রানীর দিঘীর ওপাড়ে ছায়ার মতো ছোট ছোট যে বিল্ডিংটা দেখা যাচ্ছে, সেটা ভিক্টোরিয়া কলেজ৷ আমার জীবনের দুই বছর এই কলেজেই কাটানো হয়েছে৷ ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ স্থাপত্ত ধাচে তৈরি বিল্ডিংগুলো এখনো সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে৷ পেছনের দিকে অবশ্য নতুন কিছু বিল্ডিং আছে৷ কিন্তু সামনের দিকে, অর্থাৎ প্রধান ফটক থেকে শুরু করে প্রথমের বেশ কিছু বিল্ডিং সেই ব্রিটিশ আমলেই তৈরি করা হয়েছিল।
ছবিতে যে দিঘীটিকে দেখা যাচ্ছে, তার নাম রানীর দিঘী। কলেজের সাথেই এর অবস্থান৷ আগে এখানে একটা নৌকা ছিল। সেই নৌকার সাহায্যে দিঘীর মাঝখানে ভেসে থাকা ময়লা আবর্জনা সরানো হতো৷ আজ কিন্তু সেই নৌকাটা চোখে পড়ছে না। হয়তো সরিয়ে নিয়েছে। কলেজে পড়াকালীন সময় বন্ধুরা মিলে সুযোগ পেলেই এই নৌকায় চড়ে বসতাম। যদিও নৌকা চালাতে পারতাম না, তবুও বৈঠা নিয়ে একটু আধটু চেষ্টা করতাম।
মাঝে মাঝে এই দিঘীতে বন্ধুরা মিলে সাঁতার কাটতাম। বেশ কয়েকবার নিজেরা নিজেরা টুর্নামেন্টেরও আয়োজন করেছিলাম। যদিও কখনো কোনো পুরষ্কার জিততে পারি নি। সেসময় আমি কিছুটা এক্টিভ ছিলাম। তবুও সাঁতার কাটার সময় বেশিক্ষণ শক্তি ধরে রাখতে পারতাম না। অল্পতেই হাপিয়ে যেতাম। বেশিরভাগ সময় এমন হতো যে সাঁতার কাটতে কাটতে মাঝ দীঘিতে এসে ক্লান্ত হয়ে যেতাম। না পারতাম সামনে এগুতে, না পারতাম পেছনে।
দিঘীর পাড়ে এখন সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য কিছু কাজ করা হয়েছে৷ আগে এরকম ছিল না৷ তখন দিঘীর পাড়ে বড় কিছু গাছ ছিল। সেসব গাছের ছায়ায় ছোট ছোট বসার জন্য স্থান ছিল। এখন সেগুলো নেই৷ গাছগুলোও কেটে ফেলা হয়েছে। কলেজের সামনে আসলে আমার মাঝে মাঝে আফসোস হয়। এত সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টা করলেও আমার কাছে আগের রূপটাই বেশি ভাল মনে হয়৷ অন্যদের কী অবস্থা, তা জানি না৷ তবে আমি সবসময় এরকম জোর করে সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টার বিপক্ষে।
এমনিতে ভিক্টোরিয়া কলেজের কান্দিরপাড় শাখার দিকে আমার তেমন একটা যাওয়া হয় না৷ আজ কিছু ব্যাক্তিগত কারণে এখানে যেতে হয়েছিল। বহুদিন পর এখানে এসে তাই পুরানো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল৷
২০১০ সালের কথা। মফস্বল থেকে প্রথমবারের মতো কোনো শহরে থাকতে এসেছিলাম। বান্দরবানের পরিবেশ আর এখানকার পরিবেশ পুরোপুরি আলাদা৷ সবকিছু নতুন আর অদ্ভুত লাগত। মানুষের কথাবার্তা, আচার আচরনের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বেশ কিছু সময়ও লেগেছিল। আর সেবারই প্রথম বাড়ির বাইরে যাওয়া। একা একা থাকা, খাওয়া সবকিছু। পুরো পরিবার বান্দরবানে আর আমি একা কুমিল্লায়। বসে বসে সবসময় পরিবারের সবাইকে মিস করতাম। কারণ জন্মের পর থেকে কখনো পরিবারের বাইরে আলাদা হতে হয় নি।
ধীরে ধীরে নিজেকে সবকিছুর সাথে মানিয়ে নিলাম। দীর্ঘ একটা সময় হোস্টেল আর মেসে কাটিয়ে দিলাম। সবকিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। তখন আর কোনো কিছুতে খারাপ লাগতো না। সময়ের সাথে সাথে পরিবেশ পরিস্থিতি মিলিয়ে মানুষেরও তো পরিবর্তন হয়, তাই না?
যায় হোক, কাজ টাজ শেষ করে টাউনহল চলে গেলাম৷ কুমিল্লায় আমার পছন্দের জায়গাগুলোর মাঝে এটা অন্যতম৷ কুমিল্লার বেশিরভাগ সময় এখানেই আড্ডা মেরে কাটিয়েছি৷ আগে টাউনহলের আশেপাশে চা সিগারেট আর ফুচকা চটপটির দোকান বেশি ছিল৷ এখন নতুন কিছু আইটেমের স্টলও দেখা যাচ্ছে। যেমন চাপঘর। এইটা সবসময় থাকে না। মাঝে মাঝে আসে৷ এর আগে একবার এখান থেকে চাপ খেয়ে গিয়েছিলাম৷ ভালই লেগেছিল। কিন্তু এরপর আর কখনো পাই নি৷ তাই আজ হুট করে চোখের সামনে দেখে চাপের লোভ সামলাতে পারলাম না। দুইটা অর্ডার করে দুইজন মিলে খেয়ে ফেললাম। টেস্ট অতটা খারাপও না। লুচি সহ ৭০ টাকা করে নিল।
যায় হোক, আজকের দিনটা বেশ ভালই গেল৷ কিছু বিষয় নিয়ে চিন্তায় ছিলাম, সেগুলোর সমাধান হল। পাশাপাশি ঘুরাঘুরি, খাওয়া দাওয়াটাও হয়ে গেল। সময়ের অভাবে এখন আর একসাথে সবসময় বের হতে পারি না৷ সে হিসেবে অনেক দিন পরই দুইজনে একসাথে মিলে বের হলাম৷ মন্দ কাটে নি...