বিকেলে পার্কে বসে শিশুদের খেলা দেখছিলাম । বাবা তখন আমাকে হাওয়াই মিঠাই কিনে দিলেন । হাওয়াই মিঠাই খেতে লাগলেই এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যায় । তাই আজ হাওাই মিঠাই না খেয়ে হাতে ধরেই রাখলাম আর বাবার দিকে তাকিয়ে থাকছিলাম ।বাবা ছোট্ট শিশুদের খেলা দেখে অনেক আনন্দই পাচ্ছিলো ।
বাবা আমার দিকে তাকাতেই আমি হাসতে লাগলাম ।আমি জানি বাবা আমার জন্য কষ্ট পায় ।আমি যদি বাকি পাঁচ-ছয় জনের মত কথা বলতে পারতাম তাহলে বেশ ভালই হত আমি আর বাবা অনেক গল্প করতে পারতাম ।তবে নিজের সাথে আমি প্রতিদিনই কথা বলি যেমনটা এখন বলছি ।আমি জানতাম না আমার আধো আধো ধ্বনি কেউ শুনতে পারে না।
সেই ছোট বেলার কথা বয়স আর কতই হবে মনে হয় তখন আমার ১ বছরই হবে ।মা আমাকে অনেকবার বার বলতো -আমাকে তুই মা বলে ডাকতো খুকি ।আমি মায়ের কথা কিছুই বুঝতাম না কোন ভাবে মা বলতে শিখেছিলাম ।মা খুশিতে সবাইকে বলছিল আজ খুকি আমাকে মা বলে ডেকেছে ।তারপর থেকেই বাড়ির সবাই আমাকে তাদের নাম ধরে ডাকতে বলেছিলেন আমিতো অনেক ছোট ছিলাম তাই হয়তো আর কারো নাম ধরে ডাকতে পারছিলাম না ।ধীরে ধীরে যখন আমি বড় হচ্ছিলাম মা আমাকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে লাগছিলেন ।
একদিন মা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন ।সে দিন মা বাড়ি ফিরে অনেক কাঁদছিলেন । আমি দাদুর কাছে বসে ছিলাম মা আমার কাছে এসে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন – খুকি বল সোনা তুমি আমার মা । আমি মায়ের কথা শুনতেই পারছিলাম না তাই মাকে কিছু বলতেই পারছিলাম না ।মা রেগে আমাকে চর মেরেছিলও তারপর মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন ।
এরপর থেকেই মা কখনই আমাকে চোখের আড়াল করতেন না । আমি কারও সঙ্গে খেলতে লাগলে তারা আমার ইশারা বুঝতে পারতো না তাই আমার সাথে তারা খেলতেই আসতো না । তখন থেকেই একা থাকতে ভালোবাসি আর আমার ছায়া আমার বেস্ট বন্ধু হয়েছে ।
আমার ছায়া আমাকে ছেড়ে কখনই চলে যায় না ।আমার মতই আমার ছায়া কথা বলতে পারে না ।এজন্যই হয়তো আমাদের বন্ধুত্বটা আজ টিকে আছে ।আমি ভেবেছিলাম স্কুল ব্যাগ কাঁধে নিয়ে আমিও স্কুলে যাব ।বাবা অনেক স্কুলেই আমাকে ভর্তি করানোর জন্য কথা বলেছিলেন কিন্তু আমি তখন স্কুলে ভর্তি হতে পারি নি ।
তাই মা আমাকে রোজ বাড়িতে পড়াতেন আর ইঙ্গিত দিয়ে বোঝাতেন ।মা আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছেন ।বাবা কাজের জন্য বিদেশে চলে গেছিলেন ।এইতো তিন বছর আগেই দেশে ফিরেছেন ।
বাবা সকাল হলেই আমার জন্য চা বানাবে আর চায়ের কাপে চামচ দিয়ে শব্দ করেই আমাকে ঘুম থেকে উঠাবে । মা এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার পর বাবাই আমার দেখাশোনা করে।বোকার মতই আমি বাবাকে ভুল বুঝে ছিলাম । আমি ভেবেছিলাম বাবা আমার কথা বুঝতে পারে না তাই আমাকে ভালবাসেনা ।আমার ধারণা সম্পূর্ণই মিথ্যা ছিল।সত্যি বলতে , আমাকে কেউ পছন্দ করে না জানিনা কেন আমার মনে হয় সবাই শুধু আমায় সহানুভূতি দেখায় ।
তাই হয়ত বাবাকে ভুল বুঝেছিলাম ।এখন আমি আর বাবা সারাক্ষণ আড্ডা দেই ।আর বিকেল হলেই পার্কে বেড়াতে আসি ।আজও আমি আর বাবা পার্কে এসেছি ।ওহ সন্ধ্যা হয়েই গেল আর কতক্ষণ নিজের সঙ্গে এভাবে কথা বলবো ।একটু পরেই আমি আর বাবা হেঁটে হেঁটে বাড়িতে চলে আসলাম ।