মাহমুদের প্রথম বই মোঘলনামা কেনা হলেও, পড়া হয়নি প্রথমেই। এই পড়বো পড়বো করে হঠাৎ একদিন আগ্রহ জাগায় হাতে তুলে নেই দ্রৌপদী।
তখনো পদ্মা সেতু চালু হয়নি। চাকরি-বাকরি ছেড়ে আবার যখন ইতিউতি করছিলাম, বরিশাল আর বরগুনা ঘুরবার মোক্ষম সুযোগ চলে এলো।
বরিশাল যাবার লঞ্চে এপাশ ওপাশ করতে করতে হাতে তুলে নিলাম দ্রৌপদী; কিনেছিলাম একইসাথে তিনটে বইমেলা থেকে, দ্রৌপদী, রাধেয়, আর শকুনি উবাচ।
বরিশাল-পটুয়াখালী-বরগুনা ঘুরতে ঘুরতে পড়ে ফেললাম একটানে তিনটে বই-ই, মহাভারতের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোর মাঝে কয়েকটি।
একমাত্র লাইম লাইটে থাকা মহিলা হিসাবে দ্রৌপদীর হয়তো তেমন কোনো আঙ্গিক খুব একটা নতুন ঠেকবেনা অনেকের কাছে।
অন্তত যারা মহাভারত নিয়ে পড়েছেন টুকটাক, কিন্তু রাধেয় আর শকুনি উবাচ বই দুটি নিঃসন্দেহে কৌতূহল নিয়ে নাড়াচাড়া করবার সুযোগ দিবে মনকে।
ইতিপূর্বে মহাভারত বেশ চোস্ত একটা উপাখ্যান হলেও, এর কোনো পুরুষই মন্ত্রে মুগ্ধ করেনি ওভাবে, মানে যাকে বলে দিওয়ানা বানানো।
যুধিষ্টীর গোঁড়া আইডিয়ালিস্টিক, অর্জুন কল্পনার প্রেমিক পুরুষ হবার মতো সুপুরুষ কিন্তু প্রেমিক হিসাবে নিতান্ত কাপুরুষ, আর কৃষ্ণতো হিসাবের বাইরে। নকুল, সহোদরকে সবসময় পাড়ার
পরশুরামের প্রতি একটা আকর্ষণ আছে বটে, তবে ওখানে সমীহই বেশি।
এবং বাকিরা ইত্যাদি ইত্যাদি।
আর কর্ণ?
অদ্ভুত! কর্ণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত চিত্রে থাকে, অথচ কোনো এক ভৌতিক কারণে কর্ণ একটা পর্দার আড়ালে থেকে গেছে।
রাধেয় পড়বার আগে কল্পনাও করা যায়না যে, কর্ণ কতটা জুড়ে ছিল। নিঃসন্দেহেই "রাধেয়" আমার বই হিসাবে সবসায়ীয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে।
যদিও শুনেছিলাম দুর্যোধনকে ফোকাস করে আলাদাভাবে বই লেখা হয়েছিল, এবং তার প্রতি কৌতূহল কোনো অংশেই কম নেই, তবে পড়া হয়ে ওঠেনি। মাহমুদের লেখার কৌতূহল থেকেই দ্রৌপদী পড়া, আর সে মুগ্ধতায় একটানে পরে ফেলা "রাধেয়" আর "শকুনি-উবাচ" পরে মাহমুদ আরো দুটো বই লিখেছে, যেগুলো বেশ প্রশংসিত হতে দেখেছি, "বেলাভূমি" আর "রঙ মিলান্তি" আপাতত এ প্রসঙ্গে তোলা থাক।
শ'খানেক পুরুষের নাটকের মাঝে লাইম লাইটে থাকা (প্রায়) একমাত্র নারী চরিত্র হিসাবে দ্রৌপদীর ব্যাপারে জানাশোনার একটা বিস্তৃতি ছিলো বটে।
তবে, এই বইতে দ্রৌপদীর আবেগ, রাগ-অনুরাগ, আর বেশীরভাগটা জুড়েই ছিলো পার্থ অর্থাৎ আমাদের অর্জুন।
দ্রৌপদীকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হওয়া মহাভারত, পাঞ্চালরাজ দ্রুপদের আবির্ভাব থেকে শুরু করে, যজ্ঞের জোগাড় আর যজ্ঞবেদী থেকে উদ্ভুত অগ্নিকন্যা পাঞ্চালি/ দ্রৌপদীর বেড়ে ওঠা থেকে কুরুক্ষেত্র পর্যন্ত বয়ে বেড়ানো সে ঘটনাসম্বলিত জীবন।
এই বই পড়বার পরে যে আক্ষেপটা কাজ করে তা হলো, প্রায় সকলেই দ্রৌপদীকে চেনে কেবল হস্তিনাপুরের রাজসভার বস্ত্রহরণ ঘটনার দ্বারা।
এবং বলা বাহুল্য কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পেছনে মোক্ষম একটা কারণ এটা হলেও, পাঞ্চালির কিন্তু আরো জীবন ছিল তারও আগে পরে।
বাবার আহ্লাদের কৃষ্ণা, প্রানচাল রাজ্যের রাজকুমারী পাঞ্চালি, দ্রুপদের কন্যা দ্রৌপদী, কৃষ্ণের বন্ধু হয়ে ওঠা থেকে শুরু করে কুন্তীর ঘরের বৌ হওয়া, পাঁচ-স্বামীর সাথে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সংসার করার এই যে অভিনব এক উপাখ্যান, আর সব থেকে স্ফুটিত, প্রাণের সখা পার্থর সাথে প্রাণে প্রাণ মেলানো প্রেমের থেকে বিরহের যে রিক্ত বেদন, এই দারুন গল্পগুলো থেকে গেছে আড়ালে।
রাজা বিক্রমাদিত্যের নবরত্নের সভায় কালিদাসের মাধ্যমে গল্প পেশ করার এই দারুণ ধারণাটাও আমার পছন্দ হয়েছে খুউব।
বাকি বিস্তারিত পড়তে হলে ছোটোখাটো একটা রিভিউ লিখেছিলাম, ওখান থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে।
দ্রৌপদী শেষ করেই ধরেছিলাম "রাধেয়", আন্দাজ আগে করতে পারিনি যে এটা কর্ণ'কে নিয়ে ছিল।
প্রথমেই একটা অভিযোগ থাকবে মাহমুদের জন্য যে বইটা তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত লেগেছে, ঠিক মাঝখানের দিকে এসে বইটা যেন বেক্ষাপা রকম একটা লাফ দেয় মাঝখানের কিছু প্রসঙ্গ থেকে।
তবে এছাড়া আর কোথাও অভিযোগ জানবার অবকাশ লেখক সাহেব রাখেন নাই। একই রকম চমৎকার দক্ষতায় এঁকেছেন কর্ণকে।
এ প্রসঙ্গে একটা কথা না বললেই নয়, অনেক বছর আগে, ওবায়েদ হকের "নীল পাহাড়" বইটা পড়বার পর যেমন একটা লাইন (যেটা ছিল: "মা প্রথম জীবনে এসেছিলো স্লেটে করে, ম এর সাথে আ'কার হয়ে 'মা' হয়েছিলো"! পড়েই মনে হয়েছিল, আরে!! কেউ একটা লাইন এভাবেও ভাবতে পারে!?) আজীবনের জন্য মাথায় গেঁথে গেছে, তেমনি রাধেয়'তেও সেটা হয়েছে।
লাইনটা ছিল একটা বিস্তৃত পরিসরে আকাঁ প্লটের পরে ছোট্ট একটা লাইন,
"আমি কৌন্তেয় নই, রাধেয়!"
সমগ্র বইটার সারমর্ম এখানে চলে আসে, কিন্তু সেটার পরিপূর্ণ উপলব্ধি হবে বইটা পড়া শেষে।
বাকি বিস্তারিত পড়তে হলে ছোটোখাটো একটা রিভিউ লিখেছিলাম, ওখান থেকে দেখে নেয়া যেতে পারে।
এবং খুব একটা বিরতি না নিয়েই পড়েছিলাম, শকুনি-উবাচ।
বলা বাহুল্য, শকুনি মামা প্রধান চরিত্রগুলোর মাঝেই একটি। মনে হতেই পারে যে আসলে এই যে, গান্ধারের যুবরাজ ও পরবর্তীতে হওয়া গান্ধার রাজ শকুনির নিজের রাজ্য ফেলে গান্ধারীর পাশে, কৌরবদের কাছে পড়ে থাকা, আর তাদেরকে চালিত করবার যে প্রবণতা, এইটা আপাত দৃষ্টে কোনো কৌতূহলের সৃষ্টি করেন বটে। কিন্তু, যদি ভেবে দেখা হয়, যে লোকটি সবকিছু ছেড়েছুড়ে এইরকম অবহেলিত হয়েও কেন পড়ে থাকলো হস্তিনাপুরে, তাহলে একটা নতুন দর্শনের দেখা মেলে, যেটা হয়তো সচারচর ভেবে দেখা হয়না।
এবং এখানেও গল্প-কথার ছলে শকুনির চরিত্র আলোচনার খাতিরে গল্পের এ উপস্থাপন আমার দারুন লেগেছে।
সেই সাথে সে ব্যাপারটাও যেখানে শেষে খুব অভিনব এক রহস্যের জটের সন্ধান দিয়ে না খুলেই শেষ করাটা।
All the contents are mine untill it’s mentioned