আকাশ
দুনিয়াতে থাকা এতসব শব্দ আর প্রতিশব্দের মাঝে আমার আকাশ শব্দটা ভীষণ প্রিয়। এটা শুধু একটা শব্দ না। এটা আমার অকারণ মন ভালো করার মন্ত্র, আমার জমানো রঙিন অনুভূতি, আমার বিশাল স্মৃতির ডায়েরি, আমার না বলা কথাগুলোর খুব সুন্দর একটা বহিঃপ্রকাশ এই আকাশ। আকাশের প্রতিটা রং আমার ভীষণ চেনা। সবে মাত্র পূর্ব দিকটায় সূর্য উঠছে তখন আকাশের যে রং তা থেকে শুরু করে হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গা রাতের আকাশটার রংটাও আমার খুব চেনা। একদম ভোরের দিকে, যখন এই শহরের সব মানুষ ঘুমোতে ব্যাস্ত, তখন আমি আকাশটা দেখি। ধূসর রঙের উপর বেগুনি আর গোলাপী রংটা মিশিয়ে ঢেলে দিলে ঠিক যেমন টা দেখায় তখন আকাশের রং টা দেখতে তেমন লাগে। এত বেশি সুন্দর আর প্রাণখোলা, খুব একটা স্বস্তি কাজ করে তখন ভেতরে ওই আকাশটা দেখলে। ধীরে ধীরে মেঘগুলো ভাসতে থাকে, ধূসর রংটা ক্রমশঃ হালকা হয়ে আসে। আর তার উপর থাকা বেগুনি রংটা কেমন একটা লাল আভা ধারণ করতে থাকে নিজের ইচ্ছেমত। আর গোলাপী রংটা রূপ নেয় গাঢ় কমলায়। আস্তে আস্তে আমি হারাতে থাকি ওই রঙের গভীরে। কেমন যেনো একটা টান কাজ করে ভেতর থেকে ওই আকাশটার জন্য। ধীরে ধীরে ধূসর রংটা কোথায় যেনো মিলিয়ে যাচ্ছে মনে হয়। আর লাল আভা টা হালকা হয়, উপরের মেঘগুলো খুব সুন্দর একটা হলুদ আভায় নিজেদের সাজাতে শুরু করে। আর ওই হলুদ আভাটা যখন আমার মুখ, কপাল সব ছুঁয়ে যায় মনে হয় শুধু এই আভাটার মধ্যেই কি যেনো একটা অদৃশ্য মায়া যা আমি পেয়ে গেছি চাওয়া ছাড়াই।
তারপর সূর্য মামার উকি দেয়ার সময় হয়ে আসে। রাতের ধূসর কালো রং টা পারি জমায় নিজের দেশে আর চারপাশ টা কেমন আলো হয়ে আসে। আকাশের নীল রংটা এই সময় দেখলে হালকা আকাশী মনে হয়। ভীষণ সুন্দর একটা রং। ওই আকাশীর গায়ে লাল আভা মিলিয়ে গিয়ে হলুদ আভায় সূর্য উকি দেয়। চারপাশের পাখির ডাকগুলো তখন আমার শোনা সবচেয়ে সুন্দর গান মনে হয়। একটা দুটো করে রাস্তায় গাড়ি চলা শুরু হয়। ব্যাস্ততার এই সবে শুরু! রংগুলো ঠিকমত গুনে ওঠার আগের দেখি খুব গর্ব করে সূর্যটা জেগে ওঠে আমার প্রিয় আকাশটার বুকে। কি যে সুন্দর! করমচার মত টকটকে লাল একটা সূর্য ধীরে ধীরে কেমন কমলা থেকে হলুদ হয়ে যায়। পূর্ব দিক থেকে আস্তে আস্তে উপরে উঠতে থাকে। এই ফাঁকে এক কাপ চা নিয়ে আবার এসে বসি জানালার সামনে। দেখতে দেখতে সকাল টা পেরিয়ে হয় আমার ওই আকাশের প্রতি মুগ্ধতায়।
সকাল সাতটা, আটটা এইভাবে করে বেলা গড়াতে থাকে আর আকাশের রং টা সেই সকালে দেখা আকাশটার থেকে অনেকটাই ভিন্ন মনে হয়।যেদিন রোদ থেকে সেদিন মনে হয় মেঘ ফুটো হয়ে ফাঁকে ফাঁকে রোদ উকি দিচ্ছে।আর আকাশী রং টা খুব গাঢ় হয়ে যায় আস্তে আস্তে।সত্যি বলতে তখন ওই আকাশ থেকে চোখ সরিয়ে নেয়া দায় হয়ে পড়ে আমার জন্য।আর হালকা রোদে আকাশটাকে কেমন একটা পানসে মনে হয়।নীল রং টা তেমন ফুটতে পারে না তখন।বেশিরভাগটাই কেমন সাদা সাদা লাগে দেখতে।আর যেদিন মেঘলা থাকে আকাশটা তখন তো আমি জানালার পাশ থেকেই সরতে পারি না।কেমন আনমনা হয়ে তাকিয়ে থাকি।চারপাশটা কেমন মলিন আর ধূসর রঙে ভরে যায়।একটা পাশের কালো মেঘ অন্য পাশটায় ছেয়ে আসে,ঢেকে দেয় পুরোটা আকাশ পোড়া ছাইয়ের মত মেঘ দিয়ে।আমি তখন বৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনতে শুরু করি।কোনোদিন বৃষ্টি হয়,কোনোদিন না।বৃষ্টি শেষে পরিষ্কার আকাশটা,আমার এক ধরনের দুর্বলতা কাজ করে ওই আকাশটার প্রতি।কেমন একটা মোহ,একটা টান,একটা অন্যরকম ভালোলাগা আমার চারপাশে ঘুরে বেড়ায় আর আমাকে অকারণ হাসায়।কি যে সুন্দর সেই আকাশটা!মাতাল করে দেয়ার মত একটা কিছু আছে সেই আকাশে,সেই পরিষ্কার গাঢ় নীলে বৃষ্টি শেষে ভেজা সাদা মেঘগুলো.....পাগল করে দেয়ার মত।আমার মুঠোফোন বোঝাই এই আকাশের ছবি দিয়ে।কত শত রঙের আকাশকে যে আমি ফোনের ফ্রেমে বন্দী করে নিয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।
এরপর দুপুর গড়িয়ে আমার সবচেয়ে প্রিয় সময়টা হাজির হয় আমার কাছে। আমার সাদা মেঘে ভেসে আসা হালকা আবছা নীলে স্নিগ্ধ বিকেলটা, আমি চেয়ার পেতে বসি বারান্দায়। মাঝে মাঝে পাশে মগভর্তি চা থাকে বিকেলটা আরো কাছ থেকে অনুভব করার জন্য। আমার অলস দৃষ্টি সেই সুন্দর সাদা নীলের মেতে ওঠা পুরো আকাশটায় বুলিয়ে আসে নিজের তৃপ্তি মেটাতে। সারাদিনের শেষে এই সময়টায় আবারও কেমন একটা মায়া খুঁজে পাই আমি ওই বিকেলের সোনালী রোদের আভায়। ধীরে ধীরে সাদা মেঘগুলো কোথায় যেনো পারি জমায়। আমাকে না জানিয়েই তারা বিদায় নেই আবারও আরেকটা নতুন দিনে আমার মন রাঙাতে। আমিও কিছুটা বিষন্নভাব নিয়ে ওদের ছুটি দিয়ে দেই আমার অলস দৃষ্টির আকুল আবেদন থাকা সত্বেও। আমার সারাদিনে ক্লান্ত হওয়া চোখের দৃষ্টি তখন অভিযোগ আনে আমার নামে। কেনো আমি দিলাম বিদায়! কেনো আমি রেখে দিলাম না রূপালী বিকেলটা আরো কিছুক্ষন! আমার চোখের ক্লান্তি দূর হতে এখনো যে আরো অনেক বাকি। ওদের অভিযোগ শুনতে শুনতে আবারও চোখ পড়ে বিশাল আকাশটার দিকে। এই সময়টায় এত এত রং, আমি গুনে শেষ করতে পারি না একদম। কখনো মনে হয় আবারও ধূসর হয়ে আসছে চারপাশ, আবার মাঝে মাঝে দেখি সেই সকালের মত বেগুনি আর গোলাপীর মিশেল। তবে সকালের মত আবছা না, খুব গাঢ়। একদম স্পষ্ট বুঝতে পারি বেগুনি রংটায় ছেয়ে যাচ্ছে শেষ বিকেলের আকাশটা। আর তারই ফাঁকে ফাঁকে গোলাপী রংটা আমায় দেখে মুচকি হাসিতে মেতে ওঠে। আমার শত মন খারাপ আর ক্লান্তি ওই রংটা শুষে নেয়।শেষ বিকেলটা আমার মন ভালো করে দিয়ে বিদায় নেয়। আমার প্রতি জমানো আমার অলস দৃষ্টির অভিযোগ কোথায় যেনো মিলিয়ে যায়, হারিয়ে যায় একদম।
ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামে।সারাদিনের ব্যস্ততা,মানুষের কোলাহল, তাড়াহুড়ো, পাখির ডাক, লোহা - মোটরের তিক্ত সব শব্দ আস্তে আস্তে কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে আসে। আমার ভেতরে আবারও ভালো লাগা কাজ করতে শুরু করে। সকল ব্যাস্ততার অবসান ঘটিয়ে গাঢ় নীলে বেগুনি সন্ধ্যা নামে। একটা আবছা ধূসর চাদরে মোড়ানো গাঢ় নীলের বেগুনি সন্ধ্যাটা মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় এগারতলা কোনো বাড়ির ছাদ থেকে দেখার। এই আকাশটার পুরোটা জুড়েই আমার সব এলোমলো আবদারগুলো খুব যত্ন করে সাজানো আমার নিজের হাতে। বেগুনি সন্ধ্যাটাও একটা সময় ধূসর চাদরে ঢেকে যায়। সময় বাড়তে থাকে সেই সাথে গাঢ় হতে থাকে আকাশের নীল রংটা। খুব গাঢ় নীল রংটা আরো গাঢ় হয়ে কেমন একটা কালচে রং হয়ে যায়। ঠিক পুরোপুরি কালো রং টা দেখা যায় না তেমন। তবে ধূসর চাদরের রংটা আমি ঠিক বুঝতে পারি। পুরো কালো হওয়া আকাশটাও সুন্দর। কিন্তু তাতে চাঁদ তারা দেখতে পারি না তেমন। আমার সন্ধ্যা শেষে ঘনিয়ে আসা ধূসর আকাশটাই বেশি ভালো লাগে। তারপর টুক করেই কিভাবে যেনো রাত হয়ে যায়। কোনোদিন রুটির মতো গোল, কোনোদিন বাকা, কোনোদিন একটুখানি কাত হয়ে থাকা চাঁদ..... যেমনই হোক না কেনো মনটা ভরে যায় একদম ওই বিশাল আকাশের গায়ে চাঁদ দেখলেই। সেই সাথে চাঁদের প্রতিবেশী হয়ে চারপাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা তারাগুলো....ভারী মিষ্টি, ভীষণ সুন্দর, একদম চোখ বন্ধ করে হারিয়ে যাওয়ার মত। রাতের আকাশটা একেকদিন একেক রকম লাগে আমার। কোনোদিন দেখি মেঘ নেই, নীলের মাঝে হালকা ধূসর, কোনোদিন আবার একটা বেগুনি আভা থাকে রাতের আকাশটায়। কোনদিন দেখি গোমড়ামুখো কোনো মানুষের মতো ঈষৎ কালো, ঈষৎ ঘোলাটে। কোনোদিন খিলখিলিয়ে হেসে ওঠা কোনো মেয়ের মুখের মত সুন্দর। কোনোদিন আবার বিষণ্ণতা, অবসাদ, আলসেমি আর ক্লান্তির ছাপ থেকে আকাশের গায়ে।
আসলে কতভাবেই বর্ণনা করা যায়, আকাশ নিয়ে গান, কবিতা, ছন্দ, কাব্য রচনা করে ইতিহাস গড়া যায়। কিন্তু কোনোদিন এর শেষ কোথায় টা খুজে বের করতে পারবে না কেউ। অসীম এই আকাশের প্রেমে প্রতিদিন পড়ি আমি, এই আকাশের কাছে হাজারো ব্যাস্ততার মাঝেও হুটহাট এসে দাঁড়াই, গল্প করি, নিজের ভেতরে থাকা সমস্ত অনুভূতি তুলে ধরি যখন তখন, নিজের সব অদ্ভুত ইচ্ছেগুলো আমি আমার এই প্রিয় আকাশের সাথে ভাগাভাগি করে নেই আনন্দে। আকাশের কোনো বিরক্তি নেই, নেই কোনো অভিযোগ, নেই কোনো ব্যাস্ততা। তাই ওর কাছে যখন তখন গল্পের আসর জমাতে পারি, ভাঙ্গা গলায় সুর তুলে প্রাণখুলে গান গাইতে পারি, আমার মন খারাপের দিনগুলোয় আমি একদৃষ্টিতে আকাশ দেখি। কখন যে মন টা ওই বর্ণিল আকাশের মত সুন্দর, স্বচ্ছ আর বিশাল হয়ে ওঠে টেরই পাই না। আমার সমস্ত মন খারাপ ছাপিয়ে আমি খোলা আকাশটার সাথে হেসে উঠি, মন খুলে কথা বলি। ভীষণ একা লাগে যেদিন সেদিন আকাশের বুকে ভাসতে থাকা মেঘগুলোকে আমার সব একাকিত্ব দিয়ে ওদের কাছ থেকে ভালো লাগা আর সুখ কিনে নেই আমি।
আমার সবচেয়ে প্রিয় মাঝরাতের আবছা আলোর ধূসর আকাশটা। ওই রংটার মধ্যে কিছু একটা আছে। এত বেশি টানে আমাকে ,আমার ভেতরের না বলা সব অনুভূতি ওই রংটা বুঝে নেয় এক লহমায়। আমি শুধু অবাক হয়ে ভাবি এই একটা আকাশের কত ক্ষমতা, এই আকাশের ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া প্রতিটা রঙের কি অদ্ভুত শক্তি। এই আকাশ চাইলেই একটা মানুষের মন ভালো করে দিতে [পারে , আকাশের রংগুলো চাইলেই মানুষের একদম ভেতরে প্রবেশ করে বের করে আনতে পারে স্বস্তির নিশ্বাস। আবার চাইলেই বানাতে পারে আনমনা আর খামখেয়ালী। চাইলেই পারে ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গুঁড়িয়ে দিতে, একদম একা করে দিতে। এই সবকিছুই আকাশ আর অনুভূতির মধ্যকার এক নিরব দ্বন্দ্ব, এক শান্ত আলাপন। যাতে মানুষের কোনো স্থান নেই। স্থান পায় শুধু মানুষের ভেতরকার অনুভূতিগুলো, আবেগ, তার এলোমেলো ইচ্ছাগুলো। আকাশের দিকে তাকিয়ে এইসব ডায়েরিতে তুলে রাখছিলাম আমি। হঠাৎ খেয়াল হলো মাঝরাত পেরিয়ে যাচ্ছে। আমাকে এখনই হারিয়ে যেতে হবে ঘুমের রাজ্যে। নাহয় ভোরের ওই সুন্দর আকাশ দেখার সুযোগ হবে না। দুপুরের কড়া রোদ গায়ে মেখে উঠা লাগবে। বড্ড দেরি হয়ে যাবে তখন। আজকে তাহলে এখানেই ইতি টানি লিখার।