আসালামুআলাইকুম,
রিক্সা চলার মজাই যেন আলাদা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানচলাচল থাকে 24 ঘন্টা। ব্যস্ততম একটি রাস্তা ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক। সেই রাস্তায় যদি রিক্সা দিয়ে কোথাও যাওয়া হয় তখন আনন্দটাই অন্যরকম লাগে। আমার তেমন রিক্সায় চরার অভিজ্ঞতা নেই কারণ আমার শ্বশুরবাড়ি যেখানে সে রাস্তাটা হচ্ছে যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের। সীতাকুণ্ড রিক্সা দিয়ে যাতায়াত করা যায় না। তবে কখনো যদি চট্টগ্রাম শহরে যাওয়া হয় তাহলে রিকশায় চড়া হয়।এছাড়া কোন রিকশায় চড়া হয়না আমার।
রিক্সা চরার আনন্দটা ছিল অসাধারণ কিন্তু অভিজ্ঞতা ছিল তিক্ত।
গতকাল রাত থেকেই চিন্তায় ছিলাম।সকালে ঘুম থেকে উঠেই বের হতে হবে আমার ছেলে উসমানের জন্য ফর্মুলা দুধ বাজার থেকে আনার জন্য। কিন্তু সর্বাত্মক শাটডাউন দেয়া হয়েছে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে।মানুষের মুখ থেকে শুনছি কোন যাত্রীবাহী গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। শুধু মালবাহী গাড়ি চলছে রাস্তায়।তাই চিন্তায় পরে গিয়েছিলাম। সারারাত ঘুমাতে পারছিলাম না।কিভাবে আমি ছেলের দুধ আনবো বাজার থেকে কারণ যাত্রীবাহী কোন গাড়ি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চলতে পারছে না।
ঘর থেকে বের না হয়ে কোন উপায় ছিল না।কারণ আমার ঘরে কোন পুরুষ মানুষ নেই। আমার হাজব্যান্ড দেশের বাইরে থাকে আর আমার ছেলেটা জন্মের পর থেকে ফর্মুলা দুধ খাওয়াচ্ছি। এখন ফর্মুলা দুধ ছাড়া ওর মনে হয় একদিনও চলে না । এই চিন্তা করতে করতে সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। ফজরে নামাজ পড়া শেষ হলে হঠাৎ চোখে ঘুম আসে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বেলা তখন দশটা বেজে যায় ।
ঘুম ভাঙার পর তারাতারি রেডি হলাম বাজারে যাওয়ার জন্য। তারপর রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম একটা গাড়ির জন্য। কিন্তু কোন গাড়ি রাস্তায় ছিল না শুধুমাত্র মালবাহী গাড়ি ছাড়া।অন্য কোন যাত্রীবাহী গাড়ি আমার চোখে পড়ছিল না। আমার মত অনেক অনেক মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল আমার মত তাদের কোনো প্রয়োজনে। অনেকে আবার দেখছি পায়ে হেঁটে চলছে তাদের গন্তব্যে পৌঁছতে।কিন্তু আমার পক্ষে তা সম্ভব ছিল না।কারণ আমি যে বাজার থেকে আমার ছেলের ফর্মুলা দুধ কিনে আনি সেটি আমার শ্বশুরবাড়ি থেকে প্রায় 8-9 কিলোমিটার দূরের পথ। তাই আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম প্রায় এক ঘণ্টার মত তারপরও কোন গাড়ি দেখছিনা।
হঠাৎ একটা রিক্সা ওয়ালা আমাকে দূর থেকে ডাক দিয়ে বলছে আপনি কি যাবেন কোথাও?
আমি, রিক্সাওয়ালা মামাকে বলি সামনে রিক্সা নিয়ে আসার জন্য।
রিক্সাওয়ালা মামা বারবার বলছে আসতে পারবো না আপনার ওখান দিয়ে পুলিশ চেকপোস্ট আছে।যদি আমি রিক্সা নিয়ে যায় তাহলে আমার রিক্সায় আটক করে ফেলবে। তো আমি রিকশাওয়ালা মামার কাছে পায়ে হেঁটে ওনার গেলাম। তারপর রিক্সায় উঠে আমার গন্তব্যে উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।
কিন্তু পথিমধ্যে পুলিশ মামারা আমাকে এবং আমার রিক্সা চালকে থামতে বলল।তারপর রিক্সা চালককে বারবার জিজ্ঞেস করছে কি জান্য রিক্সা নিয়ে বের হয়েছিস। শাটডাউন দেওয়া হয়েছে তাহলে তুই রিক্সা নিয়ে কোন সাহসে বের হলিই?
এই কথা বলে আমার সামনে রিকশা চালক মামাকে দুইটা লাঠি দিয়ে বাড়ি দিল। তখন এই অবস্থা দেখে আমার প্রচন্ড খারাপ লাগছিল আপনাদেরকে বুঝাতে পারব না খুব কান্না পাচ্ছিল☹☹।তখন আমি পুলিশ গুলোকে বললাম ভাইয়া দেখেন আমি ওনাকে অনেক রিকুয়েস্ট করে ওনার বাড়ি থেকে নিয়ে আসছি। কারণ আমার বাচ্চার দুধ কিনা লাগবে উনি আসতে চাইনি আমি জোর করে উনাকে নিয়ে আসছি আর ওনাকে মারবেন না। দয়াকরে আপনাদের কাছে অনুরোধ করছি।
তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করছে আপনি কেন বের হয়েছেন ঘর থেকে আপনি জানেন না সারা দেশের শাটডাউন দেওয়া হয়েছে?
তখন আমি ওদের বুঝিয়ে বললাম দেখেন ভাই আমার বাড়ীতে কোন পুরুষ মানুষ নেই। আমার ছয় মাসের একটা ছোট বাচ্চা আছে ওকে ফর্মুলা দুধ খাওয়াতে হয়। দুধ কেনার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছি।আমি এক ঘন্টা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলাম।গাড়ি না পেয়ে রিক্সাওয়ালা মামাকে উনার বাড়ি থেকে অনুরোধ করে আমি নিয়ে এসেছি।
আমি এখানে মিথ্যা কথা বলেছি পুলিশগুলোর সাথে। কারণ আমি যদি মিথ্যা কথা না বলতাম তাহলে রিকশাওয়ালাকে আরো মারত অথবা ওনাকে জরিমানা করত সেজন্য আমি মিথ্যা কথা বলেছি।
তারপর পুলিশগুলো রিক্সা ছেড়ে দিলো। রিক্সাওয়ালা মামা আমাকে নিয়ে বাজারে গেলাম ওখান থেকে আমার ছেলেরে দুধ এবং ঘরের প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস কিনেছি।
কিন্তুু নিজেকে অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে কারণ রিক্সাওয়ালা মামা দুইটা লাঠির বাড়ি উনার পায়ে এবং পিঠে দেখলাম ফোলে গিয়েছিল।তখন আমার খুব দুঃখ লেগেছে মামাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে বসে চা খাওয়ালাম নাস্তা করলাম। উনার সাথে অনেকক্ষণ গল্প করে আবারো ওনার রিক্সা দিয়ে আমার শ্বশুরবাড়িতে চলে আসলাম।
রিক্সাওয়ালা মামা বারবার বলছে আমাদের জন্য কি শাটডাউন?
আমরা গরীব মানুষ রিক্সা চালিয়ে কোনরকমে সংসার চালায় আমাদের জন্য শাটডাউন দেয়া হয় তাহলে আমাদের পরিবারের মানুষ কিভাবে চলবে?
আমাদের কথা কি কেউ ভাবে?
আর পুলিশ তো আমাদের মানুষ মনে করে না যখন যেখানে পাক না কেন শুধু মারে।
বুঝলা মা,আমরা গরিব তাই কারো কাছে আমাদের মূল্য নেই। আমরা কিভাবে চলব কেউ আমাদের জন্য চিন্তা করে না। তখন আমার খুব মায়া হলো আমার কাছে বেশি কিছু টাকা ছিল না। তারপরও ভাড়া যতটুকু ছিল তার থেকে দ্বিগুন পরিমান টাকা ওনাকে দিয়ে উনার বাড়িতে চলে যেতে বললাম ।
তবে রিক্সাওয়ালা মামা টা খুব ভালো মনের মানুষ ছিল। উনার মনটা অনেক ভালো ছিল। গরীব হলেও উনার মন-মানসিকতা ছিল অন্যরকম। খুব ভদ্রভাব এবং সুন্দর ব্যবহার ছিল ওনার।
ধন্যবাদ,
আমার অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কিছু ছবি আপনাদের সাথে শেয়ার করছি।