অনেক মাস পর আবার ইট কাঠের শহর ঢাকাতে নতুন করে আস্তানা গেড়েছি। সাথে নতুন সদস্য। এতদিন দুইজনের নতুন সংসার ছিল। সুযোগ পেলেই বাইরে যাওয়া, একসাথে বাজার-ঘাট, খাওয়া দাওয়া। এখন কোথাও যাওয়ার আগে বিশাল প্ল্যান করে যেতে হয়। সাথে থাকে বাবুর প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি দিয়ে ঠাসা বড় এক ঝোলা। আগে ট্যুরে গেলে একটা ব্যাগপাকেই কাজ সেরে যেতো। সেখানে গত দশমাস ধরে দূরে কোথাও যাওয়ার প্ল্যান করারই সাহস পাই না। ঠান্ডা কাশি লেগে যাওয়ার ভয়ে ঘরবন্দি।
যা ঘুরাঘুরি এখন বাসার আশেপাশেই। বের হয়ে আশপাশের সবকিছু দেখি। শীতের ঢাকাকে কিছুটা উৎসব মুখর লাগে। রাস্তাঘাটে সবাই সুন্দর সুন্দর শীতের পোশাক পরে ঘুরাঘুরি করে৷ গার্মেন্স সেক্টরটা সস্তা হওয়াতে কম আয়ের মানুষরাও এখন কম দামে ভালো পোশাক কিনতে পারে। দেখতেই ভালো লাগে। রাস্তার পাশে শীতের পোশাকের ভ্যান তাই এখন সব সময়ই জমজমাট।
একটু খালি প্লট পেলেই ছেলেরা নেট দিয়ে কোর্ট করে ব্যাডমিন্টন খেলার ব্যবস্থা করে ফেলে। আমার বাসার সামনে কয়েকটা খালি প্লট। জায়গাটা আসরের আজান পর পরেই পাড়ার বাচ্চাদের আওয়াজে গমগম করে উঠে। মাগরিব হলে পাশের বিল্ডিং থেকে বাচ্চাদের বাবা মার ডাক পড়া শুরু হয়। "এই আজান দিসে! তাড়াতাড়ি বাসায় আসো!"৷
আর সন্ধ্যার পর নামে বড় ছেলেপেলেরা। একটু আফসোস হয়, এলাকার মেয়েদের কখনও নামতে দেখি না। এর পরেও ভালো লাগে, এই টুকটাক খালি প্লটগুলা যতদিন আছে ওদের একটা খেলার জায়গা থাকবে।
আর একটু পর পর আছে গলির মোড়ে মোড়ে ভাপা- চিতইয়ের আসর। ঠান্ডায় জবুথবু হয়ে রাতে এই মাটির চুলার পাশে দাঁড়াতেই সবথেকে আরাম লাগে। তাও তো এই পিঠার উসিলায় মাটির চুলা এখনও দেখা যায়! গাছ তো নাই, লাকড়ি যে কেম্নে ম্যানেজ করে কে জানে!
এই শীতে আমাকে এখন যেটা সবথেকে বেশি টানে সেটা হলো সবজি! ভোজনরসিক হওয়ায় খাবার রান্না আর বাজার দুইটা করতেই খুব পছন্দ করি। আর শীতের সবজির জন্য সারা বছরই অপেক্ষা করে থাকি। ভ্যানে চকচকে ফ্রেস শাক আর সবজি দেখলেই আমার আর ত্বহার লোভ লেগে যায়। নুডলস, পাস্তা, ভাত, স্যুপ সবকিছুর সাথেই সবজি দিয়ে রান্না করার চেষ্টা করি।
তবে এই সিজনে খানিকটা বিরক্তির ব্যাপার হলো বিয়ে আর ওয়াজ মাহফিল। বিয়ে মানেই জোরে গান বাজায় বিল্ডিং কাঁপানো। আর ওয়াজ মানে চিল্লায় পাড়া কাঁপানো।
শীতের আরেকটা পছন্দের জিনিস হলো ফুলগাছ। চমৎকার সব গাদা, পিটুনিয়াম, শিউলি এসব ফুলে আশপাশ ভরে থাকে। আমি সুযোগ পেলেই নার্সারিতে হাজিরা দেই!
স্কুল কলেজের বাচ্চাদের এই জানুয়ারি মাসটা বেশ আনন্দের। নতুন বই, নতুন জামা জুতা, বার্ষিক খেলাধুলা। এই সময়ের নতুন বইয়ের ঘ্রান নেয়াটা বেশি মিস করি। (একটা মজার ফ্যাক্ট হলো এই স্মেলটা মূলত বই যে আঠা দিয়ে আটকানো হয় সেই গামের ঘ্রান। ড্যান্ডিখোররা এই আঠা পুড়িয়েই নেশা করে। হেহে)।
আমাদের সময়ে এই শীতের মৌসুমে আমরা গোসল দিয়ে পাটি নিয়ে ছাদে চলে যেতাম। নরম রোদে চুল শুকাতাম। সন্ধ্যা হলে ব্যাডমিন্টন খেলা। জ্যাকেট ট্রাওজার পরে, র্যাকেটের ব্যাগ পিঠে, নাকমুখ বেঁধে সাইকেল নিয়ে দৌড়। ঠান্ডা বাতাসে হাত বরফ হয়ে যেতো। এরপরেও সাইকেল চালানোর যে আনন্দ সেটা মন ভরে নিয়ে নিতাম। সেই সাইকেলে চড়া হয় না গত দুই বছর! ধুলা ময়লা পড়ে একাকার অবস্থা!
এছাড়া স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কবিতা আবৃত্তি, নাচ এসবের জন্য জোরসরে প্রিপারেশন নিতাম। আবার প্যারেড এ মার্চ পাস্ট নিয়েও ছিল তুমুল আয়োজন। কার দল সেরা, নতুনদের ভালো মতন তাল শেখানো, পেপার কাটিং করে দল সাজানো, কমান্ড দেয়া এসব করেই শীতকাল কেটে যেতো।
এছাড়া প্রতিবছর শীতে নানিবাড়ি, গ্রামের বাড়িতে গিয়ে ছুটি কাটানো তো ছিলই। কম হলেও এক সপ্তাহ! আহ, সুন্দর সেই দিনগুলা!
ছোটবেলার এত চমৎকার সব মেমোরি ছিল বলেই এখনও এসব ভেবে দিন পার করে দিতে পারছি। শীত নিয়ে নতুন দিনের অভিজ্ঞতার অপেক্ষায়!