১৩ নম্বর ওয়ার্ড। হাসপাতালের জরুরী বিভাগের আওতায় এই ওয়ার্ডে ২৪/৭ রোগীদের সেবা দেওয়া হয়। এক বন্ধু হঠাৎ অসুস্থ হওয়ায় সেদিন আমার অপ্রত্যাশিত গন্তব্য এই ১৩ নম্বর ওয়ার্ড। রাত ১ টায় বন্ধুকে ভর্তি করানো হল। রাত ৩ টার দিকে তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হলে প্রথমবারের মত পুরো ওয়ার্ডে একবার চোখ বুলানোর ফুরসৎ পেলাম। রাত ৩ টা, হাসপাতালে পিনপতন নিস্তব্ধতা বলে কিছু নেই। তবে এখন পরিবেশটা কিছুটা শান্ত।
কিছুক্ষন পর পাশের রুম থেকে হঠাৎ কান্নার শব্দ। কয়েকজন ইন্টার্ন ডাক্তার ছুটে গেল। তারপর আরো খানিকটা সময়। একসাথে বেরিয়ে এলো সব ডাক্তাররা। এবারের গননবিদারী কান্নার শব্দে বুঝতে পারলাম কি হয়েছে।
"ভাইয়া" ডাকটা এতটা মর্মস্পর্শী হতে পারে!!
সদ্য হারানো ভাইকে ডাকছে পাগলী বোনটা। মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে যাদের চলে যেতে হয়, প্রিয়জনদের এমন আর্তনাদের উত্তরে তাদের কিছু বলতে ইচ্ছে করে কিনা জানিনা। তবে ফেলে যাওয়া প্রিয়জনদের হৃদয়ে তখন অজস্র স্মৃতির অকারণ আনাগোনা। হয়তো বোনের মনে পড়ছে ভাইয়ের হাতে শেখা সেই প্রথম ঘুরি উড়ানোর গল্প, ভাইয়ের ঘাড়ে বসে ছোট্ট গাছটার আম পাড়ার স্মৃতি, ওর গোপন ডাইরি গোপনে পড়তে গিয়ে ধরা পরার স্মৃতি, আরো কত কি………
জীবনের রঙ্গমঞ্চের শেষ দৃশ্যটা হয়তো এখানেই ধারন করা। কতগুলো অর্থহীন জীবনের পরিসমাপ্তি। কতগুলো মানুষের মৃত্যুর প্রতিক্ষা। বিন্দু বিন্দু অশ্রুতে অতীতের হাতছানি। পাপের প্রায়শ্চিত্তের হাজারে ভাষা এখানে। আরো কত্ত আয়োজন!!!!
এখানে মৃত্যু খুব কাছে থেকে দেখা যায়। নিজের কর্মের সার্থকতা উপলব্ধিতে ধরা দেয়। সুস্থ থাকার তুষ্টিতে হৃদয় ভরে যায়। জীবনকে রঙ্গিন করে নয়, রঙ্গের ভারসাম্যে সাজাতে ইচ্ছে হয়। আর মনে পড়ে " অতপর তোমরা আল্লাহ্'র কোন কোন নিয়ামতকে অস্বীকার করবে?? "
হাসপাতালে একরাত উপলব্ধিকে শানিত করে, প্রকৃত সার্থক জীবনের জলছবি একে দেয় হৃদয়ের মনিকোঠায় খুব নিখুতভাবে, আক্ষেপের স্বরে স্থবিরতা আনে আর আনে হৃদয় ভরা প্রশান্তির বাধভাঙ্গা জোয়ার।।।।