প্রাচীন বাংলায় বটগাছ নিয়ে নানা রকমের অদ্ভুত ও উদ্ভট সব কল্পকাহিনীর প্রচলন আছে। এসব গল্পের প্রচলন কখন, কিভাবে শুরু হয়েছে, তা আমাদের আনা নেই। তবে লোকমুখে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ঠিকই এসব গল্পগুলো প্রচার হয়ে যায়। একটা সময় আমাদের সমাজ কুসংস্কারে আচ্ছন্ন ছিল, এখনোও যে এর ব্যাতিক্রম, তা নয়। সমাজে প্রচলিত অনেক অদ্ভুত ও উদ্ভট কথা এখনোও আমরা ঠিকই বিশ্বাস করে চলি।
আমাদের সমাজে প্রচলিত কল্পকাহিনী বা বেশিরভাগ কুসংস্কারের সাথে ঘুরে ফিরে ভূত, প্রেত বা জ্বীনের নাম জড়িয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে এখনোও অনেক মানুষ এসব বিশ্বাস করে। পুরানো বাড়ি কিংবা পুরানো বটগাছের নিচে সন্ধ্যা বেলায় যাওয়া বারন। কেন বারন? জ্বীনে ধরতে পারে, তাই। কখনো কাউকে জ্বীনে ধরেছে কিনা জানতে চাইকে বহু উদাহরন পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এর কোনোটাই কেউ কখনো চাক্ষুস দেখেছে কিনা বলতে পারে না। পারার কথাও না।
আমার আগের লেখাতে এমনই একটি পুরানো বটগাছের ছবি শেয়ার করেছিলাম। যদিও বটগাছটির আওঠিক কোনো ইতিহাস আমি কোথাও পাই নি। স্থানীয় কয়েকজনের সাথে কথা বলেও এটি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানতে পারি নি। তবে স্থানীয় এক বৃদ্ধের কাছ থেকে জানতে পারলাম, গাছটির বয়স প্রায় দুইশো বছরেরও বেশি হবে। যেহেতু অনেক পুরানো একটি গাছ, তাই গুগলে হয়তো কোনো ইনফরমেশন পাওয়া যেতে পারে। তাই গুগলেও কিছুক্ষণ ঘাটাঘাটি করলাম।
গুগলে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকটি পুরানো বটগাছ সম্পর্কে তথ্য জানতে পেরেছিলাম। এসব বটগাছগুলোর একেকটার বয়স আনুমানিক ৩০০-৪০০ বছর। কিন্তু আমার শেয়ার করা ছবির বটগাছটি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য জানতে পারলাম না। কসবা এলাকার আরো বেশ কিছু প্রাচীন স্থাপত্য সম্পর্কেও অনেক তথ্য পেয়েছি, কিন্তু আদ্রার সেই পুরানো সুবিশাল বটগাছটি সম্পর্কে একটি আর্টিকেল কিংবা ছবিও কোথাও খুঁজে পেলাম না।
যায় হোক, এর চেয়েও বড় ও পুরানো আরো অনেক বটগাছ আছে এই দেশে, তাই হয়তো এটি তেমন একটা গুরুত্ব কখনোও কোথাও পায় নি। কিন্তু ব্যাক্তিগতভাবে আমার কাছে এর এটি কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর আগে এটি ছাড়া আর কোনো সুবৃহৎ বটগাছ কখনোই আমার চোখে পড়ে নি।
এই বটগাছটির নিচে একসময় পূজা অর্চনা করা হতো, তা স্পষ্ট। এটির গোড়াকে কেন্দ্র করে বেদির মতো করে বৃত্তাকার ঘাট বানিয়ে রাখা হয়েছে। যদিও তার বেশিরভাগ অংশই সময়ের আবর্তনে ভেঙ্গে গিয়েছে।
বট গাছটিকে দূর থেকে দেখে একধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল আমার। কিন্তু কাছে গিয়ে যখন গাছের গায়ে হাত রাখলাম, তখন মুহুর্তের মাঝেই পুরো শরীর জুড়ে একধরনের শীতল অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। সাথে সাথেই হাত সরিয়ে নিলাম। মনে মনে কিছুটা ভয়ও পাচ্ছিলাম। কারণ গ্রামের রাস্তায় হাটতে হাটতে এই গাছটি সম্পর্কে নানা রকমের অদ্ভুত ও উদ্ভট সব কল্পকাহিনী শুনেছিলাম। যদিও ব্যাক্তিগত ভাবে আমি ভূত, প্রেত বিশ্বাস করি না। কিন্তু সে মুহুর্তে হুট করে মনের ভেতর একটু হলেও ভয়ের সৃষ্টি হয়েছিল।
কত কাল ধরে এটি সগৌরবে এই স্থানে দাঁড়িয়ে আছে, সেই ইতিহাস হয়তো এখন কেউ জানে না। কত কালের স্বাক্ষী হিসেবে আজও একাকী এই ছোট গ্রামে বেঁচে আছে, সেই গল্পও হয়তো ঈশ্বর ছাড়া আর কারো পক্ষে জানা সম্ভব না। গাছের গায়ে স্পর্শ করার পর মনের ভেতর অদ্ভুত এক ধরনের শীতল অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছিল। মনে হচ্ছিল যে আমি হুট করে প্রাচীন কোনো সময়ে চলে এসেছি। চোখ বন্ধ করলেই হয়তো কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবো। চোখ বন্ধ করতেও ভয় হচ্ছিল তখন।
বট গাছ মানুষের কোনো যত্ন ছাড়াই বেড়ে উঠতে পারে। শুধু তাই না, যে কোনো ধরনের পরিবেশেই এগুলো বিশাল জায়গা নিয়ে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে। ছোটবেলাত বট গাছের নিচে যেতে ভয় পেতাম। কারণ আমাদের শেখানো হত এসব গাছে জ্বীন ভূতের বসবাস থাকে। আমরা বিশ্বাসও করতাম। কিন্তু এখন আর সেই ধরনের বিশ্বাস নেই।