যখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, তখন প্রায় সময়ই এই দৃশ্য টা আমার চোখে পড়তো।
আমাদের পাড়াতো চাচীরা ,দাদীরা, খালাম্মারা শীতকালে বিকেল বেলায় রোদে বসে একত্রিত হয়ে জমজমাট আড্ডায় বসতেন।
আর সেই আড্ডার আলোচনার বিষয়বস্তুগুলো ছোট বেলায় আমাকে খুব বিনোদন দিত।
যদিও নিয়ম ছিল বড়দের আলোচনার মাঝে ছোটদের থাকা নিষেধ।
তবুও দূর থেকে খেলার ফাঁকে বড়দের গল্পের বিষয় গুলো কানে চলে আসতো।
ওনাদের আলোচনার বিষয়বস্তু গুলো মূলত এমনি হতো অধিকাংশ সময়ই-
"বুবু জানেন আপনার দেবর না এত দামি একটা শাড়ী কিনে এনেছে আমার জন্য।
এত সুন্দর!! কি যে বলবো!?
সেই সাথে ম্যাচিং করে একটা দামী গহনাও কিনে এনেছে।
আমি কতবার করে নিষেধ করি এসব অপ্রয়োজনীয় কাজে টাকা খরচ না করতে।
কিন্তু ও বলে কি জানেন বুবু ?
বলে আমার তো ১০ - ৫ টা না। একটাই বউ !
তার জন্য খরচ করবো না তো ,কার জন্য খরচ করবো।
পাগলের মতো ভালোবাসে আমায় জানেন তো।
একজনের এই ধরণের আহ্লাদী গল্প শেষ হতে না হতেই সাইড থেকে অন্য কেউ বলে উঠতেন।
জানেন ভাবী!
আমার ছেলেটা তো মুরগীর রান ছাড়া কিছুই খায় না।
কি যে করি?
তারপর হঠাৎ পাশ থেকে আরো একজন ফোড়ন কেটে উঠে বলতেন,
ভাবী এই ডিসেম্বরে ভাবছি কক্সবাজার যাবো।
এই উনার কথার প্রতি উত্তরে আরো একজন বলে উঠতেন।
কি যে বলেন ভাবি!
আপনার ভাই আবার দেশে ঘুড়তে চায় না,ও বলছিলো দার্জিলিং এ ঘুরতে যাবে আমাদের সপরিবারকে নিয়ে।
এই ধরণের হাজার রকমের আলোচনার প্রতিযোগিতা চলতো একে অপরের সাথে।
আর আমি সেই আলোচনা শুনে তেমন কোন আহামরি বুঝতে পারতাম না। ছোট মানুষ বলে হয়তো।
কিন্তু এখন সেই ছোট্ট বেলার সেই আলোচনার বিষয়বস্তু মনে পড়লেই খুব হাসি পায় আমার।
বর্তমান সময়টার কথা এখন আমি চিন্তা করি।
এখন কি সেই সময়গুলোর পরিবর্তন হয়েছে??
না কি আরো ভয়াবহ নব্য পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে??
ভেবে দেখলাম ভয়াবহ বটেই ......
এখন তো ইন্টারনেটের যুগ।
সোস্যাল মিডিয়ার যুগ।
কারো বাসায় ভালো রান্না ও ভালো খাবার দাবার এর আয়োজন হলোই সুন্দর করে ছবি তুলে পোস্ট দিতে হবেই।
কেউ হয়তো স্বামীকে গিফট দিয়েছে কিংবা স্বামীর কাছে থেকে গিফট পেয়েছে - লিখে দিলো স্বামী ও স্ত্রীর সম্পর্ক টা ভালোবাসায় ভরপুর।
সমুদ্র সৈকতে গিয়ে ২ জন মিলে ছবি তুলে পোস্ট দিলো - সমুদ্র বিলাস!!
আবার কেউ অতিরঞ্জিত ভাব দেখাতে গিয়ে জানান দেয়- নিজের ফ্ল্যাটে উঠে শাস্তির নিঃশ্বাস।
এ হলো সামান্য চিত্র বর্তমান সময়ের।
অনেকের এই আহ্লাদী গল্প ও চিত্র অধিকাংশ মানুষের হৃদয়ে হাহাকার সৃষ্টি করে।
সাধ তো তাদেরও আছে।
মন তো সবারই ভালো কিছু খেতে, পড়তে ও ঘুরতে চায়।
কিন্তু সবার সাধ্য কোথায়!
এই যে শত শত মানুষের হা হুতাশ তার জন্য দায়ী কে?
দায়ী আপনার বা আমার অনিয়ন্ত্রিত আবেগ।নিজের সবকিছু জানান দিয়ে কষ্ট দিচ্ছি আমাদেরই কোন না কোন বোনকে/ভাই কে।সেই ভাই হয়ত নিজের স্ত্রীর ছোটখাটো আবদার মিটাতে গিয়ে অনেক সময় বেছে নিচ্ছে অনৈতিকতাকে।
অথচ হাদিসে বলা হয়েছে, তোমরা যদি কাউকে কিছু না দিয়ে খাও,তাহলে তার খোসাটাও দেখিও না।
আবার তরকারির ঝোলটা বাড়িয়ে দিতে বলেছে,
প্রতিবেশীদের দেওয়ার জন্য।
কিন্তু আমরা কি করছি?অন্যের চাহিদা গুলোকে উসকে দিচ্ছি।
তাই এখনি সময় নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে,অন্যকে ভালো রাখার।