মেয়ে হয়ে বাবার স্বপন পূরণ করার প্রতিজ্ঞা
বাবা আমার মতো এত অল্প বয়সী একটি মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছেন। তিনি মনে করেন মেয়েদের এতো পড়াশুনা করার প্রয়োজন নেই। মেয়েরা অল্প পড়াশুনার পাশাপাশি ঠিকঠাক ভাবে ঘরের কাজকর্ম করতে পারলেই হলো। বৃদ্ধ বয়সে বাবা মায়ের দেখাশুনা করার জন্য তো ছেলেরা আছেই। তাই মেয়েকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে দিয়ে বিদায় করতে পারলেই ভালো। আমি অনেক বার বাবাকে বুঝিয়ে বলেছি যে আমি আরেকটু পড়াশুনা করতে চাই। কিন্তু বাবা আমার এসব কথা শুনতে নারাজ। তিনি নিজের কথায় ঠিক রাখেন। সামনেই আমার বিয়ের অনুষ্ঠান। তাই একদিন রাতে আমার বড় তিন ভাইকে নিয়ে বসলেন আমার বাবা।
সাথে আছে ভাবীরাও। পারিবারিক মিটিংএ বাবা প্রথমেই বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো , সামনে তোমাদের একমাত্র বোনের বিয়ে আমার অবস্থা তো জানোই , অবসর নিয়েছি আজ অনেক দিন হয়ে গেলো। এখন যা করা সব তোমাদেরই তো করতে হবে। বাবার মুখে এই কথা শুনা মাত্রই বড় ভাইয়া যেন লাফিয়ে উঠলো আর বললেন কি বলছেন আব্বা ? আমি এখন কি ভাবে কি করবো ? আপনি তো এখন আমার অবস্থা জানেন। আর তাছাড়া আপনি অবসর নেয়ার পর থেকে তো আমি এই সংসার টানছি। বাবা বললেন হ্যা ঠিক আছে তুমি করেছো তবে তুমি তো সবার বড় ভাই তাই তোমার তো একটা দায়িক্ত আছে। এই কথা শুনে বড় ভাই একটু চুপ হয়ে গেলো।
ঠিক তখনই মেঝো ভাবি বলে উঠলো আব্বা বড় ভাই যে কথা টা বলেছে সেই কথা টা কিন্তু একদম ঠিক নয়। আমার স্বামীও কিন্তু এই সংসারে অনেক টাকা খরচ করে। বাবা বললো হ্যা এই সংসারটা তো আর একার না ,সবাই মিলেই এই সংসার চালাতে হবে। এবার সবাই যেন চুপ হয়ে রইলো কিছুক্ষন। বাবা এবার ছোট ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন কিরে ছোট টি তুই তো সবার অনেক আদরের। এবার তুই কি করতে পারবি এই বিয়েতে বল। ছোট ভাইয়া ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় উত্তর দিলো আমি কি করবো। কয়েকদিন হলো নতুন চাকরি পেয়েছি। নতুন অবস্থায় আমার বেতন কত পাই তা তো তোমরা জানোই।
ছোট ভাইয়ের এই কথা শুনে বাবা মাথা নিচের দিকে দিয়ে বললেন হুম বুঝতে পারছি তোমাদের সবারই টাকা নিয়ে অসুবিধা। বাবার এই কথা শুনে বড় ভাবি বলতে লাগলো। ..... আব্বা আমি আপনাকে একটা ভালো পরামর্শ দিতে পারি। আপনার নামে যে DPS টা আছে সেটা ভেংঙে ফেলেন। আপনার এখন আর ব্যাংকে টাকা পয়সা দিয়ে কি করবেন ? আর তাছাড়া আপনাদের কোনো কিছু প্রয়োজন হলে আপনার ছেলেরা তো আছেই। বড় ভাবীর এই কথা শুনে বাবা ভাবীর দিকে রাগান্বিত ভাবে তাকালেন। বাবার রাগান্বিত ভাবে তাকানোর কারণে সবাই যেন চুপ হয়ে গেলো। বাবা তখন একটাই কথা বললেন আমার মেয়ের বিয়ে আমি ব্যবস্থা করবো। তোমারকে আমি আর কিছুই বলব না।
বাবা উঠে যাওয়ার সময় মেঝো ভাই বাবাকে কিছু একটা বলতে চাইছিলো কিন্তু বাবা তাকে কোনোকিছু বলার সুযোগ দিলোনা। আর আমি বসে ছিলাম পাশের রুমে। পাশের রুমে বসে আমি সকল কথা গুলো শুনছিলাম। বাবা চলে আসলো এখন আমার কাছে এসে বাবা আমার হাত ধরে বলতে লাগলো তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস । আমি সবসময় তোর উপর অবিচার করেছি। ভেবেছি মেয়ে মানুষ বিয়ে দিয়ে দিলেই মনে হয় বেঁচে যাবো। আর এটাও ভেবেছিলাম বুড়ো বয়সে দেখাশুনা করার জন্য ছেলে ও ছেলের বউরা তো আছেই। কিন্তু আজ আমার ভুলটা ভেংঙে গেছে।
আজ আমি এটা বুঝতে পারলাম যে ভাইয়েরা নিজের বোনকে বিয়ে দেয়ার কথা শুনে নিজেদের এত সম্যসা তৈরী করতে পারে সেই ভাইয়েরা তার বাবা মাকে কেমন চোখে দেখবে তা আমার বুঝা হয়ে গেছে। তুই পড়ালেখা কর , যত খুশি পড়ালেখা কর। আমি নিজে তোকে পড়াবো। তোর তো ওদের থেকে রেজাল্ট অনেক ভালো তুইও দেখিয়ে দে তুই আমার ছেলেদের থেকে কোনো অংশে কম না। বাবার মুখে এই কথা গুলো শুনে আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। বাবা কথা গুলো বলার সময় কান্না করছিলো। বাবার কান্না দেখে আমিও কান্না করে দিলাম ও বাবাকে বলতে লাগলাম বাবা আমি তোমার স্বপ্ন একদিন সত্যি করবো।