প্রাগ শহর নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোনো ধারণা ছিল না। মাহফুজুর রহমানের "কাফকার প্রাগ সত্যরে আমি কোথায় লুকাই" বইটা শেষ করে মনে হচ্ছে প্রাগের ভেতর বাহির অনেকটাই জানা হয়ে গেলো।
ঘুরাঘুরি, নতুন জায়গা, নতুন মানুষ, তাদের ইতিহাস, মিথ, সাহিত্য এসব কিছুতেই আমার আগ্রহের কমতি নাই। যেহেতু ঘুরাঘুরির সুযোগ হচ্ছে না তাই ট্রাভেল বুক পড়ে যতটা বিদেশ বিভূঁই নিয়ে জানা যায় আর কি। বইটার টাইটেল পড়ে একটু ভিন্নধর্মী লেগেছিল। তাই পড়ে দেখার শখ হলো। পড়া শেষে মনে হচ্ছে ভ্রমণ পিপাসুদের রিকমেন্ড করার মতন একটা বই!
প্রাগ হচ্ছে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী। চেক ভাষায় প্রাহা বলে, আর ইংরেজিতে প্রাগ। ইউরোপে টুরিস্টদের পছন্দের রাজধানীর তালিকায় প্রাগ জায়গা করে নিলেও আমরা অনেকেই শহরটা নিয়ে তেমন একটা জানিনা। আর আমাদের নজরে কম এসেছে বলেই এখনও এর পরতে পরতে সৌন্দর্য রয়ে গেছে। অজানা অনেক বৈচিত্র্য আছে যা ঘুরে ঘুরে আবিষ্কার করা যায়।
এখানকার দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে রয়েছে পাউডার টাওয়ার (নামকরণ হয়েছে gun powder থেকে), এস্ট্রোনোমিকাল ঘড়ি, চার্লস ব্রিজ, ওল্ড টাউন স্কয়ার, প্রাহা ব্রিজ, ক্যাথেডাল, কাফকা মিউজিয়াম, ঝুলন্ত সিগমুন্ড ফ্রয়েড সহ আরও অনেক অনেক জায়গা। প্রতিটা স্থাপনা নিয়েই একেকটা ব্লগপোস্ট করা যাবে। লেখক জায়গাগুলার একদম নিখুঁত বর্ণনা ছাড়াও কেনো বিখ্যাত, পেছনকার ইতিহাস, মিথ, লোকালদের চোখে কেমন, ট্যুর গাইডের বর্ণনা সবকিছুই বিশ্লেষণ করেছেন। তাই না সামনাসামনি না দেখেও পড়ে অনেকখানি আন্দাজ করে নেয়া যায়।
প্রাগের ক্ষেত্রে ভালো লেগেছে ঐতিহাসিক স্থাপনা ছাড়াও পুরোনো বিল্ডিং, টাওয়ার তারা ট্যুরিস্টদের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছে। কিছু পুরোনো বিল্ডিং হোটেল হিসেবে ভাড়াও দেয়া হয় কিন্তু সেখানে বিশেষ নির্দেশনাবলি দেয়া থাকে। কিভাবে সব ব্যবহার করতে হবে, যাতে অ্যান্টিক ভবনের কোন ধরণের ক্ষতি না হয়।
ফ্রান্সেস কাফকার ২/১ টা লেখা পড়লেও তার শহর যে প্রাগ ছিল তা জানা ছিল না। লেখকের বেড়ে উঠার গলি, বাড়ি, কবর সবকিছুই এখন দর্শনীয় স্থান। কিন্তু আমার পড়ে যে জায়গা দেখতে ইচ্ছা করেছে তা হলো কাফকা মিউজিয়াম৷ কাফকার রচনায় উঠে আসা কাল্পনিক সব স্থান, অলিগলির সাথে প্রাগ শহরের অনেক মিল পাওয়া যায়। শহরের স্থাপনাগুলোই রূপক হিসেবে তার গল্পে উঠে এসেছে। সেই সব বর্ণনা অডিও ভিজুয়ালের মাধ্যমে মিউজিয়ামে দেখানো হয়। সাথে কাফকা নিয়ে যাবতীয় সব কিছু। কাফকা না পড়েও তার গল্পে বুঁদ হওয়ার সুযোগ পাওয়া যায় এখানে।
প্রাগকে অন্য শহর থেকে আলাদা করেছে বিখ্যাত কিছু চমৎকার সাইন্টিফিক ভাস্কর্য। ভাস্কর ডেভিড চার্নির অনেক ভাস্কর্যের মধ্যে একটা হলো মেটামরফোসিস।
কাফকার মাথার আদলে বানানো এই ভাস্কর্যটা ৪২ টা চাকতি দিয়ে তৈরি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রতি ৪০ মিনিট পর পর এই চাকতিগুলো ঘুরে ঘুরে ১৫ রকম ডিজাইন তৈরি করে। কোনো কোনোটি ঘড়ির কাঁটার দিকে আর বাকিগুলা বিপরীত দিকে। পুরোটাই স্টেইনলেস স্টিলের করা। ৪০ মিনিট পর সবগুলো ঘুরে আবার আগের জায়গায় চলে আসে। তখন কাফকার মুখ স্পষ্টভাবে অবিকৃত অবস্থায় দেখা যায়। মেটামরফোসিসের থিমকে এর থেকে ভালো মতন আর কি দিয়ে বর্ণনা করা যায়! ইশ যদি সামনা সামনি দেখতে পারতাম!
বিখ্যাতদের মধ্যে আইনেস্টাইনও বেশ কিছুদিন ছিলেন এই প্রাগ শহরে। তিনি অধ্যাপনা করার উদ্দেশ্যে ১৬ মাসের জন্য এই শহরে আসেন।
মজার ব্যাপার হলো প্রাগে এত সব ভাস্কর্যের মাঝে রবীন্দ্রনাথের একটা মুর্যালও দেখতে পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথ দুইবার এসেছিলেন এই প্রাগ শহরে। সে সময়ে নাৎসিদের বিরুদ্ধে রবী ঠাকুর সোচ্চার ছিলেন। চেকদের স্বাধীনতার পক্ষে থাকলেও তিনি চেকদের স্বাধীনতা দেখে যেতে পারেনি।
তার স্মরণে ক্যাম্পাসের মাঝে তার একটি ভাস্কর্য করা আছে। সেখানকার রাস্তাটাও তার নামে নামকরণ করা হয়েছে। ঠাকুরোভা স্ট্রিট। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর সেই রাস্তাতেই রয়েছে তার ভাস্কর্য। ভাস্কর্যের নিচে চেক ভাষায় তার পরিচিতির সাথে একটা কবিতার লাইন। অনুবাদ করে দেয়ার জন্য লেখক পথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মেয়েকে ধরলেন। সে অনেক ভেবে বলে- সত্যরে আমি কোথায় লুকাই এমন ধরণের কিছু একটা হবে।
পরে অনেক খোঁজাখুজি করে লেখক বের করেন এই লাইন কণিকা কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া। যেটা ছিল "দ্বার বন্ধ করে আমি ভ্রমটারে রুখি। সত্য বলে আমি তবে কোথা দিয়ে ঢুকি!"
লেখকের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে সবচেয়ে মজার অভিজ্ঞতা ছিল বিয়ার স্পা! চেকরা এমনিতেই বিখ্যাত বিয়ারের জন্য। ওখানে বিয়ার স্পা বেশ বিখ্যাত। বাথটাব ভর্তি থাকে বিয়ার আর বিয়ার তৈরিতে ব্যবহৃত ভেষজ উপকরণ আর ইষ্ট। গোসল শেষে যেই শাওয়ার আছে সেটা দিয়েও বিয়ারের মতন পানি বের হয়। এরপর বসতে হয় কাঠের বিছানায় পাতা খড়ের মধ্যে। কি অদ্ভুত জিনিস!
বলা হয় এই বিয়ারের ইস্টের মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি, শর্করা, ফ্যাটি আসিড আরও অনেক পুষ্টিকর উপাদান আছে। যা বাত রোগ সারায়, চামড়া পরিশুদ্ধ করে, হজম আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এত কিছুর পরেও আমার কথা হলো গা থেকে যেই ভুর ভুর করে বিয়ারের স্মেল বের হবে এই গন্ধ কতদিন থাকবে!
প্রাহার চার্লস ব্রিজ আর এস্ট্রোনোমিকাল ঘড়ি নিয়ে বলতে গেলে লেখা আরও বিশাল হয়ে যাবে। চমৎকার এই দুইটা স্থাপনা নিয়ে জানার জন্য বইটা পড়ার অনুরোধ থাকলো।
এরচেয়ে ভূতের কাহিনী দিয়ে শেষ করি। gothic theme কে এতটা প্রাধান্য দিয়ে যে একটা শহর তৈরি হয়ে যেতে পারে এটা ভাবাই যায় না। প্রায় প্রতিটি ক্যাথেড্রাল, টাওয়ার, আদি ভবন সব ডার্ক গথিক থিমের আদলে করা। এই থিম যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে সরকারেরও অবদান আছে। ট্যুর গাইডরা অলিগলি, প্রাচীন স্থাপনা, ব্রিজ সবকিছুর মধ্যেই ভুতের গল্প লুকিয়ে রেখেছে। ভূত দেখনোর হন্টেড ট্যুরগুলা রাতে করা হয় যাতে ভালো জমে। এত মজার একটা শহর ট্রাভেল উইস লিস্টে রাখাই যায়!
লেখক মাহফুজুর রহমান তিন বার প্রাগে গেছেন। সেই সুবাদে প্রাগের খুঁটিনাটি সব খুব চমৎকার করে বর্ণনা করেছেন। প্রাগ শহরকে সে এতই ভালবেসেছে যে নিজের ছেলের নাম এই শহরের নামে রেখেছে। উনি ছাড়া অন্য কোনো লেখকের লেখা পড়ে হয়তো প্রাগ নিয়ে এত ভালবাসা জন্মাতো না! ধন্যবাদ ত্বহাকে। এত সুন্দর একটা বই কেনার জন্য!