আমরা বই পড়ি জ্ঞানের জন্য, রহস্য উন্মোচনের জন্য। কিন্তু সেই বই নিজেই যদি রহস্য তৈরি করে, তাহলে কেমন হবে? বলছিলাম কোডেক্স গিগাজ এর কথ। কোডেক্স গিগাজ ল্যটিন শব্দ, যার অর্থ বিশাল আকৃতির বই। তবে বই এর নাম কোডেক্স গিগাজ হলেও লোকমুখে এটি ডেভিলস বাইবেল বা শয়তানের বাইবেল হিসেবেই বেশি পরিচিত।
বইটির লেখক হারম্যান রিকুলাস, যিনি বোহেমিয়ার (বর্তকান চেক প্রজাতন্ত্র) একটি আশ্রমের একজন সন্ন্যাসী ছিলেন। তেরোশো শতাব্দীর প্রথম দিকে তিনি বইটি লিখেছিলেন। বইটি লেখার পেছনেও অদ্ভুত এক পৌরাণিক ইতিহাসের গল্প পাওয়া যায়।
হারম্যান রিকুলাস একবার আশ্রমের নিয়ম ভঙ্গ করায় কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হয়। শাস্তি হিসেবে তাকে এক বদ্ধ কুঠরিতে আজীবনের জন্য বন্দী করে রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। তবে শাস্তি মওকুফের জন্য তিনি আবেদন করেন। আবেদনের প্রেক্ষিতে তার সাথে নির্মম এক রসিকতা করা হয়। তাকে বলা হয় যে এক রাতের মাঝে এমন এক বই লিখতে হবে, যেখানে তার সারাজীবনের সব অর্জিত জ্ঞান লিপিবদ্ধ থাকবে। বুঝতেই তো পারছেন, এক রাতের মাঝে এমন বই লেখা সম্ভব না।
হারম্যান রিকুলাস তবুও শর্ত মেনে রাজী হলেন। সন্ধ্যায় কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলেন এমন এক বই, যে বই তার জীবন রক্ষা করতে পারবে। কিন্তু নিজের সারাজীবনের সব জ্ঞান হাতড়িয়েও মাঝরাত পর্যন্ত তিনি আধা পৃষ্ঠার বেশি কিছু লিখতে পারেন নি। এই যখন অবস্থা, তখন তিনি লেখালেখি বাদ দিয়ে প্রার্থনায় বসে গেলেন। তবে এই প্রার্থনাটা কিন্তু গতানুগতিক ঈশ্বরের প্রার্থনা না। তিনি বরং এমন একজনের প্রার্থনায় বসলেন, যাকে সারা পৃথিবীর সকল মানুষ ঘৃনা করে। হ্যাঁ, তিনি শয়তানের প্রার্থনা শুরু করলেন।
নিজের রক্ত দিয়ে শয়তানের উপাসনা করার সময় হারম্যান রিকুলাস শপথ নেন, এবারের মতো যদি শয়তান তার জীবন রক্ষা করতে পারে, তবে তিনি তার জীবন শয়তানের প্রতি উৎসর্গ করে দিবেন।
সে রাতে তিনি বিফলে যান নি। শয়তান এসে তাকে সাক্ষাৎ দিয়েছিল। শুধু তাই নয়, বরং নিজেই হারম্যান রিকুলারের আধ পৃষ্ঠার অসম্পূর্ণ লেখাটি সম্পূর্ণ করে দিয়েছিল। আর শেষ পাতায় প্রমাণ হিসেবে নিজের ছবিও অঙ্কন করে রেখে গিয়েছিল।
পরের দিন বই দেখে তো আশ্রমের সবাই পুরোপুরি অবাক। এক রাতে এত বড় বই লেখা কারো পক্ষেই তো সম্ভব না। তার উপর বই পড়ার সময় সবাই একেবারেই হতবাক হয়ে যায়। কি ছিল না সেই বাইবেলে? নতুন ও পুরাতন দুই পূর্নাঙ্গ বাইবেল, চিকিৎসাশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য, বিশ্বকোষ, বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস, ঈশ্বরের বিরুদ্ধচারণ থেকে শুরু করে যাবতীয় সব তথ্যই কোডেক্স গিগাজ বা শয়তানের বাইবেলে উল্লেখ আছে।
বইটির ইতিহাস নিয়ে উপরের গল্পটা শুধুই একটা পৌরাণিক কাহিনী। এর সত্যতা সঠিক ভাবে নির্ধারন করা সম্ভব না। বর্তমান গবেষকদের মতে বইটিতে যে পরিমান শব্দ, লাইন আছে, তা লিখতে একজন মানুষের কমপক্ষে ২০ বছর লাগার কথা।
বর্তমানে এটি সুইডেনের জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত আছে। কোডেক্স গিগাজ বইটি ৩৫ ইঞ্চি লম্বা, ১৯.৭ ইঞ্চি চওড়া, ৮.৬ ইঞ্চি পুরু আর ওজন ৭৫ কেজি। এত বড় একটি বই মধ্যযুগ থেকে এখন পর্যন্ত সংরক্ষিত হয়ে আছে। যদিও বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকবার বইটি বিভিন্ন ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। একবার আগুনে পুড়ে বইটির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, আর কিছু পৃষ্ঠা হারিয়ে গিয়েছিল। হারিয়ে যাওয়া পৃষ্ঠাগুলো আর কখনো খুঁজে পাওয়া যায় নি।
বইটির সঠিক পৃষ্ঠা সংখ্যা কত ছিল, তা জানা যায় নি। তবে বর্তমানে প্রায় ৩২০ টি পৃষ্ঠা পাওয়া যায় এতে। এই পৃষ্ঠাগুলো ভেলামের পাত দিয়ে তৈরি। ভেলাম হলো মধ্যযুগের প্রচলিত এক ধরনের পৃষ্ঠাবিশেষ, যা গরু, বাছুর কিংবা গাঁধার চামড়া দিয়ে তৈরি করা হয়। রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিপিবদ্ধ ও সংরক্ষণ করে রাখার জন্য এধরনের ভেলাম ব্যাবহার করা হতো। দাবি করা হয়, কোডেক্স গিনাজ তৈরিতে ১৬০ টি গাঁধা বা বাছুরের চামড়া ব্যাবহার করা হয়েছিল।
সুইডেনে সংরক্ষিত থাকা কোডেক্স গিনাজ বা ডেভিলস বাইবেল পৃথিবীর অমিমাংসিত রহস্যগুলোর মাঝে অন্যতম একটি রহস্য। যুগ যুগ ধরে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছেন। হয়তো কোনো এক সময় এর রহস্যও খুঁজে বের করা সম্ভব হবে। তার আগ পর্যন্ত এই রহস্য, রহস্যই থেকে যাবে...
Image Source Wikipedia