অসহায় সেই ছেলেটি
তখন আমার কলেজ চলাকালীন সময়। আমার কলেজে যেতে প্রায় অনেকটা রাস্তা হাটতে হতো। প্রতিদিন আমি কলেজে যাওয়ার সময় ছেলেটাকে দেখতাম রাস্তা পাশে দাড়িয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছিলাম ছেলেটি আমাকে দেখার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে। এভাবে প্রতিদিন সে দাঁড়িয়েই থাকতো। কিন্তু যখন আমি তার দিকে তাকাতাম তখন সে চোখ ঘুরিয়ে নিতো। বিষয় টা আমার কাছে খুবই ভালো লাগতো। তার কয়েকদিন পর থেকে আমার এক্সাম শুরু হয়। তখন রাস্তায় আমি আর সেই ছেলেটিকে দেখতে পেতাম না। ভাবতাম হয়তো আজকে না কালকে আসবে না হয় পর দিন আসবে। কিন্তু ছেলেটিকে আমি আর সেখানে দেখতে পেলাম না। এই কয়েকদিনে আমার কেন জানি ছেলেটির উপর মায়া পরে গেছে। কেন যেন ছেলেটিকে না দেখতে পেয়ে মনটা ছটপট করছে।
এবার এক্সাম শেষে ছেলেটির খোঁজ নিয়ে দেখলাম , সে রাস্তা থেকে বাড়ি যাওয়ার পথে এক্সিডেন্ট করে। কথাটা শুনে আমি আর নিজেকে মানাতে পারলামনা। তখন আমার সাথে আমার একজন ফ্রেন্ড কে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা হয় । গিয়েই দেখলাম সে হাসপাতাল থেকে তার মাকে নিয়ে মাত্র বেরিয়ে আসছে। আমরা তখন ছেলেটিকে আর কিছু বলার সাহস করতে পারিনি। আমরা ডাক্তার দেখাতে আসার ভান করে হসপিটালের ভিতরে চলে যাই। সেখানে রিসিপশনে এ গিয়েই জিজ্ঞাসা করলাম ছেলেটির কি হয়ে ছিল ? তখন নার্স বললো এক্সিডেন্ট হয়ে ছেলেটির দুটো চোখ নষ্ট হয়ে গেছে।
হাসপাতালে অপারেশন করলেই ছেলেটি ভালো হয়ে যাবে কিন্তু তাদের কাছে অপারেশন করার মতো এতো টাকা নেই । তাই অল্প ট্রিটমেন্ট করেই চলে গিয়েছে। কথা গুলো শুনে আমি আমার চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না। এবার বুঝলাম ছেলেটি বের হওয়ার সময় মায়ের হাত ধরে কেন হাটছিলো। তখন আমরা বাসায় চলে আসি। আমি কোনো ভাবেই আমার মনকে মানাতে পারছিনা। পরদিন কলেজ যাওয়ার পর আমি আমার সকল বন্ধুদের সাথে এই সমস্ত কথা শেয়ার করি এবং সাহায্য চাই। সবাই আমাকে এই বিষয়ে সাহায্য করতে রাজি হয়।
আমরা সবাই প্রতিটি কলেজ থেকে চাঁদা তুলবো বলে উদ্বেগ নিয়েছি। প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে আমরা অন্নান্য কলেজে যেতাম আর সেখান থেকে চাঁদা তুলে নিয়ে আসতাম। এভাবে কিছু দিন যাওয়ার পর আমাদের কাছে পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো জমা হয়েছে। এবার আর দেরি না করে আমি আর আমার বন্ধুরা সবাই মিলে ছেলেটির বাড়ি যায়। আমরা সেখানে যাওয়ার পর যা দেখলাম তা দেখার জন্য আমরা একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। ছেলেটির বাড়িতে ঢুকতেই দেখি অনেক মানুষের ভিড়। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখলাম ছেলেটির মা অনেক চিৎকার করে কান্না করছে। আমরা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন চাচা কে জিজ্ঞাসা করলাম , চাচা কি হয়েছে এই মহিলা এভাবে কেন কান্না করছে ?
তখন চাচা বললেন। এই মহিলাটির একমাত্র ছেলে আত্মহত্যা করে মারা গিয়েছে ,ছেলেটির বাবা আরো কয়েক বছর আগেই অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসার অভাবে মারা যাই। ছেলেটি আর তার মা দুজনে মিলে অনেক কষ্ট করে তাদের ভিটে মাটি ধরে রেখেছিলো কিন্তু কিছুদিন আগে সেটাও নিয়ে গেলো নদী ভেঙ্গে । ছেলেটি অনেক চাকরির খোঁজ করেছে কিন্তু কোথাও চাকরি মিলেনি। আর ছেলেটির মা একটি রোগে আংক্রান্ত মায়ের চিকিৎসা ও করতে পারছেনা। বেচারা এখন এক্সিডেন্ট করে নিজেও অন্ধ হয়ে গেলো। তাই এসব কষ্ট সহ্য করতে না পেরে ছেলেটি আত্মহত্যা করে। চাচার কথা শুনে আমি বুঝতে পারলাম ছেলেটি যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো সেটা আমার জন্যে নই , আমার বাবার জন্যে। কারণ আমার বাবা ছেলেটিকে একটি চাকরি দিবে বলেছিলো।