ছোটবেলায় পায়ে চালানো ধান ছাড়ানো মেশিব প্রচুর দেখতাম। তবে সময়ের সাথে সাথে এই মেশিনগুলো হারিয়ে গিয়েছে৷ তার স্থানে দখন করে নিয়েছে ডিজিটাল সব মেশিন। এত সব ডিজিটাল মেশিনের মাঝে আজ হুট করে পায়ে চালানো এই এনালগ মেশিনটা দেখে বের অবাকই হয়েছিলাম৷ ছোটনেলায় গ্রামের বাড়িতে যেদিন এই মেশনটা নিয়ে আসতো ধান ছাড়ানোর জন্য, সেদিন আমাদের জন্য উৎসব উৎসব একটা আমেজ বিরাজ করতো৷ পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই মেশিনের ব্যাবহার একেবারেই কমে গিয়েছে৷
পারিবারিক কাজে গ্রামে গিয়েছিলাম। মোটামুটি সারাদিন গ্রামের ভেতরেই কাটানো হয়েছে৷ গ্রামের এক মাথা থেকে আরেক মাথায় বেশ কয়েকবার যাওয়া আসা করা হয়েছে৷ আজ গ্রামে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল ছোট বোনের আইডি কার্ডের জন্য ফর্ম জমা দেয়া। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই কাজটা করতে পারি নি৷
২০১২ সালের দিকে আমি যখন আমার আইডি কার্ড করেছিলাম, তখন তেমন কোনো ঝামেলা হয় নি৷ নির্দিষ্ট একটা দিনে জন্মনিবন্ধন নিয়ে সবাই কেন্দ্রে চলে গিয়েছিলাম। সেদিনই ছবি তুলে আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে চলে এসেছিলাম। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট কিছুটা ভিন্ন৷ জন্মনিবন্ধন, সার্টিফিকেট, চেয়ারম্যানের সনদ, কর আদায়ের রশিদ, কারেন্ট বিলসহ আরো বেশ কয়েক ধরনের কাগজপত্র লাগে৷ এতসব কাগজপত্র আজকের মাঝে সংগ্রহ করা সম্ভব হয় নি৷ তাই কাজ অসমাপ্ত রেখেই কুমিল্লা ফিরে আসতে হয়েছে৷
আমাদের গ্রামের আইডিকার্ড নিবন্ধনের কাজ চলছে মূলত সেখানকার সরকারী প্রাইমারি স্কুলে৷ স্কুলটা বহু পুরানো৷ স্থাপিত সাল ১৯৪০। এই স্কুলেই আমার বাবা, চাচারা তাদের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা করেছিলেন৷ যদিও স্কুলের পুরানো ভবনটি বহুদিন আগেই পরিত্যাক্ত হয়ে গিয়েছে৷ স্কুলের নতুন ভবনে বর্তমানে তাদের পাঠ কার্যক্রম চলছে। আমি অবশ্য পরিত্যাক্ত পুরানো ভবনের ভেতর ঢুকে বেশ কিছুক্ষণ বসে ছিলাম৷ বসে বসে কল্পনা করছিলাম, এই ভবনগুলোর দেয়ালে দেয়ালে হয়তো আমার বাবার স্পর্শও জড়িয়ে আছে৷ বাবার ছোটবেলার স্মৃতি কেমন ছিল? ইশ, যদি স্মৃতির দেয়ালে সেসব ছবি দেখা যেত, তাহলে মন্দ হত না৷
সারাদিন সবকিছু মিলিয়ে খুব একটা খারাপও কাটে নি৷ এত সুন্দর পরিবেশে হাটাচলা করতে গেলে এমনিতেই মন ভাল হয়ে যায়। তার উপর আবার তীব্র ঠান্ডা বাতাস৷ বাতাসের মাত্রা দেখে মনে হচ্ছিল আজ বৃষ্টি হতে পারে৷ এবং হয়েছিলও। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই তীব্র ঝড়। এই ঝড়ের মাঝেই আমি কুমিল্লা ফিরে এসেছি৷ বৃষ্টির জন্য গাড়ি খুব ধীরগতিতে চলছিল। তাই স্বাভাবিক সময়ের চেয়েও এক ঘন্টা বেশি সময় লেগেছিল আজ৷
বর্ষাকাল আসলেই গ্রামের ছোট ছোট খালগুলোতে এই মাছ ধরার মাছের জাল দেখা যায়। যদিও সারাবছর এগুলো পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে৷ কিন্তু বর্ষাকাল আসলেই সুন্দর করে মেরামত করে আবার ব্যাবহার করা শুরু হয়৷ এই মাচার ভেতরেই থাকা খাওয়া, মাচার ভেতরেই ঘুম৷ এগুলোকে কী নামে ডাকে, জানি না। ভুলে গিয়েছি মনে হয়৷ তবে ছোটবেলায় এগুলোতে প্রচুর মাছ ধরা পড়তে দেখতাম৷ কিন্তু এখন তো বেশিরভাগ খাল বদ্ধ হয়ে গিয়েছে৷ যেগুলো খোলা আছে, সেগুলোতেও পানির প্রবাহ খুব কম৷ তাই খুব বেশি একটা মাছ পাওয়া যায় না৷ তবুও গ্রামের মানুষ তাদের অলস সময় সুন্দর করে কাটাতেই এরকম বাঁশের মাচা তৈরি করে বসে থাকে৷
এধরনের মাচায় ছোটবেলায় আমিও বেশ কয়েকবার রাত কাটিয়েছিলাম। নানু বাড়ির পাশেই ছোট একটা খ ছিল৷ সেখানে আমার এক মামা এরকম মাচা বানাতো প্রতিবার৷? একবার কোনো এক প্রোগ্রামে নানু বাড়ি গিয়েছিলাম। সময়টা ছিল বর্ষাকাল। এরকম কোনো বর্ষার সময়েই উনার মাচার উঠে বসে থাকতাম আমি৷ খারাপ লাগতো না৷ পানির উপর এত ছোট একটা বাসা! দেখতেই সুন্দর লাগতো৷
যায় হোক, সব কিছু মিলিয় বেশ ভালই একটা দিন কেটেছে৷ পারিবারিক কাজে আসলেও সারাদিন ঘুরে ফিরে বিভিন্ন পুরানো স্মৃতি মনে পড়ছিল। গ্রামের মায়া আমাকে কেন যেন বারবার আটকে ফেলে৷ তার মানে এই না যে আমি শহর পছন্দ করি না৷ শহরেরও আলাদা মায়া আছে। দুইটা দুই রকম। গ্রামের মায়াটা হল মাটির, আর শহরের মায়াটা যান্ত্রিক৷ এই দুইটা নিয়েই আমরা বেঁচে থাকি। শহরের জীবনে হাঁপিয়ে উঠলে আমরা গ্রামে ফিরে আসি একটু সুন্দর করে নিশ্বাস নেয়ার আশায়৷ গ্রাম হল আমাদের অক্সিজেন৷ আর শহরকে কার্বনডাই অক্সাইডের সাথে তুলনা করতেই পারি। বিষাক্ত হলেও আমাদের জীবনের সাথে তা ওতপ্রোত ভাবেই জড়িয়ে আছে৷ এই বিষাক্ত জিনিসটা আমাদের জীবন থেকে বাদ দিতে গেলে আমাদের নিজেদেরই অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে...