বহুকাল আগে, বহু ক্রোশ দূরে, গোপাল নাম করে এক নবীন, দেশরত্ন, দেশের ভবিষ্যৎরূপী প্রদীপ হাইভ.ব্লগে একাউন্ট খুললো। কুতটিউব থেকে সে দেখেছে হাইভে বেশ টাকা পয়সা কামানো যায়। এদিকে তাঁর এলাকার বড় ভাইও তাঁকে শুনিয়েছে অঢেল ধন সম্পদের কথা। কাজটা সহজ, যা ইচ্ছে তাই লিখতে হবে! এটা কোনো ব্যাপার হলো ? গোপালের মুখে এক চিলতে ক্রূর হাসি ফুটে ওঠে। সে মাসে শ'খানেক পোস্ট করে হাজার ডলার সহজেই বাগাবে!
হাইভে জয়েন করেই গোপাল ঝটপট #introduceyourself ট্যাগ ব্যবহার করে নাতিদীর্ঘ পোস্ট লিখে ফেলে। ওতে গোপালের চৌদ্দ পুরুষের ঠিকুজীর হাল-হকিকত বিস্তারিত জানান দেয়। কারণ, গোপাল জানে, সবার তো আর আত্মীয় স্বজন নেই। নিশ্চয়ই ওর থাকার ব্যাপারটা আগ্রহ নিয়ে পড়বে লোকে।
পোস্ট করে গোপাল উত্তেজনা নিয়ে মিনিট গুণতে থাকে। ক'টা কমেন্ট এসেছে। টার্মিনাল থেকে কয়েকজন লিঙ্ক টিঙ্ক দিয়েছে। ওতে লাভ নেই, ওদের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। গোপাল বসে থাকে অপেক্ষায়।
ইয়েস! বিডিভোটার ভোট দিয়েছে!
এরপরে কয়েকদিন গোপাল নানা পোস্ট করে। শুরুতেই "বন্ধুরা" দিয়ে শুরু করে, কারণ গোপাল জানে, হাইভে একাউন্ট খুলেছে মানেই তাবত হাইভ ইউজার ওর জিগরি দোস্ত।
বাগানে গিয়ে একটা ফুলের ছবি তোলে এবং ফুলটা কত উপকারী আর সুস্বাদু তাই নিয়ে ল্যাখে। পোষা বিড়ালের ছবি তোলে আর ওর লোম যে অন্য সকল বিড়াল থেকে আলাদা, তা জানাতে ভোলে না।
ওর মা রান্নাঘরে রান্না করেন, গোপাল উঁকিঝুঁকি মেরে ফটো তুলে, একদম খুঁটিনাটি মশলা কি কি দিয়েছে তার ছক টেনে পোস্ট করে। কারণ, সবাই কি আর রাঁধতে পারে? নিশ্চয়ই হাইভে রেসিপি দেখে অভাগা ভুভুক্ষুগুলো এইবেলা জম্পেশ রেঁধে খাবে।
এরপর গোপাল করে মেকআপের পোস্ট।
দুষ্টু লোকেরা রা রা করে তেড়ে আসে—গোপাল তো ছেলে, ও কী করে মেকআপ করলো? আজ্ঞে, আপনাদের এইসব লিঙ্গ বৈষম্য ছাড়ুন।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, বিডিভোটার তেমন ভোট দিচ্ছে না। মনঃক্ষুণ্ণ হলো গোপাল। মুখের কথা নাকি?
আমি শালা এত কষ্ট করে কত চমৎকার লিখলাম, আর ভোট দিলিনা? তো ভোটটা কাকে দিচ্ছিস দেখি, অ্যাঁ?
প্রথমে যেমন ভেবেছিল অনেক অনেক লিখে অনেক অনেক ডলার কামাবে, তেমন আর হচ্ছে না। বাগানের ফলমুল, তরিতরকারি শেষ। গোপাল ফেসবুকে যায়। দেখে কে যেন চমৎকার একটা লেখা লিখেছে। গোপাল সেটা সোজা কপি-পেস্ট করে হাইভে পোস্ট করে দেয়। তবেরে, এবার জম্পেশ লেখা দিয়েছি, কোন অজুহাত নেই ভোট না দেয়ার! নতুন করে উত্তেজনায় ভোগে গোপাল।
কিন্তু গোপাল মন খুলে এসব বলে না। সে ডিসকর্ড সার্ভারে শুধোয়, এই লিখলাম, টিখলাম। সাপোর্ট পাচ্ছি না। কিন্তু ওখানকার লোকেরা তেমন পাত্তা দিচ্ছে না।
কী আজব, কাজ করেছি, পারিশ্রমিক কই?
উল্টো ষণ্ডা দেখতে এক গুণ্ডা জানতে চায়, গোপালকে হাইভে কে এনেছে।
এই সেরেছে, বড় ভাই পই পই করে বলে দিয়েছে ঘুণাক্ষরেও জানানো চলবে না তার নাম। গোপাল বললো, সে জানে না বড় ভাইয়ের নাম, পরিচয়, বা কিভাবে হাইভ নিয়ে জেনেছে।
স্বপ্নে সে শুনেছে হাইভের নাম, শুনে জয়েন করেছে। স্বপ্নে পাওয়া হাইভ।
স্বপ্নের উপর আর কিছু আছে? এরা কি ফ্রয়েড পড়েনি? অকাট্য যুক্তি!
কিন্তু এর মধ্যে এক টিকটিকি ফেসবুক থেকে কপি করা পোস্টের হদিস বের করে ফেলেছে। বলছে, আরেকজনের লেখা চুরি করা যাবে না। গোপাল জবাবে বললো, ও জানতো না অন্যের লেখা মেরে দেয়া ঠিক না। কারণ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কবিতা লিখেছে বলেই যে কবিতা ওর বাপের সম্পত্তি তা তো নয়। ও কবিতা তো আমারও! আরে ভালো লেখা হলেই হলো, কে লিখেছে তা দিয়ে কী হবে রে, চণ্ডাল?
কিন্তু এসব ভাবতে না ভাবতেই এক পাথরবিদ গোপালের পোস্টগুলো লাল করে দিয়ে এলো ডাউনভোট দিয়ে। গোপালের রেপুটেশন এখন শূন্যের চেয়েও কম। লেখাগুলো লুকায়িত হয়ে গেছে।
গোপাল বুঝতে পারলো, আসলে বাঙালি আরেক বাঙালির ভালো চায় না। সুযোগ পেলেই পুটু মেরে দেয়। আজ তার একাউণ্টের মৃত্যুর কারণ বাঙালির ঈর্ষাপরায়ণ পুটু-মারা মন।
খানিকক্ষণ গজগজ করে বাঙালির গুষ্ঠি উদ্ধার করে গোপাল ভাবলো, এই বেলা নতুন একাউন্ট খুলবে। এরপর স্প্লিন্টারল্যান্ডসের কার্টুনগুলো ছাপ দিয়ে এঁকে স্টিমমন্সটার আর টিপু ভোট খাবে।
নতুন করে উত্তেজনায় ভুগতে লাগলো গোপাল।