Umkrem and Big Hill Falls এর মতন বিশাল বিশাল দুটো অসাধারণ ফলস দেখা শেষ করে আমরা চললাম দুপুরের খাওয়ার খোঁজে। প্রায় সবাই ঝর্ণার পানিতে ভিজে একাকার, আবার এদিকে হোটেলে যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। খাবারের দোকানের পাশে একটা পাবলিক টয়লেট থাকায় সবাই যার যার মতন গিয়ে ওখানেই ড্রেস চেঞ্জ করে নিলো (নাক শিটকাবেন না! বেশ বড়, পরিষ্কার, এবং চেঞ্জিং এর জন্য আলাদা রুম ছিল, সব পাবলিক টয়লেট খারাপ হয় না 😛)।
কিন্তু বিপত্তি বাধলো আমার লাগেজ নিয়ে। যেই পিন লক ভেবে এসেছিলাম সেটা কাজ করছে না। সবাই খেতে চলে গেছে, এদিকে আমি একলা বাসে বসে যা যা মনে আসে সব ডিজিট দিয়ে ব্যাগ খোলার চেষ্টা করছি। একেবারে রাতে হোটেলে গিয়ে যে দেখবো সেই চান্সও নিতে পারছিলাম না কারণ এই ভেজা জিন্সে রাত পর্যন্ত থাকলে প্রথম দিনেই ঠান্ডা লেগে যাবে নিশ্চিত! প্যানিক না খেয়ে ম্যাথা ঠান্ডা রেখে আমার ছোট বোন আর আমি মিলে ১০/১৫ মিনিট ধরে চেষ্টা করলাম। অবশেষে মেলা ঝামেলার পর কোন রকমে লক খুলতে পেরেছিলাম! শুকরিয়া আদায় করতে করতেই বাকি বেলা পার হয়েছিল!
তো এরপর ড্রেস চেঞ্জ করে খাওয়ার টেবিলে বসার সময় আবার টেনশন শুরু হলো। খাবার ভালো হবে তো? আগের বার ইন্ডিয়ায় খাবারের একপেরিয়েন্স আমার মোটেও ভালো ছিল না। টানা ১৪ দিন এমোডিস নিয়ে ঘুরতে হয়েছিল। কিন্তু অবাক করার মতন ব্যাপার হলো মেঘালয়ে যে কয়দিন ছিলাম সবখানের খাবার খেয়েই fully satisfied! পুরো চেরাপুঞ্জি আর শিলং জুড়েই খাসিয়াদের রাজত্ব। আর এই পাহাড়িরা, খাবারে লোকাল ইন্ডিয়ানদের মতন ঠেসে পনির, তেল, আর মসলা দিয়ে রান্না করে না। এদের নরমাল ভাত, মাংস, ডিম আমাদের থেকেও সিম্পল, এবং মজার, বিশেষ করে ডালটা!
আর সব থেকে ভালো লেগেছে ওদের লোকাল পানি খেয়ে! মেঘ আর ঝর্ণার রাজ্যে পানি তো মজার হবেই!
তবে বেশিরভাগ খাসিয়ারা ইংরেজি বা হিন্দি অতটা ভাল বুঝে না, আমাদের ট্যুর গাইড সবার মেন্যু কুককে বুঝাতে গিয়ে ভালো হ্যাসেলে পড়েছিল।
খাওয়া শেষে এক্সপ্লোর করা শুরু করলাম Mawlynnong Village. যেটা নাকি এশিয়ায় সবচেয়ে সুন্দর আর পরিষ্কার গ্রাম। আমি যতটুকু জেনে গিয়েছিলাম যে এই গ্রামে প্লাস্টিক আর পলিথিন বলতে কিছু নাই। কিন্তু গিয়ে দেখলাম টুরিস্ট স্পটগুলায় লোকালরা জিনিসপাতি নিয়ে বসেছে। সাথে খাবারের আইটেমও রয়েছে। আর সেসব টং দোকানের পাশে as usual চিপসের প্যাকেট পরে টরে আছে। প্রতিটা মোড়ে ময়লা ফেলার জন্য বেতের টুকরি থাকার পরেও সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রামের এই হাল দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল।
তবে এই ময়লা ফেলার ঝুড়িগুলা আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। এটাকে ঠিক ঝুড়ি বলা যায় না, দেখতে অনেকটা কোনের মতন, মনে হচ্ছিল উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখেছে।
সুন্দর ছিমছাম গ্রামটার পাহাড়ি উচুনিচু রাস্তা দিয়ে নেমে পড়লাম living root bridge দেখতে। পুরোপুরি গাছের শিকড় দিয়ে মোড়ানো বিশাল জলস্রোতের উপর বানানো অবাক করার মতন এই ব্রিজ। লিভিং রুটের ব্যাকগ্রাউন্ড সাইন্স বুঝার জন্য যখন প্রস্তর ফলক পড়া শুরু করলাম তখন বুঝলাম প্রায় ১০০ বছরের পুরোনো এই ব্রিজ তৈরি হয়েছে রাবার গাছের শিকড়ের মাধ্যমে।
বছরের পর বছর এই Ficus elastica গাছের শিকড়গুলোকে একসাথে বেঁধে এমন ভাবে ট্রেইন করা হচ্ছিল যাতে তারা একটি নির্দিষ্ট ডিরেকশনে এগিয়ে যায়। খাসি এবং জয়ন্তিয়া ট্রাইবরা তাদের যাওয়া আসার সুবিদার্থে এ সেতু বানায়। এই লিভিং রুট ব্রিজ UNESCO World Heritage Sites এও নাম লিখিয়ে নেয়।
ghibli movie'র মতন ঝি ঝি পোকার শব্দ আর Umshiang নদীর পানির স্রোতের সাউড মিলিয়ে বিকালের প্রায় নিভু নিভু আলোয় অদ্ভুত এক মায়াজালে আচ্ছন্ন হয়েছিলাম। রাতের বেলা বাসে করে ফেরার পথে মেঘে ঢাকা ঠান্ডা পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ভাবছিলাম, প্রকৃতি আসলেই এত সুন্দর হয়!