সকালে একটা সময় সবাই ওঠার ঠিক আগে, যেটা পুরোপুরি আমার নিজের।
হয়তো কুড়ি মিনিট, হয়তো ত্রিশ। কখনো কখনো তারও কম। কিন্তু এই কয়টা মিনিটে আমি কারো বউ না, কারো মা না, কারো বৌমা না। আমি শুধু আমি — রান্নাঘরে চায়ের কাপ হাতে বসে থাকা একজন মানুষ, যে জানালার বাইরে পৃথিবীটাকে ধীরে ধীরে জেগে উঠতে দেখছে।
কখন থেকে এই সময়টাকে আঁকড়ে ধরা শুরু করেছি জানি না। হয়তো সেদিন থেকে, যেদিন বুঝলাম যদি সকালের একটুখানি সময় নিজের জন্য না রাখি, তাহলে সারাটা দিন শুধু অন্যদের জন্যই কেটে যাবে। রান্না, ঘর গোছানো, সবার চিন্তা — এগুলো সব অপেক্ষায় থাকে। থাকবেই। কিন্তু এই কুড়ি মিনিট আমি ওদের একটু অপেক্ষা করাই।
সাড়ে পাঁচটার দিকে উঠি। বাড়ি তখনো অন্ধকার, চুপচাপ। সবাই ঘুমে। বাইরের রাস্তাও প্রায় নিস্তব্ধ — দূর থেকে কোনো রিকশার শব্দ, বা একটা পাখির ডাক যে বোধহয় জানে না এখনই ডাকার সময় হয়নি।
রান্নাঘরে যাই বড় বাতি না জ্বালিয়ে। শুধু চুলার ওপরের ছোট্ট বাতিটা। চা বসাই আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধোঁয়া উঠতে দেখি। শুনতে কিছুই মনে হয় না। কিন্তু অনুভব করতে অনেক কিছু।
আদা-এলাচ দিয়ে একটু কড়া চা বানাই। চিনি ছাড়া — দুই বছর হলো ছেড়েছি, প্রতিদিন সকালে নিজেকে নিয়ে একটু গর্ব হয়। দু হাতে কাপটা ধরে জানালার কাছে যাই।
বাইরে আকাশ প্রতিদিন আলাদা কিছু করে। কোনো কোনো সকালে গাঢ় নীল, যেটা দেখলে একসাথে ছোট আর নিরাপদ লাগে। কোনো সকালে মেঘগুলো পুরনো গোলাপের রঙ ধরে। আর কোনো কোনো সকালে শুধু ধূসর, সাধারণ — আর অদ্ভুতভাবে সেই সকালগুলোতেই সবচেয়ে বেশি শান্তি লাগে। মনে হয় আকাশটাও শুধু বিশ্রাম নিচ্ছে। শ্বাস নিচ্ছে। কিছু হওয়ার চেষ্টা করছে না।
এই সময়টায় অনেক ভাবি। বড় চিন্তা না — কোনো সমস্যার সমাধান না, কোনো পরিকল্পনা না। ছোট ছোট কথা। গত সপ্তাহে মায়ের সাথে কী কথা হয়েছিল মনে পড়ে, হাসি পায়। ভাবি দুপুরে কী রাঁধব, তারপর নিজেকেই বলি এটা সকালের চিন্তা না, সরিয়ে রাখি। জানালার ওপাশের ছাদে একটা কাক বসে মাথা কাত করে আমার দিকে তাকায়, আমি চুপ করে হাসি — হয়তো সত্যিই সে আমাকে বিচার করছে।
কোনো কোনো সকালে নামাজ পড়ি। কোনো কোনো সকালে শুধু বসে থাকি। দুটো আমার কাছে একইরকম লাগে — নিজের চেয়ে বড় কিছুর সাথে কথা বলার মতো।
সোয়া ছটার দিকে শব্দ শুরু হয়। একটা দরজা খোলে। কোনো বাচ্চা বিছানায়寝返りを打つ। শাশুড়ি তার ঘরে আস্তে কাশেন — সংসারের দিন শুরুর সংকেত। শেষ চুমুক দিই চায়ের, যেটা তখন ঠান্ডা হয়ে এসেছে। কাপটা সিঙ্কে রাখি।
আর তারপর শুরু হয়।
চাল ধোয়া। প্রেশার কুকার চড়ানো। টিফিন বক্স সাজানো। স্কুলের ব্যাগ দেখা। ওষুধ গোছানো। নাস্তা বানানো, পরিবেশন করা, পরিষ্কার করা। সবাই বেরিয়ে যাওয়া। বাড়ি আবার চুপ — কিন্তু এই চুপ আলাদা। এটা ঘুমের চুপ না, এটা মানুষে ভরা একটা জায়গা খালি হয়ে যাওয়ার চুপ।
সবাই চলে গেলে ঠিক পাঁচ মিনিট বসি। মাত্র পাঁচ। রান্নাঘরের দিকে তাকাই — ছড়ানো ভাতের দানা, ভেজা কাপড়, এখনো একটু শোঁ শোঁ করতে থাকা প্রেশার কুকার — আর মনে একটা অনুভূতি হয় যেটার নাম ঠিক জানি না। ক্লান্তি না ঠিক। তৃপ্তি না ঠিক। দুটোর মাঝামাঝি কিছু। যেটা বলে: আজকেও হলো। আরেকটা সকাল। আরেকটা শুরু।
নয় বছর ধরে গৃহিণী। এই জীবন বেছেছিলাম, আবারও বেছে নিতাম। কিন্তু সত্যি বলতে — কখনো কখনো এই কাজগুলো অদৃশ্য মনে হয়। মেঝে নোংরা না হলে কেউ বোঝে না যে সেটা পরিষ্কার ছিল। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের রান্না তিন মিনিটে শেষ হয়ে যায়। সারাদিন ঢেলে দাও, দিন শেষে দেখানোর মতো কিছু নেই।
তাই সকালটা এত দামি। বিশেষ বা সুন্দর বলে না। ইন্সটাগ্রামের ছবির মতো বলে না। শুধু এই কারণে যে ওই কুড়ি মিনিটে, দেওয়া শুরু হওয়ার আগে, আমি শুধু নিজের জন্য থাকি। চা খাই। আকাশ দেখি। ছোট ছোট কথা ভাবি।
আর সেটুকুই যথেষ্ট, বাকি সারাটা দিন পার করে দেওয়ার জন্য।
যদি আপনাদের জীবনেও এরকম কোনো ছোট্ট সময় থাকে যেটা শুধু আপনার নিজের — নিচে জানাতে পারেন। 🌸