আমার কাছে মনে হয় চিঠির থেকে বেটার গিফট কিছু হয় না। চিঠি এমন একটা আবেগের জায়গা যেখানে একজনের জন্য মনের ভেতরে থাকা সব কথা উগরে দেয়া যায়। আমাকে এ পর্যন্ত যতজন চিঠি দিয়েছে সবারটাই খুব যত্ন নিয়ে রেখেছি, পড়েছি৷ এমন প্রায়ই হতো যে পড়তে পড়তে পুরো চিঠিই মুখস্থ হয়ে যেতো!
আনন্দের বিষয় হলো চিঠি পেতে ভালবাসি জেনে আমার কাছের মানুষ, বন্ধুরা সবাই ছোটবেলা থেকেই চিঠি দিতো। বিশেষ করে জন্মদিন বা স্পেশাল কোন দিনে ছোট খাটো গিফটের সাথে একটা চিঠি লেখা থাকতো। আবার বান্ধুবিদের সাথে ঝগড়া হলেও চিঠি দিয়েই রাগ প্রকাশ বা মিটমাট করতাম। আমি সামনা সামনি রাগ ঝাড়তে পারিনা। সেজন্য চিঠিই ছিল একমাত্র ভরসার জায়গা।
জীবনে অনেককেই চিঠি দিলেও আমার পরিবার অর্থাৎ আম্মু বাবা আর ছোট বোনকে কখনও সেভাবে হাতে লিখে চিঠি লেখা হয়নি। ডিজিটাল চিঠি দিয়েছি (ফেইসবুকে) কিন্তু ফরমালি না।
বাবু হওয়ার পর কয়েক মাস টানা আম্মুদের সাথে থাকা হয়েছে। বিয়ের পর আবার এতদিন একসাথে থাকতে পারবো এটা কখনও ভাবি নাই। এতদিন থেকে এবার চলে আসার সময় খুব মন খারাপ হচ্ছিল। কিছু মিনিংফুল দিয়ে আসতে চাচ্ছিলাম। তখন মনে হলো মনের ভাব বুঝানোর জন্য চিঠির বিকল্প আর কি হতে পারে!
একটু ভেবে তিনজনকে আলাদা করে তিনটা চিঠি লিখে ফেললাম। আম্মুকে কিছু লিখতে গেলে মনে হয় এত কষ্ট করে কিভাবে আমাদের দুইজনকে আম্মু বড় করসে! একটা বাবু সামলাতেই আমার হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেখানে আম্মু একলা হাতে কিভাবে আমাদের সামাল দিয়ে আবার ঘর সামলাতো! যতক্ষণ না পর্যন্ত নিজের প্যারেন্টিং না করতে হয় তার আগে বুঝা যায়না বাবা মা'র ত্যাগ। আর এই আম্মুর সাথেই আমি সারাদিন কত চিল্লাচিল্লি করি। করার পর ঠিকই গিলটি ফিল হয়! কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যায়। এসবের জন্য আম্মু মাফ না করলে কোন জাহান্নামে যে যাওয়া লাগবে!
এদিকে বাবার কিছুদিন আগে হার্টে রিং পড়ানো হয়েছে। এত ওয়েল মেইনটেইনড লাইফস্টাইল লিড করা সত্ত্বেও এই অবস্থা। প্রতিদিন হাঁটা, খেলাধুলা, নিয়ম মত খাওয়া দাওয়া সবকিছুই সুন্দর করে ফলো করে বাবা। এর পরেও ব্লক ধরা পড়ার কথা কেউ ভাবতে পারে না। কাজের এত অমানবিক প্রেসার নেয় যে স্ট্রেস লেভেল সব সময়ই হাই থাকতো। যার জন্য রাতে ঘুম আসতেও দেরি হতো। আল্লাহর রহমতে এখন সব নরমাল। এখন এত বড় একটা ধাক্কা সামাল দিতে হয়তো কিছুদিন সময় লাগবে। চাপ কম নিয়ে নিজের যাতে যত্ন করে এইসব উপদেশ চিঠিতে দিয়ে আসছি। ঢাকায় চলে আসাতে বাবার ঠিক মতন যত্ন আর নিতে পারবো না এটা ভেবেই আফসোস লাগে!
আর ছোট বোনটা পড়াশোনা আর জবের চাপে খাওয়া দাওয়া আর ঘুম ছেড়ে দিসে। ডিহাইড্রেশন আর রাত জাগার কারণে চেহারার বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। এভাবে চলতে থাকলে একদিন নাই হয়ে যাবে। হাজার বলেও ওকে দিয়ে সকালে নাস্তা করানো যায়না। কোন ডক্টর নাকি বলেছে সকালে নাস্তা স্কিপ করলে তেমন কোন সমস্যা হয় না! কি অদ্ভুত কথা। ছোটবেলা থেকে জেনে আসছি সকালে ভরপেট খেয়ে রাতে কম খেলেও চলে। সেখানে এখনকার যুগের পোলাপান বলে উল্টা কথা। যাই হোক, ওর চিঠিতেও ভালো মতন জ্ঞান দিয়ে আসলাম। শুনবে যে না জানা কথা। তাও বোন হিসেবে বলা!
চিঠি এখনও লেখা হয় বলে একটা অ্যাস্থেটিক লেটার রাইটিং প্যাড কিনেছিলাম। ভালই কাজে লাগছে। আমি যখন থাকবো না তখন এই চিঠিগুলাই হয়তো মেমরি হিসেবে ওদের থেকে যাবে৷
আমি খুব করে চাই এই চিঠি লেখার অভ্যাসটা আমাদের মধ্যে আবার শুরু হোক। হাজার এসএমমেস দিলেও চিঠির আবদার অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হয় না। নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি করে লেখালিখির জন্য উৎসাহ দেয়া উচিত। নিজের জায়গা থেকে যতটা পারি করছি। বাকিটা দেখা যাক! কি হয়!