দেশীয় গয়নার প্রতি আমার আলাদা একটা টান আছে। ছোটবেলায় এত বেশি মাটির গয়না কেনা হয়েছে যেগুলা দিয়ে এখন চাইলে এক্সিবিশন দেয়া যাবে। বাংলাদেশ ছাড়াও অন্যান্য দেশের স্যুভেনির দেখতে গেলে ওদের লোকাল ক্রাফটের ওপরই সবার আগে চোখ যায়। নামকরা ব্রান্ডের দামি অর্নামেন্টসের চেয়ে তাই যত্ন নিয়ে হাতে বানানো গয়নার কদরই আমার কাছে বেশি।
তবে আমি একটু শুকনা বিধায় বালা বা চুড়ি কিনতে গিয়ে অনেক সময়ই প্যারা খেতে হয়। আমাকে দেখেই শুরুতে দোকানদার বলে দেয়, "না আফা, আফনের সাইজ দেওন যাইবো না।" প্রতিবার এইভাবে শুকনা হওয়ার অপবাদ নিয়ে দুঃখভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরতে হতো। এরপর কয়েকবছর আগে জানতে পারি চাঁদনি চকে নাকি নানা সাইজের কাঠের বালা পাওয়া যায়, যেখান থেকে পাইকারি দরে কিনে নিয়ে সুন্দর করে রঙ করে নানা পেইজে বিক্রি করা হয়। শুনে আমার খুশি আর দেখে কে! বাগবাগ করতে করতে পরেরদিনই গাউসিয়ার আশপাশে কয়েক চক্কর দিয়ে বালার খোঁজ পেয়ে যাই। এখনও মনে পরে আমার লোভাতুর চকচকে চোখ আর তব্দা খেয়ে হা হয়ে যাওয়া মুখ দেখে দোকানদার হেসেই দিয়েছিল। আর এই দিকে পাইকারিতে এত জিনিস দেখে আমার মাথায় একটা জিনিসই ঘুরছিল, "আহা, এতদিন কোথায় ছিলে!"
কয়েক জোড়া কিনে আনার পর একেক করে রঙ করতে বসলাম। কাঠের উপর এক্রেলিক কালার করে সেটা আবার invisible color paint spray দিয়ে সেট করতে হতো, পানিতে ভিজলেও রঙ যাতে থেকে যায়। প্রথম কয়েকটা বানানোর পর বুঝলাম চুড়ির ভেতরে আগে শিরিষ কাগজ দিয়ে বার্নিশ করে নিতে হয়, না হলে পরে হাত ছুলে গিয়ে অবস্থা বেগতিক হয়ে যায়। নিজের জন্য এক জোড়া করে ফেইসবুকে ছবি দেবার পর একের পর এক অর্ডারের হুমড়ি আসতে থাকে।
এখানকার ছবিগুলার মধ্যে প্রায় সবই কমিশনের কাজ। এসব করতে গিয়ে সবথেকে বড় যে ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল তা হলো অনলাইনে আপুদের হাতের সাইজ মেলানো। স্কেল দিয়ে মেপে পাঠালেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চুড়ি ছোট হয়ে যেতো। কুরিয়ার করে আবার ফেরত পাঠিয়ে নতুন করে বানিয়ে দেয়া কম ঝক্কির কাজ না। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০/৪০ জোড়া বানানোর পর এত ঝামেলা দেখে এদিকে আর পরে পা মাড়ানো হয় নাই। সেদিন গ্যালারিতে ছবি ঘাটতে গিয়ে এসব সামনে চলে আসায় মনে হলো, নাহ, এসব নিয়ে একটা পোস্ট তো লেখাই যায়। তবে আর যাই হোক, এ জিনিস করে আমার বালা না পাওয়ার আউশ মিটেছিল বলা যায়!