আসসালামু আলাইকুম,
সবাই কেমন আছেন? আশা করি আল্লাহর রহমতে সকলে খুব ভালো আছেন। আজ আমি আপনাদের সাথে আমাদের সমাজের মধ্যবিত্ত পরিবারের জীবন সম্পর্কে একটি গল্প লিখবো। আশা করবো সকলেই আমার লেখা গল্পটি সময় করে পড়বেন।।।
মধ্যবিত্ত
তোর কাছে কিছু টাকা হবে, মা?
কোথায় পাবো রে বাপ..! যে ক-টাকা ছিলো তা তো সেদিন দিলাম তোকে,
মায়ের কথায় আমি যেন পাথর হয়ে গেলাম। বাবা মারা যাবার পর থেকে শত কষ্টের মাঝেও মাঝে মধ্যে মা কে আমি হাত খরচ কিছু দিতাম সেই মায়ের কাছেই আজ আবার উল্টো টাকা চাইছি..! খুবই খারাপ লাগছিলো, আমার খুব কান্না পাচ্ছিলো তখন। কান্না চেপে মাকে বললাম......
9না থাক লাগবেনা মা... দেখা যাক আল্লাহ ভরসা,
আসলে দেশ লকডাউন হওয়ার পর থেকে সংসার সামলাবো কী করে এ নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি। পুরো দেশে অফিস আদালত বন্ধ।
বলতে গেলে কোনো মতে সংসারের চাকা ঘুরাচ্ছি আর কি..!
আমার পরিবারে -মা ছোট ভাই সহ তিন/ চার জনের সংসারটা মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবারের মতোই চলে। জুলাই এর চার তারিখে অল্প কিছু টাকা পাওয়ার কথা ছিলো। তার আগে পোষ্ট অফিস বন্ধ হয়ে গেলো। আর পোষ্ট অফিসে টাকার জন্যে গেলে হায়রে অবস্থা, এখন না তখন, পরে আসেন স্যার নাই..আরও কতো কথা...! এদিকে (করোনা) ভাইরাসজনিত কারনে
প্রতি দিনেই দেশের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে বলে আতংকিত অবস্থায় ঘর থেকে যাতে বের হতে না হয় সেজন্য যে অল্প টাকা ঘরে ছিলো তা দিয়ে অল্প চাল ডাল এবং তরিতরকারি নিয়ে এসেছিলাম। তা সব দশদিনের আগেই শেষ হয়ে গেলো।
মা কাল থেকে বারবার বলে আসছিলেন,
-- লজ্জা ফেলে কি হবে বল, সবাইকে কি না খাইয়ে মারবি ? যে অল্প তরকারি ফ্রিজে আছে তাতো কাল না হয় পরশু শেষ হয়ে যাবে। তারপর কী হবে?দেখনা তোর বন্ধুদের কারো কাছ থেকে কিছু ধার-দেনা পাও যায় কিনা??
আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বল্লাম,
-- কে দিবে বলো মা..? ওরাও তো আমার মতোই অবস্থায় হয়তোবা আছে।
মা তাও চেষ্টা করতে বলছিল। আমি মনে মনে যে বন্ধুর কাছে বিকালে ফোন দিতে চাইছিলাম.. সেই আগে ফোন দিয়ে বলে তোর কাছে কিছু টাকা হবে রে...? আমি একটা দুঃখের ব্যাঙ্গাত্বক হাসি দিয়ে বল্লাম..
-- কার কাছে ফোন করেছিস ভাই, আমিও তো শূন্য হাতে কোনো রকম অল্পস্বল্প খেয়ে বেঁচে আছি।
ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে দিল। ঠিক মনে হয় আমার মতোই অবস্থা। তবুও টাকা ধার পাবে না জেনেও মনকে বুঝানোর জন্য কল দিয়েছিল হয়তো।
মা আমাকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ যারা করছিলেন তাদের সাথে কথা বলতে বলেছিলেন। আমিও গিয়েছিলাম তাদের কাছে। হয়তো বলতে পারিনি লজ্জার কারণে। বাসায় চলে আসছি খালি হাতে।আমি ওদের কাছে চাইবো কী করে, নিজের চোখ দিয়ে দেখছিলাম যারা ত্রাণ নিচ্ছে ওরা কেউ রিক্সা চালায়, কেউ দিনমজুর। তাদের আবার ত্রাণ দিয়ে ছবিও তুলছে।
আমাকে কোনো দিন তো হাত পাততে হয়নি কারো কাছে। হাত পাতিনি এমটা নয়.. তবে এক হাত পাতিনি কখনো,
দুহাত পেতে চাই উপরওয়ালার কাছে।
"যিনি সব মালিকের মালিক"
এমন অভাবের দিন আসবে সেটাও কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি।
মা কে মাঝে মাঝেই আমি ১০/২০ টাকা যা দিতাম মা হয়তোবা সেটা খরচ না করে মাটির ব্যাংকে জমাচ্ছিল চার-পাঁচ মাস ধরে। মা আমাকে বল্লো...
অন্যদিন এরকম আমার কোনো প্রয়োজনের কথা জানলে আমাকে অল্প দিয়ে হলেও আমাকে বলতি মা এ কটাকা দিয়েই হবে তো..?
মা আর কিছু না বলে আমাকে শুধু বলল,
মাটির ব্যাংকটা ভেঙ্গে দেখ, কদিনের বাজার খরচের টাকা হয় কি না,
মায়ের কথামতো কাজটা করলাম, মায়ের জমানো টাকা নিতে কষ্ট হচ্ছিলো যদিও,
কিন্তুু নিরুপায় , ব্যাংকটা ভেঙ্গে হয়তো কারো কাছে যেতে হলো না কিন্তুু টাকা পেলাম ১৯৭০/=
মা- আপাতত কয়েকদিন কোনো রকম চলতে পারবো আমরা। বড় বিপদ থেকে বাঁচিয়েছিস মা..
বলে আমি আমার রুমে এসে জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে চোখে ভাসিয়ে তুললাম, দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে সবচেয়ে বেশি বিপদে আমার মতই হাজারও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। না পারছে গিয়ে ত্রাণ বিতরণের লাইনে দাঁড়াতে, না পারছে উপোস থাকতে। তাই পরিবারে যার যা জমানো আছে সব নিয়ে তারা ক্রান্তির মুহূর্তটা কাটানোর চেষ্টা করছে। যদি শেষ হয়ে যায় সেই সম্বলটুকু? দেশের পরিস্থিতি যদি খারাপের দিকে যায়, তাহলে কী হবে তাদের? খেটে খাওয়া মানুষগুলোর সাথে গায়ে গা লাগিয়ে কি লাইনে দাঁড়াবে? নাকি শরমের কারণে উপোস থেকে থেকে মরবে কী জানি। বড্ড ভয় হয় মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য। এই মুহূর্তে তারা-ই সবচেয়ে বেশি অসহায়।
গরিবদের জন্য যেমন আছে, তাদের জন্য কি কেউ আছে?
সময় করে সম্পূর্ণ পোস্টটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ। ভালো থাকবেন সবাই। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হবেন না। বের হলেও সকলেই মাস্ক 😷 ব্যবহার করুন। আল্লাহ্ হাফেজ।