খেয়াল করে দেখলাম, এই ব্যাপারটা আসলেই এভাবে ভাবিনি।
পিয়েরে লোতির গল্পের চেয়েও, তার লেখনিতে যেটা বিশেষভাবে লক্ষণীয় কিন্তু প্রায় সব সময় পাঠক এবং হয়তো অনেক লেখকও খেয়াল করেন না তা হলো, অদেখা, অজানা প্রকৃতি বা দেশ নিয়ে তার নিখুঁত বর্ণনা দিতে পারবার এই অভাবনীয় ব্যাপার।
মুজতবা সাহেবের কথায় আসলেই মনে হলো, বিশ্বের দরবারে সমাদৃত আমাদের রবী ঠাকুর, সাহিত্যের পরতে পরতে সদম্ভে বিচরণ করলেও, মোপাসাঁ আর চেখফের সাথে পাল্লা দিলেও, পিয়েরে লোতির মতো, ওই চৌকাঠ রবি ঠাকুর মাড়াননি।
এবং মুজতবা এই বিবৃতি মতে যে, "নিজে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) অনেক, শীতপ্রধান দেশের স্নো কিংবা পাতা ঝরা হেমন্তের কোনো বর্ণনা তার গল্প-কবিতায় আনেননি।", অনেকটাই আমাকে ভাবিয়েছে, যে বিশেষত সাহিত্যের একটা অংশে যে কতভাবে দৃকপাত করা যায়, কত একে বিচার করা যায়, অন্যের থেকে আলাদা করা যায়, একজন পাঠক হিসাবে এটা আমি মুজতবার কাছেই শিখেছি।
শেখার পর, সাহিত্যরস আস্বাদন আমার কাছে একেবারে নতুন এক রূপে ধরা দিয়েছে, যেন বইয়ের সাহিত্যরস আস্বাদনের পাশাপাশি বোনাস হিসাবে আরো মজার একটা দিকে উপভোগ করা শিখেছি।
ছোটোগল্প রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকেই পাওয়া।
সাহিত্যের অন্যান্য জনরার মাঝে ছোটোগল্পের উত্থান পতনের বা এর বিশেষত্ব নিয়ে ওভাবে কখনো ভাবা বা জানা হয়নি। নতুন নতুন এই ব্যাপারগুলো জেনে বেশ দারুণ লাগছে!
প্রথম মুজতবা পড়েছিলাম অনেক আগে।
তখন বই খাবার তাড়া অনেক ছিল। মুজতবা যদিও ইদানীংকালে হঠাৎ জনপ্রিয়তা, সমাদর পেয়েছে পাঠক সমাজে, তবে সে সময় মুজতবা গল্প এমন ঘরে ঘরে হয়নি।
অদ্ভুত ব্যাপার, মুজতবার "শবনম" কিন্তু পাঠকের মুখে মুখে চলেছে সবসময়ই, কিন্তু বছর কতক আগে অব্দি, মুজতবা শবনম-এই আটকে ছিলেন।
শবনম আমার খুব একটা আহামরি লাগেনি, খুব সম্ভব সেই উৎকৃষ্ট মানের গীতিকথা আমার অপরিপক্ক মনের সাথে ঠিক পাজলের খাপ ছাড়া টুকরার মতো খাপে খাপে বসতে পারেনি। আবার এও হতে পারে, তখন সেবার অনুবাদ, ক্লাসিক, ওয়েস্টার্র্ন পড়তে পড়তে একটা একঘেঁয়ে ঘোরে আটকে ছিল আমার স্বাদ।
তারপর একদিন কি মনে করে বইয়ের দোকান থেকে গোটা কতক মুজতবা নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
অলাতচক্র, পঞ্চতন্ত্র, দেশে বিদেশে।
তখন কলেজে ইউনিভার্সিটিতে পড়বার বয়স, বলাই বাহুল্য বই পড়বার অভ্যেস আর ব্যাকবেঞ্চার হবার সুবাদে, সেটা আমার বই পড়বার যৌবনকাল বলা যায়।
স্কুলে থাকতে পকেটমানি ছিলোনা, পড়াশোনা নিয়ে বাসায় ধরপাকড় বেশি ছিল, আর চাকরিজীবনে অফুরন্ত টাকা (মানে অন্তত বই কেনার জন্য) কিন্তু সেই উদ্যোম আর সময় নেই।
তো হাইস্কুল শেষ করার পরের আর চাকরি জীবন শুরু করবার আগের সময়টাই বই পড়বার যৌবনকালই ছিল বটে।
যাক সে কথা, তো সে সময় টুকটাক পয়সার জোগানের একটা ব্যবস্থা হওয়ায়, মিথ্যে বলে বলে ভালোই পয়সা বাগানো যেত। সেরকমই এক শুভদিনে, খানা কতক মুজতবা এনে তপ্ত পড়ে ফেললুম।
কিন্তু এখন মনে করতে চেয়ে দেখলাম, খুব একটা কিছু মনে নেই।
এখন নতুন করে "পঞ্চতন্ত্র" পড়তে যেয়ে আবিষ্কার করলাম, পঞ্চন্ত্র তখন বড় খটমটে লেগেছিলো, এমনও হতে পারে, পুরোটা শেষই করিনি!
অথচ এখন কি অসাধারণ তৃপ্তিকর আর সুস্বাদুই না লাগছে!
All the contents are mine untill mentioned otherwise.