঘন্টা মাথা ঘুরালো৷ তারপর উঠলাম স্পিড বোর্ডে । বন্ধুরা মিলে হই হুল্লোর করতে করতে আরো দুইটা রাইডে চড়া শেষ করে এবার আমাদের পালা দুপুরের খাবার খাওয়ার। আমাদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যাবস্থা আগেই করে রাখা হয়েছিলো। কোনরকমে খাবারটা খেয়ে আবারও শুরু আমাদের আড্ডা আর ঘুরাঘুরির।
একটু পর সুইমিং পুলে গোসল করতে নেমে পরি আমরা কয়েকজন বন্ধু। প্রায় একঘন্টা ধরে চলে আমাদের পানিতে গোলস কার্যক্রম। তারপর উঠেই আবার রাইডে চড়া শুরু। দেখতে দেখতেই সন্ধ্যা নেমে আসে। শিক্ষকরা এবার আমাদের ডেকে বাসে নিয়ে আসে। আমাদের বাস পূনরায় চলতে শুরু করে স্কুল ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে । চলে আসতে খুবই মন খারাপ লাগছিলো আমার। মনে হচ্ছিলো আর একটা দিন কি থাকা যায়না? তিনঘন্টা পর রাত দশটায় মধ্যেই আমরা পৌছে যাই যার যার বাড়িতে।
জীবনের প্রথম ভ্রমনের অভিজ্ঞতা ছিলো খুবই আনন্দের। এখনো আমি খুব মিস করি সেই দিনটাকে। যাদেরকে সাথে নিয়ে ওই দিনটা এতো আনন্দের কেটেছিলো আজ তাদের অধিকাংশের সাথেই নেই কোন যোগাযোগ। সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে অনেক কিছুই। তবে সেই সময়টাই ছিলো সবচাইতে ভালো সময়।