https://www.bd-pratidin.com/amp/country/2020/06/29/543566
ভোর সকালে ঘুম থেকে হঠাৎ করেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে জেগে উঠলাম। দরজা খুলতেই দেখি চাচা চাচি আর তার ছোট মেয়ে। আমিতো তাদের দেখে বেশ খুশি হলাম।
কিন্তু চাচা-চাচীর মুখ পানে তাকাতেই দেখলাম তাদের চোখ জোড়া ছল ছল করছে। কিছু না ভেবে তাদের আগে ঘরে নিয়ে বসালাম। তারপর বাবাকে ডাকতে যাই। মাকে চাচা-চাচির কথা বলতেই বাবাও রুম থেকে বেরিয়ে এলেন। বাবা-মাকে দেখে চাচা চাচি কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। তাৎক্ষণিক বাড়ির পরিবেশটা বদলে গেল।
আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাই কি হচ্ছে জানার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম। তখনই চাচা কাঁদো কাঁদো স্বরে বাবাকে বললেন আমার সব শেষ হয়ে গেছে।
আমি সর্বহারা হয়ে গেছি। কোথায় যাবো কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তাই তোমার কাছে ছুটে এসেছি আপাতত: একটু আশ্রয়ের খোঁজে। পদ্মা আমার সবকিছু কেড়ে নিয়েছে কোন কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি বলতে বলতে মেঝেতে বসে কাঁদতে লাগলেন।
বাবা তাকে মেঝে থেকে সোফায় বসাতে বসাতে বললেন কাঁদছো কেন আমি তো আছি চিন্তার কোন কারণ নেই আল্লাহ তোমাদের অবশ্যই একটা ভালো ব্যবস্থা করবেন।
আর তাছাড়া তোমি একসময় আমারও আমার পরিবারের যে উপকার করেছিলে তার জন্য ঋণ গুছানোর ও সুযোগ হয়তো আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন এই বলে চাচাকে সাহস দিলেন।
তাদের কথা শুনতে শুনতে আমার মনে পরে গেল সেই গ্রামের কথা।
পদ্মার পাড়ের একটি গ্রাম হল শান্তিপুর।আসলে শান্তিপুরে শান্তির কোন বালাই ও ছিল না। কারণ সেখানে অনেক আগন্তকেরা এসে আশ্রয় নিয়েছিল । সবাইকে নিয়ে গ্রামের মধ্যে একদম ঠাসাঠাসি অবস্থার জন্য পরিবেশটাই বদলে গিয়েছিল ।
পদ্মার সর্বনাশা অবস্থার কারণে হাজার হাজার গ্রাম বিলীন হয়ে যাচ্ছিল।
হাজার হাজার মানুষ সর্বশান্ত হয়ে পড়েছিল। আশেপাশের গ্রামগুলোতে গিয়ে প্রবেশ করছিল একটু নিরাপত্তার আশায়।
আমিও তখন আমার বাবা মায়ের সাথে সেখানে ছিলাম যখন পদ্মা আমাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছিল।
একদিন মাঝরাতে সবার চোখের অলক্ষ্যে আমাদের দোতলা বাড়ি, সাধের বাগান বাড়ি, আমাদের খেলার মাঠ সহ পুরো গ্রাম নিমিষেই ভেঙ্গে নিয়ে যায় সর্বনাশা এই পদ্মা। অন্ধকারে চারদিক থেকে ভেসে আসছিল মানুষের হাহাকার ও আর্তনাদ। যে যার মত এদিক সেদিক ছোটাছুটি করছিল জীবন বাঁচানোর তাগিদে। কত লোক যে হারিয়েছিল তাদের স্বজন সহ সর্বস্ব তার কোন হিসাব নাই। সবার মতো আমাদের পরিবারের ও একই অবস্থা। প্রকৃতির ছোবলে আজ আমরা নিদারুণ অসহায়। ভিটেমাটি হারা পরিবারের আজ ছাদ হলো খোলা অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশ।
আমাদের পরিবারের কর্তা ছিলেন আমার দাদা। তিনি সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। যার ফলে তিনি সপ্তাহের মাথায় নিদারুণ বেদনা সহ্য করতে না পেরে চিরদিনের জন্য চলে যান আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে।
বাবা তখন দাদি ও আমাদের সবাইকে নিয়ে এই চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল ।
তিনি কিন্তু আমাদের আপন রক্তের কেউ নয়, তারপরও তিনি তখন আমাদের যেভাবে আশ্রয় দিয়ে দেখাশুনা করেন চার বছর তার কোন নজির হয়না। সেই চার বছরই আমি ঐ গ্রামে ছিলাম যার ফলে সেই গ্রাম ও ওখানকার পরিবেশ ও পরিবারগুলো আমার কাছে আপন হয়ে ওঠে।
পদ্মা ভাঙ্গন এর ফলে হাজার হাজার মানুষ তাদের সব হারিয়ে এখানে এসেছে। আমাদেরই মত আশ্রয় খুজছিল। কিন্তু আমাদের মতো সৌভাগ্যবান মানুষ কমই ছিল,যারা এই চাচার মত ভালো মানুষের সহজ্য পেয়েছিলো।
তাই আমিও চাই এই চাচাকে সাহায্য করতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে। এতে যদি তাদের ঋণ কিছুটা শোধ করা যায়।
এই পদ্মা নদী যে কত মানুষের সর্বস্ব নিয়ে তাদের বাস্তহারায় পরিণত করেছে তার কোন হিসাব নাই । গতকালও যে গ্রামটি ছিলো পদ্মার পাড়ের মানচিত্রে তার করাল গ্রাসে আজ তা বিলীন হয়েছে পদ্মার গহীন তলদেশে ।
এভাবে গ্রামের পর গ্রাম, মাঠের পর মাঠ, ফসলি জমি, গাছ পালা গবাদি পশু সহ সবকিছু বিলীন হয়ে যাচ্ছে পদ্মার অতল গহীনে। জানিনা প্রকৃতির এই নির্মম খেলা কখন শেষ হবে এবং প্রকৃতির এই নির্মম খেলার কখন যে প্রতিকার হবে,কিভাবে তার সমাধান করা যায়, এই সমাধান কি প্রকৃতি নিজেই করবে না অন্য কোনভাবে হবে? তা ভাবতে ভাবতেই - মায়ের ডাক ভেসে আসলো।
জবাব দিতেই মা বললেন- তাড়াতাড়ি খাবারের টেবিলে আয়, সবাই একসাথে খাব।
লেখাটি পড়ার জন্য সবাইকে ধন্যবাদ।