আচ্ছা বাবারা কি আসলেই এত কম কথা বলেন নাকি আমরাই বুঝি না?
ছোটবেলায় সত্যি বলতে বাবাকে একটু ভয়ই পেতাম। মা রাগ করলে কোনো না কোনোভাবে পার পেয়ে যেতাম, কিন্তু বাবার সামনে গেলে কেন জানি গলা শুকিয়ে যেত। বাবা আহামরি কিছু করতেন না, শুধু একটু গম্ভীর হয়ে তাকাতেন — ব্যস সেটাই যথেষ্ট ছিল 😅
তখন মনে হত বাবা হয়তো অতটা কেয়ার করেন না। মায়ের মতো জড়িয়ে ধরেন না, মাথায় হাত বুলিয়ে দেন না। ভাবতাম বাবা একটু দূরের মানুষ।
কিন্তু একটা ঘটনা এখনো মনে আছে। ক্লাস সিক্সে পরীক্ষার আগে নতুন জুতা চাইছিলাম। বাবাকে বললাম, বাবা কিছু বললেন না। ভাবলাম শোনেননি। পরদিন সকালে উঠে দেখি বিছানার পাশে জুতা। বাবা তখন বেরিয়ে গেছেন অফিসের উদ্দেশ্যে, কোনো কথা নেই, কোনো বাহবা নেই।সেদিন বুঝিনি। এখন বুঝি।
বছরে একবার দাদাবাড়ি ফরিদপুর যাওয়া হত, সাধারণত ঈদে। আর সেই যাওয়ার আগে থেকেই বাবার চিন্তা শুরু হয়ে যেত। গরমের সময় গেলে বাবা সারাক্ষণ বলতেন “বেশি রোদে ঘুরিস না, গরম লাগবে, শরীর খারাপ হবে।” আর সেই চিন্তা থেকেই রোজ ডাব আনতেন, পেঁপে কাটতেন, আরও কত কী খাওয়াতেন যেন শরীর ঠিক থাকে। আর শীতকালে? শীতে তো গ্রামে নিয়েই যেতে চাইতেন না। বলতেন “ওখানে অনেক ঠান্ডা, তোদের লেগে যাবে।” আমরা জেদ করতাম, বাবা শেষমেশ নিয়ে যেতেন কিন্তু সারারাস্তা কম্বল গায়ে দিয়ে রাখতেন। 😄তখন বিরক্ত লাগত। এখন মনে হয় — এটাই ছিল বাবার ভালোবাসা। মুখে না বলে, কাজে দেখানো।
বাবারা কখনো বলেন না ভালোবাসি।কিন্তু সারাজীবন করে দেখান। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে সংসার চালান। রাতে ক্লান্ত হয়ে ফেরেন কিন্তু মুখে কিছু বলেন না। বাবারা কাঁদেন না, অন্তত আমাদের সামনে না। কিন্তু রাতে হয়তো একা বসে ভাবেন — ছেলেমেয়েটা ভালো থাকবে তো? ঢাকার এই ব্যস্ত শহরে ঠিকঠাক মানুষ হবে তো? এই চিন্তা বুকে নিয়ে পরদিন আবার বেরিয়ে পড়েন। কাউকে বলেন না।
আমরা বড় হই, নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বন্ধু, আড্ডা, ক্যারিয়ার — এসব নিয়ে মাথা ঘোরে। বাবাকে ফোন করতে ভুলে যাই। কিন্তু বাবা? বাবা ঠিকই অপেক্ষায় থাকেন। প্রতিদিন। চুপচাপ।
আর হ্যাঁ, একটা কথা মাঝে মাঝে মনে হয় — বাবারা হয়তো জানেনই না আমরা তাঁদের কতটা ভালোবাসি। কারণ আমরাও তো বলি না। বাবা যেমন চুপ করে ভালোবাসেন, আমরাও চুপ করে ভালোবাসি। দুইপক্ষই অপেক্ষায় থাকি, কেউ আগে বলি না। এই চুপ থাকাটাই হয়তো সবচেয়ে বড় ভুল। একটা মেয়ের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হচ্ছে বাবা। জীবনের প্রথম হিরোও বাবা। ছোটবেলায় মনে হত বাবা পারেন না এমন কিছু নেই, বাবা মানেই শক্তি, বাবা মানেই নিরাপত্তা। তবুও কেন জানো বাবাকে আমরা ঠিকমতো বুঝি না।
আমার বিয়ের দিনের কথা এখনো মনে আছে। সেদিন অনেক কিছুই হয়েছিল, আনন্দ ছিল, হইচই ছিল। কিন্তু একটা মুহূর্ত আমি কখনো ভুলব না বাবার চোখে পানি দেখেছিলাম। বাবা কাঁদছেন, এটা আগে কখনো দেখিনি। সেই মানুষ যিনি সারাজীবন শক্ত থেকেছেন, সেদিন চোখ লুকাতে পারেননি। 🥺
ওইদিন থেকেই হয়তো বুঝলাম বাবার ভালোবাসাটা আসলে কতটা গভীর। মুখে কখনো বলেননি, কিন্তু সেই এক মুহূর্তেই সব বলে দিলেন। বাবারা এমনই। সারাজীবন চুপ করে থাকেন, কিন্তু যেদিন ভাঙেন — সেদিন বুকটাও ভেঙে যায়।
বাবার বয়স বাড়ে। চুলে পাক ধরে, হাঁটতে কষ্ট হয়। কিন্তু সন্তানের জন্য মায়াটা এতটুকু কমে না। একসময় যিনি কাঁধে তুলে দৌড়াতেন, আজ হয়তো একটু সাহায্যের অপেক্ষায় থাকেন। তখন যদি পাশে না থাকি সেটা হবে সবচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা।
তাই আজকে যদি পারেন বাবাকে একটু বলুন “ভালোবাসি বাবা।” লজ্জা লাগলেও বলুন। দূরে থাকলে একটা ফোন করুন। শুনে হয়তো বলবেন “আরে এসব কী।” কিন্তু ভেতরে ভেতরে সেটাই হবে তাঁর সারাদিনের সেরা মুহূর্ত। 🥺 বাবা থাকতে বাবাকে ভালোবাসুন। কারণ আফসোস দিয়ে কিছু ফেরানো যায় না। 💔
পৃথিবীর সব বাবাকে ভালোবাসা ❤️
ধন্যবাদ সবাইকে 🙂
ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন।