ঢাকায় লাইফে সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় সম্ভবত ট্রাফিক জ্যাম। ঘন্টার পর ঘন্টা ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে সবকিছুর প্রতি বিতৃষ্ণা চলে এসেছিল। ঢাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার পেছনে এইটা একটা অন্যতম কারণ ছিল। পাশাপাশি আরো অনেক বিষয় তো ছিলই। তবে এতটুকু সত্য যে ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার পর গত দুই বছরে ট্রাফিক জ্যামের এই বিরক্তিকর বিষয়টা একটুর জন্যেও ফেইস করতে হয় নি।
তবে বহুদিন পর এবার ঢাকায় এসে অন্যরকম একটা অনুভূতি পেলাম। যদিও ঢাকার সবকিছু আগের মতই আছে। সেই আগের মতোই জ্যাম। সায়েদাবাদ থেকে উত্তরা যেতে যেতেই আমার প্রায় ৩ ঘন্টার মতো সময় লেগে গিয়েছিল। তবে যে জিনিসটা ভাল লেগেছে, সেটা হল মেট্রোরেল। আধা ঘন্টারও কম সময়ে আমি উত্তরা থেকে আগারগাও চকে যেতে পেরেছিলাম। পুরাই অবিশ্বাস্য একটা বিষয়। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়ে এত দ্রুত কেউ এত লম্বা একটা জার্নি করে ফেলতে পারবে এই ঢাকাতে, তা হয়তো ঢাকাবাসী এর আগে কখনো ভাবতেই পারে নি।
তার উপর আবার এত সুন্দর সবকিছু সাজানো গোছানো পরিবেশ। আমাদের দেশের গতানুগতিক পরিবেশের সাথে একদম আকাশ পাতাল তফাৎ। এতেই প্রমাণিত হয় যে মানুষ চাইলে কী না সম্ভব! কম্পিটারের মাধ্যমে টিকেট কাটা থেকে শুরু করে সবকিছু একদম অসাধারণ। মনে হচ্ছিল যে আরো কয়েকবার মেট্রোরেলে এদিক সেদিক আসা যাওয়া করি। কিন্তু হাতে সময় খুব অল্প থাকায় সেই সুযোগ আর করে উঠতে পারি নি।
মেট্রোরেল সম্ববত এখনোও সবগুলো রুটে চালু হয় নি। আগামীতে হয়তো চালু হবে। তখন আরো বেশি মানুষ উপকৃত হবে। তবে এটাও সত্য যে এক মেট্রোরেল দিয়ে ঢাকা শহরের আংশিক মানুষের সমস্যার সমধান হয়তো হবে৷ কিন্তু বেশিরভাগ মানুষের জীবনে এর কোনো প্রভাব পড়বে না৷ কারণ দিন দিন ঢাকায় আগত মানুষের সংখ্যা বেড়েই চলছে৷ এমনিতেই অধিক জনসংখ্যার চাপ নিয়ে প্রায় বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাওয়া ঢাকা শহরটা আরো বেশি মানুষের চাপ তো কোনো ভাবেই নিতে পারবে না। তাই, ঢাকার রাস্তাঘাটের ট্রাফিক জ্যাম আপাতত সমাধান না হওয়ারই কথা৷ তবে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো কোনো এক জাদুর ছোয়ায় এই সমস্যার সমাধান ঠিকই হয়ে যাবে।
কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এসেছিলাম শুধু একদিনের জন্য অফিসের কাজে। ব্যাক্তিগত কিছু কাজ ছিল, সেসব আর করতে পারি নি সময়ের অভাবে। তবে যেটুকু সময় ছিলাম, বেশ ভালই কেটেছে। সন্ধ্যার দিকে আমরা সবাই মিলে মিরপুরের এক রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম। প্রায় ১২ তলা ভবনের ছাদের উপর তৈরি হওয়া এই রেস্টুরেন্টটা ইদানিং নাকি বেশ ভালই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ছাদের উপর বিভিন্ন রকমের প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম গাছ ও লতাপাতা দিয়ে পুরো জায়গাটা খুব সুন্দর ভাবেই সাজিয়ে নিয়েছে ওরা।
তবে রেস্টুরেন্ট এর এইসব কৃত্রিম ডিজাইনের চেয়েও আমার কাছে বেশি ভাল লেগেছে ১২ তলার উপর থেকে ঢাকা শহরের দিকে তাকিয়ে থাকাটা। একটু নিচেই মেট্রোরেলের স্টেশন। কিছুক্ষণ পর পর একটার পর একটা ট্রেইন আসছে আর চলে যাচ্ছে। তারও নিচে ঢাকার রাজপথ। যেই পথ কখনো ঘুমায় না। গভীর রাতেও শো শো করে একটার পর একটা গাড়ি যার বুকের উপর দিয়ে চলে যায়। অদ্ভুত এই শহরটাকে পাখির চোখে এত উপর থেকে দেখতে কিন্তু বেশ ভালই লাগে।
বিশেষ করে সন্ধ্যার পরের সময়টাতে চারপাশের হরেক রকমের আলোর ভীড়ে ঢাকাকে খুব মায়াবী বলেই মনে হয়। ছোট বেলায় আলিফ লায়লার কথা মনে আছে? থাকারই কথা। রাতের বেলা ঢাকাকে আমার কাছে আলিফ লায়লার কোনো রূপকথার শহর বলেই মনে হয়।
ফেসবুকে আমি একটা গ্রুপে কিছু মাস আগে যুক্ত হয়েছিলাম। ঢাকার চারশো বছরের ইতিহাস কিংবা এরকম কোনো একটা নাম বোধহয় হবে। সেই গ্রুপটাতে প্রাচীন ঢাকার বিভিন্ন সময়ের পুরানো সব ছবি দেখা যায়৷ মাঝে মাঝে অবাক লাগে। সেই পুরানো ছিমছাম প্রায় জনশূন্য ঢাকা আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ শহর হয়ে গিয়েছে, তাই না?
যায় হোক। এবার ঢাকায় খুব অল্ল সময়ের জন্য এসেছিলাম। তবে পরেরবার একটু অতিরিক্ত সময় হাতে নিয়েই আসব। যেন পুরানো সব বন্ধুদের সাথে দেখা করে যেতে পারি। মাঝরাতে ঢাকার অলিতে গলিতে আবারও ঘুরে বেড়াতে পারি।
সেইসব গল্পগুলো কিন্তু এই কমিউনিটিতে আমি শেয়ার করেছিলাম। মাঝে মাঝে সেই লেখাগুলো পড়ি। ভালই লাগে। ভবিষ্যতে হয়তো আবার কখনোও সে ভ্যাগাভন্ড এর জীবব পেয়ে যাবো...