পথশিশু
ঠিক দুপুরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ছেলেটি। ছেলেটি হলো পথশিশু। আমরা চলার পথে যাদের দেখি। তাদের মাঝেই কেউ একজন। সে মানুষের কাছে কিছু টাকা পয়সা চেয়ে যাচ্ছে। কারণ সে অনেক ক্ষুধার্ত। ছেলেটি প্রায় ২ দিন ধরে সামান্য রুটি খেয়ে দিন পার করছে। তার না আছে কোনো বাবা মা , না আছে পরিবার। থাকার মতো কোনো ঠিকানা ও নেই। মাঝে মাঝে স্টেশনের বেঞ্চ গুলোতে শুয়ে থাকতে দেখা যাই। আবার কখনো বাস স্টেন। ছেলেটির ২ দিন ধরে ভাত জুটছেনা কপালে। তাই সামনে যাকে দেখছে তাকেই অনুরোধ করে টাকা চাইতে লাগলো। কিন্তু কেউ তাকে কোনো টাকা দেয় না। সবাই অবহেলা করে তাড়িয়ে দিচ্ছে ছেলেটাকে।
ক্ষুদার জ্বালায় বেহায়ার মতো আবারো যখন কারো কাছে জোর করে টাকা চাইতে যাই তখন সেই মানুষরা ধকম দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। তখন ছেলেটি মন খারাপ করে একটি খাবার হোটেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সেই ছেলেটি খাবার হোটেলের সামনে গিয়ে ভাবতে লাগলো হোটেলের মালিকের কাছে গিয়ে অনুরোধ করলে হয়তো আমাকে কিছু খাবার দিতেও পারে। এই কথা চিন্তা করে সে হোটেলের মালিকের কাছে গিয়ে বলতে লাগলো , স্যার আমাকে একটু খাবার দিবেন ? দুই দিন ধরে আমি ভাত খাই না। শুধু একটা রুটি খেয়ে আছি। তখন হোটেলের মালিক উত্তরে বললো , দেখ ছেলে প্রতিদিন তোর মতো অনেক ফকির আসে। কিন্তু এভাবে প্রতিদিন তোদেরকে খাওয়ানো আমার দ্বারা সম্ভব না। তুই অন্য কোথাও যা।
ছেলেটি তখন কোনো উপায় না পেয়ে হোটেলের পাশে বসেই কাঁদতে থাকে। ছেলেটির খিদে থেকে পেটে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। তার হাঁটার মতো কোনো শক্তি নেই। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারছেনা । তখন হোটেলের জানালা দিয়ে তার চোখ গেলো হোটেলের ভিতরে থাকা একজন লোকের উপর। যে হোটেলের ভিতরে বসে আরাম করে ভিবিন্ন রকমের আইটেম দিয়ে খাচ্ছে। তখন সেই লোকের খাবার দেখে ছেলেটির পেটের ক্ষুদা আরো বেড়ে যাই।
সেই মুহূর্তে আমি হোটেলে প্রবেশ করবো খাবার খাওয়ার জন্য ঠিক এমন সময় ছেলেটি আমার কাছে এসে বলতে লাগলো একই কথা গুলো। কিন্তু আমি তাতেও কোনো পাত্তা দিলাম না , ছেলেটিকে তাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু সে সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিল। হোটেলে প্রবেশের আগে আমি বাহিরে থাকা বেচিনে যাই হাত মুখ ধোতে। সেখানে আমি আমার মানিব্যাগটা রাখি। হাতমুখ ধোয়ার পর আমি টিস্যু নিতে হোটেলের ভিতরে চলে যাই। আমার মানিব্যাগটি সেখানেই ছিল। টিস্যু নিয়ে আমি খাবারের জন্য টেবিলে বসে যাই ও খাবার অর্ডার করি। সেই পথশিশু ছেলেটি তখন আমার মানিব্যাগটি নিয়ে হোটেলের ভিতরে প্রবেশ করতে চেয়েছিলো। আমাকে মানিব্যাগটি ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু হোটেলের ওয়েটার ছেলেটিকে তাড়িয়ে দেয়।
আমি খাবার শেষ করে বিল দিবো এমন সময় পকেটে হাত দিয়ে মানিব্যাগ নিতে গিয়ে দেখি আমার পকেট খালি। তখন আমার মনে পড়লো আমি হাতমুখ ধোয়ার সময় বেচিনের মধ্যে ফেলে এসেছি। তখন আমি বাইরে যেতেই দেখি ছেলেটি আমার মানিব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তখন আমাকে সে বলতে লাগলো আমি আপনার মানিব্যাগটি দেয়ার জন্য ভিতরে ঢুকতে চাইলে হোটেলের ছেলেটি আমাকে তাড়িয়ে দেয়। তাই আমি এখানে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আমি আমার মানিব্যাগ চেক করে দেখি সব ঠিক আছে। তখন আমি ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করলাম এই মানিব্যাগে তো বেশ কিছু টাকা ছিল তুমি চাইলে তো সেই টাকা গুলো নিয়ে যেতে পারতে।
তখন সেই ছেলেটি আমাকে বলতে লাগলো স্যার এগুলো আপনার টাকা। আপনার টাকা আমি কি ভাবে নিবো। তখন আমি বলি তুমি তো আমার কাছে কিছুক্ষন আগেও টাকা চাইলে। তুমি নাকি অনেক ক্ষুধার্থ। তুমি তো পারতে এই টাকা নিয়ে ভালো খাবার কিনে খেতে। তখন ছেলেটি বললো তাহলে আপনি খেতে পারতেন না। আর পারলেও বিল দিতে গিয়ে বিপদে পরে যেতেন। আমি ছেলেটির কথা শুনে কি বলবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
এমন একজন পথশিশুর সততা দেখে আমি সত্যি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তখন আমি ছেলেটিকে আমার সাথে করে নিয়ে হোটেলের ভিতরে প্রবেশ করি। ও ছেলেটির জন্য খাবারের অর্ডার করি। সে মন ভরে খেতে শুরু করলো। আমি শুধু ছেলেটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আর চিন্তা করতে লাগলাম মনুষ্যত্ব এখনো টিকে আছে। আমাদের নতুন প্রজন্মের প্রতিটি ছেলে যদি এমন হতো কত সুন্দর একটা পৃথিবী পেতাম আমরা।
ছেলেটি তৃপ্তি মিটিয়ে খাওয়ার পর ছেলেটির কাছ থেকে তার জীবনের কিছু গল্প শুনি। আর ২ দিন ধরে না খেয়ে থাকার কারণে কি কি করেছে সব কিছু সে আমাকে বলে।