মাথার উপর খাড়া রোদ আর পায়ের নিচে তপ্ত পীচ ঢালা রোড। শহরের রাস্তাগুলো এমনই হয়৷ ধনীদের জন্য যতোটা মসৃন, আমাদের জন্য তার চেয়েও অধিক উতপ্ত। খুব বেশি প্রয়োজন ছাড়া কেও বাইরে বের হয় না। ওপারার লোকেরা গাড়ি চড়ে, আর আমরা ; তলা ফুটো হয়নি এমন স্যান্ডেল গুলো যত্ন করে তুলে রাখি আজকের দিনের জন্যই৷ পীচঢালা রাস্তায় মরিচীকা বাসা বাধে৷ জীবিকার তাগিদে আমায়াদের মরিচীকার ভেতর দিয়ে হাটতে হয়।
কিছুটা ধীরে কিন্তু একই গতিতে ওমনি পিচঢালা রাস্তায় মাথায় কালো রঙের ছাতি ধরে হেটে আসছে আমার বাবা। একটা ময়লা শ্যামলা সাদা রঙের হাপ হাতা শার্ট, শার্ট এর বুক পকেটে চশমার কাভার টা বেরিয়ে আছে৷ চশ্মা টা শুধুই লিখা এবং পড়ার সময় ব্যাবহার করে থাকেন তিনি৷ রাস্তার এক্কেবারে ধার দিয়ে, একই গতিতে হেটে চলেছেন। মাথা টা নিচু করে কি জেনো ভাবছেন আর বিড়বিড় করে কথা বলছেন। নিজের মতো করে৷ পাশ দিয়ে সাই সাই করে দ্রুত বয়ে চলছে অসংখ্য প্রাইভেট কারের সারি। বাবা হেটে আসছেন, আমি অনেক দুর থেকে এক দৃষ্টি তে চেয়ে আছি। শুধুই দেখছি, একজন ক্লান্ত যোদ্ধা, একজন জীবন যোদ্ধা কে।
বাই দ্যা ওয়ে, আমি " রুদ্র " । ফিজিক্স এ মাস্টার্স করছি। এখনো শেষ হয় নাই। ঠিক মনে পরে না কবে থেকে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম। বাট, এ জে অতি বিরক্তিকর পথ সে আমার বোঝা হয়ে গেছে৷ জীবনে একাধিকবার ব্যার্থ হয়েছি এই পথে৷ বার বার ই ঘুরে দাড়িয়েছি। অনার্স টা শেষ হয়েছে বেশ বছর দুয়েক হবে৷ আপাতত বাবার অন্য ধ্বংস করছি। সবাই এটাই বলে৷ আমি আসলে ভেবে পাই না, আমার ভূল টা কোথায় ছিলো। তবে, এতোটা নিজেকে অপরাধী আমার আর কুনুদিন মনে হয় নাই। কতোটা কষ্ট করতে হয় একটা দায়িত্ব, একটা পরিবারের দায়িত্ব পালন করতে গেলে!!! ভাবতে ভাবতেই বাবা সামনে চলে এলেন৷
কিরে??!!!! এখানে, এতো রোদের ভেতর দাড়ায়ে ক্যানো?? কি করছিস এখানে??
আমি- এমনি, কিছু না৷ আপনাকে না বলেছি, রিকশায় চলাচল করতে!! কথা শোনেন না ক্যানো??!! আপনার তো প্রেশার এখনো হাই। এভাবে কোথায় গিয়েছিলেন??
-কিঞ্চিত হেসে, ব্যাংক এ। কিছু কাজ ছিলো৷
রিকশায় আসলেই তো পারেন!!
আরে ওরা ভাড়া অনেক বেশি চায়৷ আজকাল ওই রিকশা ওয়ালাদের তেজ খুব বেড়ে গেছে৷ আমিও হাটা শুরু করলাম, আল্লাহ আমার পা দেয় নাই নাকি?!? ; কত্তো হেটেছি এক সময়! আমি এর চেয়েও বেশি হাটতে পারি, ওরা ভাবে বুড়া মনে হয় রিকসায় চড়াই লাগবে। বলেই হেসে উঠলেন৷
কতোই বা বেশি নেয়, আপিনে রিকশায় চড়েন না। ওই বিশ টাকা বাচানোর জন্য, জানি তো৷
চুপ থাক৷ টাকা কামাই কর, টাকার মায়া বুঝবি৷ জাড়া টাকা কামাই করে না, তারা টাকার মায়া বোঝে না । এই টুকুর রাস্তার জন্য আমি বিশ টাকা ক্যানো দেবো?!?!
বাবা, এতো টাকা বাচায়া কি করবেন??
সবই তো তোদের জন্য৷
আমার টাকা লাগবে না, আল্লাহ আমাদের হাত পা দিছে। আমাদের টা আমরা কামাই করে নিতে পারবো না.?!?!
কথা দেন, আর এতো খাটনি করে রাস্তায় হাটবেন না। বাবার সাথে বাসায় হাটতে হাটতে বল্লাম তাকে৷
কিছুটা ক্ষেপে গিয়ে বল্লে, সংসার টা আমায় চালাতে হয়। জ্ঞান দিতে আসিস না। জা নিজের কাজ কর গিয়ে৷ গ্র্যাজুয়েশ্ন তো শেষ একটা পয়সা কামাই করতে পারিস তো না৷ কোথায় সংসারে কিছু কন্ট্রিবিউট করবে তা না। খালি সারাদিন মোবাইল টেপে আর এখন আইছে জ্ঞান দিতে৷ রিকশায় চড় না ক্যান!!!!!!!!! ভাড়া টা তুমি দিও, আমি রিকশায় চরবো। সারাদিন রিকশা থেকে নাম্বোই না। সেই মুরোদ তো নেই। পারো খালি জ্ঞান দিতে৷
আমার চোখে পানি ছলছল করে উঠলো৷ কিছু বলতে পারলাম না। বলবোই বা কি করে??!! আমি জে "বেকার"। এই সংসারে জার টাকা ইনকামের ক্ষমতা নেই তার কিছু বলবারও অধিকার নেই৷
একটা চাপা কান্না নিয়ে আসতে আসতে বাবার হাত থেকে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে বাসায় চলে আসলাম।
সংসারে অবিবাহিত মেয়ে আর বেকার ছেলেদের জ্বালা শুধু তারাই বোঝে৷ ইহলোকের ইহা উপলব্ধি করবার ক্ষমতা থাকে না। প্রতি পদে পদে ইহাদের চরম অপমানিত হইতে হয় এবং ইহারা মরিবার পারে না, তথাপি জগৎ সংসার ইহাদের প্রতি সেকেন্ডে মনে করাইয়া দেয়, ইহাদের বাভিয়া থাকিবার কনো অধিকার নেই৷ অথবা, তারা খাবারের উচ্ছিষ্ট এর মতো৷ নিজের ইচ্ছা টুকু পোষণ না করাই শ্রেয়৷
তবুও আমরা বোবা নই। মুখ ফুটে কান্না বেরিয়ে আসে৷ আমি রুদ্র, পৃথিবীর সকল বেকারের মৃত্যু চাই।