বিগত বছরগুলিতে আমি অনেক দর্শকের সাথে পরিচিত হয়েছি যারা সাদাকালো সিনেমা দেখলে সে পথ আর মাড়াতে চান না। আধুনিক সিনেমার দাবি জানান। আমি তখন উত্তর দিই, হ্যাঁ, ৭০ সালে নির্মিত। আধুনিকই তো! এরপর চোখ কপালে উঠে যায়! ফলাফলে টাইটেলের প্রশ্নটা শুনি, আমার মতে আধুনিক সিনেমা কী।
এই নিয়ে লিখেছিলাম বেশ কিছুদিন আগে, এলোমেলো ভাবনা সম্বলিত আলাপ। তবে চেষ্টা করেছি আমার বক্তব্য পরিস্কার করার। ডিসক্লেইমার হলো, দর্শককে এভাবে ভাবতে হবে না বা আমি সে দাবীও করছি না। কেবল এই টার্মটার অসারতা ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গিতে তুলে ধরছি।
আধুনিক সিনেমা
যদি আধুনিক বলতে প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজের বিবর্তন বোঝানো হয়— তবে আধুনিক সিনেমা বলতে কিছু নেই।
সিনেমার সম্পূর্ণ রূপ কখনোই হবে না, সময়ের সাথে পাল্টাবে। নতুন যা কিছু আসবে, তাই সিনেমার অংশ। যা ব্যবহার করা হচ্ছে আর হচ্ছে না, তা নিয়েই সিনেমা।
সাউন্ড সিস্টেম এলে সাউন্ডওয়ালা সিনেমা তখনকার সাইলেন্টের তুলনায় আধুনিক ছিলো। টেকনিকালার এলো, ব্লাক-এন্ড হোয়াইট পুরনো হলো। ফিল্ম ক্যামেরার বদলে আরি আর রেডের জয়জয়কার বর্তমানের আধুনিকতা, স্পেশাল ইফেক্ট থেকে ভিজুয়াল ইফেক্টসে পরিবর্তন বর্তমানের আধুনিকতা।
ভবিষ্যতে যখন ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আসবে, তখন বর্তমানের চল পুরনো হবে।
ক্লাসিক মিজ-অঁ-সেন, মন্তাজ, শট ইন ডেপথ, ইলাবোরেটেড সিঙ্গল শট ইত্যাদি— কোনটাই একে অপরের উত্তরসুরী নয় যা তাঁর পূর্বসূরিকে নাকচ করে দিতে পারে। এই ব্যাপারে Andre Bazin-এর " পুর্নাঙ্গ সিনেমা একটা মিথ " মতামতে বিশ্বাস করি।
আর যদি আধুনিকতাকে অগ্রসরতার সমার্থক শব্দ ধরা হয়—
চিন্তাধারার আধুনিকতার প্রেক্ষাপটে সিনেমার আধুনিকতা নির্ধারণ করায় একটা অসুবিধে আছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো আধুনিকতার প্যারামিটার নির্ধারণ করা।
আধুনিকতা বলতে ধারা বোঝালে পুরনো ও নতুন দুটো আলাদা ধারা মাত্র। একে অপরের বিপরীত নয়, গর্হিত ও গ্রহণযোগ্য - এমন ভাগে ভাগ করা যায় না, পিছিয়ে পড়া এবং অগ্রসরতা - এমনভাগে ভাগ করা যায় না।
অন্যদিকে আধুনিকতা বলতে অগ্রসরতা বোঝালে পুরনো ধারাকে অগ্রহণযোগ্য আর বাতিল বলে ধরা যায়। অর্থাৎ এক্ষেত্রে—সিনেমার বক্তব্যকে বিচার করে আধুনিক আর সেকেলে পার্থক্য করা।
টেকনোলজি আর সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজের পরিবর্তন বাদ দিলে সিনেমার আরেকটা মূল বিষয় থাকে দর্শন, যেটাকে সিনেমার মূল ভাব বা বক্তব্য ধরতে পারি। (ভিজুয়াল আর্টের ব্যাপারটা বাদ দিচ্ছি, কারণ এটা সিনেমার জন্মের বহু বছর আগে থেকেই আছে অন্য মিডিয়ামে।)
অগ্রসরতা অর্থে আধুনিকতা ব্যবহার করতে চাওয়ার ন্যারেটিভ দর্শনের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।
দর্শন খুব বেশী মাত্রায় সাবজেক্টিভ, যে কোন দর্শনধারা নিজেকে শ্রেয়তর ও চরমতম ভাবতে পারে। একই সাথে সিনেম্যাটিক জিনিয়াসের সাথে সভ্যতার মাপকাঠিতে ভয়ংকর, কদর্য ফিলোসফি জুড়তে পারে।
এটা ঠিক, কিছু চিন্তাভাবনা মুক্ত এবং সবসময় আবেদন রেখে যাবে। কিন্তু উন্নত চিন্তার উপর সিনেমার আধুনিকতা নির্ধারণ করার দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মিডিয়ামের ইনটেগ্রিটি রক্ষা করা। ফিলোসফিকালি রিচ কোন সিনেমা সিনেমাটিক ল্যাঙ্গুয়েজের তোয়াক্কা না করে তাঁর বক্তব্যে চাপ দিলে সাবভারসিভ ধারার জন্ম নেয়, কিন্তু এটাকেই আধুনিক সিনেমা বলা হলে মাধ্যম হিসেবে সিনেমার পরিবর্তনটা সাহিত্যের মত খুব বেশী আইডিয়ানির্ভর মাধ্যম হয়ে যায়, ভিজুয়াল মাধ্যম হিসেবে সৌন্দর্য হারায়। এমন ফলাফল কারো কারো কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে, আমার কাছে মনে হয় না।
সুতরাং অগ্রসরতা অর্থে সমৃদ্ধ দর্শন ও যাচ্ছেতাই সিনেমা ল্যাঙ্গুয়েজকে আধুনিক বলতে পারছি না। আবার সমৃদ্ধ সিনেমা ল্যাঙ্গুয়েজ ও খেলো দর্শনের সিনেমা আধুনিক বলতে পারছি না, কারণ দর্শন সাবজেকটিভ। কেবল ডকুমেন্টারি সিনেমা অবজেকটিভ হতে পারে। তখন আধুনিকতার ব্যাপারটা গুরুত্ব দেয়া যেত। কিন্তু ডকুমেন্টারি সিনেমা ডমিন্যান্ট ধারা নয়, ছোট অংশ। তখন আবার নতুন সমস্যা গজাবে— ডকুমেন্টারির বিষয়বস্তুর সত্যতা নিরূপণের। এ কাজটা হয়ে যাবে তখন থিসিসের মতো, প্রসিডিউরাল। সৃষ্টিশীলতা বিদেয় নিলো।
তাই সিনেমার সাথে আধুনিকতার ধারণাই বাদ দিতে চাই। যে সিনেমা একই সাথে ল্যাঙ্গুয়েজ ও দর্শনে সমৃদ্ধ হবে, তাঁকে 'খাঁটি' সিনেমা বলতে পারি।
যে কোন খাটি সিনেমার গুরুত্ব সময়ের সাপেক্ষে আধুনিকতা থেকে উঁচুতে।