ছুটির দিনটা আর সব আটপৌরে সাংসারিক লোকের মতো আমার কাছেও বহু আরাধ্যের দিন।
আমার গিন্নী ভাগ্যও বড় সুপ্রসন্ন, তার কোনো ঝামেলা নেই।
কেবল সকাল বেলা তাকে বাজার করে দাও, তারপর ছুটি সারদিনের মনে। আমায় আর কেউ ঘাঁটায় না। নিয়ম করে মা'র সাথে দুটো খুচরো কথাও সেরে ফেলি চা খেতে খেতে। পাড়ায় কার ঘরে কি হলো সে কিচ্ছে ফেঁদে বসার আগেই চট করে সটকে পড়ি বাজার করতে যাবার নাম করে।
কেবল পার্থ (আমার ছেলে) সপ্তাহান্তে কাছে পেয়ে একটু গা ঘেঁষে ঘেঁষে থাকে সারাক্ষণ। তবে ওতে অসুবিধে নেই। ছেলে হিসাবে সে বড়ই শান্ত। যেকোনো মেয়ের থেকে ক'গুণ বেশী লক্ষী।
আর ছুটিরদিনের আগের রাতে চলে সমীরদা মিলে পাড়ার ছেলেদের সাথে রাতভর আড্ডা। অনাদিকাল ধরে চলে আসা এই গতানুগতিক জীবন আমাদের।
বহুদিনের এই নৈমিত্তিক গতানুগতিক জীবনে আজকে বাঁধা পড়েছে। বিঘ্ন ঘটিয়েছে গতকাল সন্ধ্যেয় ডাকযোগে পাওয়া চিঠিখানা।
ঘুমাইনি গতকাল রাতে।
বহু বছরের অভ্যাসগত সে আসরও হয়নি কাল।
সমীরদার ওখানেই ছিলাম মধ্যরাত অব্দি।
বাকি রাত কেটেছে পড়ার ঘরে, এপাশ-ওপাশ করে। যখন দেখি সূর্য দেবতা উঁকি দিচ্ছে, উঠে এসে চোখে মুখে জল দিলাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে মনে হলো হঠাৎ আমার বয়স বেড়ে গিয়েছে কয়েক বছর। চোখ জোড়া লাল।
আজ ছুটির দিন। বাড়ি নীরব।
সবাই ঘুমোচ্ছে। মা'র ঘরে উঁকি দিয়ে দেখি, মা পাঠ করছে। কি মনে হলো, যেয়ে পাশে বসলাম। মা চমকেই উঠলো!
ঃ ওমা! এত ভোরে উঠে গেলি!
ঃ হু।
আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মা'র মুখটা শুকিয়ে গেলো।
ঃ কিরে শরীর খারাপ নাকি! এমন অবস্থা কেনো!
ঃ কিছুনা মা। কাজ করছিলাম একটু কাল।
আমাদের ছুটকো কথার মাঝে অনিলা উঁকি দিল। আমাদের একসাথে ওভাবে বসে গল্প করতে দেখে সহাস্যে বলে উঠলো-
ঃ ও বাবা! সূর্য আজ কোনদিকে উঠলো।
মা হাসলো। সুখী একটা হাসি। অনেকদ দিন পর ছেলে তার কাছে আশ্রয় চেয়েছে তা বুঝতে বাকি নেই। মা'কে হাসতে দেখে আমারও ভালো লাগলো। মা'র পাঠ শেষে আমরা খাবার ঘরে টেবিলে এসে বসলাম।
গতকাল সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরতেই অনিলা বললো, "তোমার চিঠি এসেছে। পড়ার ঘরে টেবিলে রেখেছি।"
আমাকে আবার চিঠি কে লিখবে- ভাবতে ভাবতে এগিয়ে গেলাম। চিঠি হাতে নিয়ে প্রেরকের নাম দেখেই পৃথিবী দুলে উঠলো।
চিঠি পকেটে পুরে বেরিয়ে গেলাম সমীরদার বাসার উদ্দ্যেশ্যে। পথে গিন্নী ধরলো-
ঃ আরে! হাত মুখ না ধুয়ে, কিছু মুখে না দিয়ে কই চললে!
ঃ (ওর দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলাম) আসছি!
দরজায় নক করতেই দাদা এসে খুলে দিল।
ঃ আরে আজ এত জলদি এলি! আমি মাত্র দোকান বেঁধে ঢুকলাম ঘরে।
ঃ এলাম আরকি।
ঃ আচ্ছা ভেতরে আয়। চা খাবিতো!
ঃ হু!
বালিশের তলা খুঁজে সিগারেট পেয়ে একটা ধরিয়ে খাটের পাশে মেঝেতে সটান বসে পড়লাম। তা দেখে সমীরদা হাঁ হাঁ করে উঠলো!
ঃ সে কী রে! বুড়ো বয়সে এসে আবাব্র প্রেমে পড়লি না বিরহে পড়লি!
সিগারেটে টান দিতেই খুকখুক করে কাশলাম। অনেকদিন পর সিগারেট খেলে যা হয়। এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে উত্তর দিলাম-
ঃ দুটোই! পুরোনো প্রেমে নতুন করে বিরহ জন্মেছে।
ঃ এ্যাঁ?
ঃ আমার দেবী দর্শন হলো সেদিন। অনিলাকে নিয়ে পুজোর কেনাকাটা করতে যেয়ে রাই'এর সাথে দেখা।
খাবি খেলো বোধহয় দাদাও।
আমার সিগারেটের টান আরো লম্বা হলো। কাশির জোর আরো বাড়লো। এছাড়া আশেপাশে বাকি সব নীরব। দাদা নিঃশব্দে দু'কাপ চা নিয়ে এসে এক কাপ আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে পাশে মেঝেতে বসলো।
প্রায় নিঃশব্দেই দু'জনে চা শেষ করলাম। পকেট থেকে কাঁপা হাতে চিঠিটা বের করলাম। খোলার সাহস হচ্ছেনা।
ঃ রাইএর চিঠি!
ঃ হু
ঃ পড়বিনা?
ঃ সাহস পাচ্ছিনা।
সমীরদা চিঠিটা নিয়ে, খাম খুলে বের করে আমার হাতে দিল। "পড়!"
বাঘের তাড়া খাওয়া হরিণের মত দুরুদুর বুকে, কাঁপা হাতে রাই'এর চিঠিটা পড়া শুরু করলাম। পড়া শেষে টের পেলাম চোখের পানিতে বুকের কাছটা ভিজে গেছে।
এরকম অনুভুতির ক্ষেত্রে বাক্যালাপের প্রয়োজন হয়না আসলে।
সমীরদা অন্তৎ আন্দাজ করতে পারছে কি চলছে আমার মাঝে। আমিও সমীরদার কাছে শুধু এই নিঃশব্দ উপস্থিতির অস্তিত্ত্বের জন্য এসেছি। কোনো সান্ত্বনা, কোনো উপদেশ কিচ্ছু না।
ঃ দাদা!
ঃ উঁ?
ঃ বড্ড দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে ওকে। আকুলি বিকুলি করছে প্রাণটা!
ঃ হু
ঃ আমি কি একবার টেলিফোন করবো? নাকি একটা চিঠি লিখবো?
ঃ অনি...
ঃ দাদা! আমি... (গলা ধরে এলো। চোখ জ্বলছে)
দাদা কাঁধে হাত দিলো। গলা ছেড়ে, প্রাণখুলে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পুরুষ মানুষের কি কান্না শোভা পায়!
এই নিদারুণ দ্বান্দিক অর্ন্তজ্বালা, একান্তে পাওয়া এ অসীম সুখ, এই অপ্রাপ্তির মর্মবেদনা...
সব মিশেলের এ অনুভূতিতে ভীষণ দিশেহারা লাগছে। সেদিনের ওকে চোখে ভাসছে।
আহা!
কত বছর পর দেখলাম। পরিমিত হাসি, স্বল্প বাচন, পরিণত চাহনি।
সেই উত্তাল ঢেউয়ের ন্যায় সদা চঞ্চল তন্বী এখন দিঘীর জলের মত। কি শান্ত, স্থির! সেই দস্যি, পাড়াকুঁদুলি এখন আঁচল ঘুরিয়ে পরা এক পরিণত রমণী!
#RaiAnirudhha