বাইরে অদ্ভুত সুন্দর ভাবে বৃষ্টি হচ্ছে। গ্রামীন কোনো জনপদে শীতকালীন বৃষ্টি সত্যিই উপভোগ্য। গত কয়েক দিন আকাশে মেঘের ভেলা ভাসতে দেখে মনে হচ্ছিল বৃষ্টি যেন আসতে পারে। দুই দিন যেতে না যেতে ঠান্ডা হিমেল হাওয়ার সাথে সাথে আকাশ থেকে ঝরে পড়লো বৃষ্টি। মুহুর্তের মাঝেই পুরো পরিবেশটা যেন অন্যরকম হয়ে গেল।
আজকের দিনটা আমার জন্য কিছুটা স্পেশাল। জীবনে এই প্রথম সামনের দিকে এগিয়ে যাবার সংকল্প করলাম। এর আগে তো বার বার জীবন থেকে পালাতে চেয়েছি। কিন্তু এবার আর পালাতে ইচ্ছে করছে না। একটা মাত্র জীবন, যদি পালিয়েই কাটাতে হয়, তাহলে পৃথিবীতে আসলাম কেন?
বেশ কয়েকবার পাসপোর্ট করার চিন্তা করলেও কখনো করা হয়ে উঠে নি। দেশের বাইরে যাওয়ার চিন্তা করি নি কখনো। তবে হ্যাঁ, ইন্ডিয়া যাওয়ার প্ল্যান অবশ্য বেশ কয়েকবার করেছিলাম। কোথায় যেন পড়েছিলাম যে কেউ যদি পুরো ইন্ডিয়া ঘুরে দেখতে পারে, তাহলে সে যেন পুরো পৃথিবীকেই দেখে ফেলল। কথাটা কিন্তু মোটেও ভুল না। ইন্ডিয়া যথেষ্ট বড় একটা দেশ। আর তার প্রকৃতিও পাঁচমিশালি। পাহাড়-পর্বত, সমুদ্র, দ্বীপ, মরুভূমি ও বরফের মিলনে অদ্ভুত এই প্রকৃতি আর কোথাও আছে? আছে হয়তো, তবে আমার কাছে ইন্ডিয়াকেই সেরা মনে হয়। যদিও আমি কখনোই কোথাও যাই নি।
যায় হোক, অবশেষে ঠিকই পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করে ফেললাম। যদিও কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য আবেদন করি নি। জীবনকে নতুন কিছু দেয়ার জন্য, বা সবকিছু নতুন করে শুরু করার জন্য ছোট একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। জানি না সে স্বপ্ন বা সিদ্ধান্ত কতটুকু পূরণ হবে। তবে আমার জন্য পুরো বিষয়টা যথেষ্ঠ উত্তেজনাপূর্ণ। কারণ এর আগে কখনো জীবন নিয়ে এত বড় সিদ্ধান্ত নিই নি আমি।
ম্যানেজমেন্ট নিয়ে অনার্স শেষ করার পর মাস্টার্স করার সুযোগ এখনো পাই নি। চাকরির জন্য হন্য হয়ে ঘুরতে হয়েছে শেষ কয়েক বছর ধরে। সরকারি চাকরির সুযোগ সুবিধার কথা তো আমরা সবাই জানি। এক কথায় বলতে গেলে সোনার হরিণ আর কী। অথবা তার চেয়েও বেশি কিছু। কিন্তু সবাই কি আর সেই আরাধ্য সোনার হরিনের দেখা পায়? আমিও পাই নি। মানে এখন পর্যন্ত সেই সোনার হরিনটিকে ছুয়ে দেখার মতো সৌভাগ্য আমার হয় নি।
কিন্তু তাতে কী? জীবন তো আর থেকে থাকে না। সরকারি চাকরি না হওয়া মানে তো আর এই না যে সরকারি চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত বসে বসে অপেক্ষা করা যাবে। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার লড়াইয়ে সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরেও জব খুঁজে যাচ্ছিলাম একটা সময়, এবং পেয়েও গিয়েছিলাম।
আহামরি কোনো চাকরি না, তবে খুব বেশি খারাপও না। কোনো ধরনের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই একটা গার্মেন্টস কোম্পানিতে এসিস্টেন্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে ২০১৯ সালে জয়েন করেছিলাম। খুব অল্প সময়ের মাঝেই সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আরো ভালো কিছু করার স্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু ২০২০ সালে এসে লকডাউনের মারপ্যাঁচে সবকিছু যেন উলট পালট হয়ে গেল। সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে এসে টানা একটা বছর বসে থাকতে হয়েছিল। সেসময়ের পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর ছিল, সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই জানে।
লকডাউনের জন্য বেশিরভাগ প্রাইভেট সেক্টর মুখ থুবরে পড়ছিল একের পর এক। আর বাকিগুলো কর্মী ছাটাই করে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত ছিল। এমতাবস্থায় চাকরি খুঁজে পাওয়াটা যে কারো জন্যই ছিল খুব কঠিন একটা ব্যাপার। চেষ্টা করেও কোথাও সুবিধা করতে পারছিলাম না। কিন্তু চেষ্টা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তার ঠিক এক বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে হালে পানি ফিরে পেলাম। ঢাকার বারিধারায় বেশ ভাল একটা বায়িং হাউজে এসিস্ট্যান্ট মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কাজ করার জন্য সুযোগ পেলাম।
আমার চাকরিজীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় ছিল এটি। এমন না যে স্যালারি অনেক বেশি বা সুযোগ সুবিধা বেশি। কিন্তু কাজ করে খুব ভালো ভাবেই দিন কাটছিল। বিশেষ করে অফিসের সবার সাথে আস্টার্স্ট্যান্ডিংটা খুব ভাল ভাবেই বজায় রাখতে পারছিলাম। কিন্তু এবারও বাঁধ সাধলো লকডাউন। কয়েক মাস চাকরি করার পরই করোনার সেকেন্ড ওয়েভ চলে আসায় বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। আমাদের অফিস অবশ্য বন্ধ হয় নি, তবে কর্মী ছাটাই করা শুরু করে দিল। সেই ছাটাই করা কর্মীদের মাঝে আমিও একজন।
এবার আবারও অথৈ জলে হাবুডুবু খাওয়ার পালা। তবে গত বছরের লকডাউন আগের বারের মতো হয়তো অল্প কিছু দিনেই আবার সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করলো। ছাটাই হবার দুই মাসের মাথায় নতুন একটা কোম্পানি থেকে চাকরির অফার পেলাম। তবে এবার আর এসিস্ট্যান্ট হিসেবে নয়, সরাসরি মার্চেন্ডাইজার হিসেবেই সুযোগ পেলাম। এমন সুযোগ তো সবসময় আসে না, তাই না?
কোনো কিছু না ভেবেই চাকরিতে জয়েন করে ফেললাম। তবে এখানের পরিবেশ কিছুটা আলাদা। আমি জানি যে মার্চেন্ডাইজিং এ, বিশেষ করে গার্মেন্টস সেক্টরটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। জেনে শুনেই তো এখানে জয়েন করেছি, তাই না? কিন্তু চ্যালেঞ্জ এরও তো কিছু ধাপ থাকে। সবকিছু সিস্টেমের মাঝে থাকতে হয়। সিস্টেম না থাকলে কাজ করা সম্ভব?
নতুন অফিসে জয়েন করার পর দায়িত্ব নিয়ে সবকিছু নতুন করে শুরু করার চেষ্টা করলাম। গার্মেন্টস সেক্টরটা অদ্ভুত। বড় বড় গার্মেন্টসগুলোতে অবশ্য সরকারি বিভিন্ন বিধি নিষেধ বা নিয়মগুলো পালন করা হয়। কিন্তু ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলো কোনো ধরনের নিয়ম শৃঙখলার বালাই করে না। প্রশাসনের মনমতো সবকিছু পরিচালনা করা হয়।
একনায়কতন্ত্রী দেশগুলোর অবস্থা কেমন হয়, যেখানে কোনো ধরনের গণতন্ত্র থাকে না? পুরো দেশের ক্ষমতা শুধু একজনের কাছেই থাকে। তিনি যা বলবেন, সেটাই আইন। তিনি সূর্যকে চাঁদ বললে দেশের সবাইকে সেইটাই মেনে নিতে হবে। কোনো ধরনের প্রশ্ন করার সুযোগও থাকবে না। ছোট ছোট গার্মেন্টসগুলোর অবস্থা ঠিক এমনই। এখানে ডিরেক্টর যা বলবেন, সেটাই আইন। এর বাইরে কারো পক্ষে কোনো মতামত দেয়াও সম্ভব না।
প্রথম দিকে আমি ধীরে ধীরে সবকিছু পরিবর্তন করার চেষ্টা করছিলাম। আগের দুই কোম্পানিতে চাকরি করার সুবাদে বেশ কিছু সুন্দর অভিজ্ঞতা হয়েছিল আমার। সেসব অভিজ্ঞতাগুলো নতুন অফিসে প্রয়োগ করার চেষ্টাও করছিলাম। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে সবার সাপোর্ট পেলেও ধীরে ধীরে সেই সাপোর্ট কমতে শুরু করলো এবং সবকিছু আমার বিপক্ষে যাওয়া শুরু করলো।
তবে একটা কথা সত্যি যে, আমি প্রচন্ড রকমের চ্যালেঞ্জ নিতে ভালবাসি। যদিও জীবন থেকে পালানোর চিন্তাটা আমার মাথায় ছোট থেকেই আছে। কিন্তু যখন কিছু করতে যাই, তখন নিজের সর্বোচ্চ শক্তিটুকু দিয়েই সেখান থেকে সফল হওয়ার চেষ্টা করি। এবারও তার ব্যাতিক্রম হয় নি।
কিন্তু সবকিছু করতে গিয়ে নিজেই যেন অসুস্থ হয়ে পড়লাম। একটানা কাজের চাপ, বন্ধ ছাড়া প্রতিদিন ১৪-১৫ ঘন্টা ডিউটি, অনিয়মিত ঘুম, অনিয়মিত খাওয়া দাওয়া, সবকিছু মিলিয়ে আমার শরীর যেন আর কোনো কিছু সহ্য করতেই রাজী হচ্ছিল না। বছরের শুরুতে আমার ওজন যেখানে ৭৪ কেজি ছিল, বছরের শেষে এসে সেই ওজন কমে গিয়ে দাঁড়ালো ৫২ তে।
শেষ পর্যন্ত আর সহ্য করা সম্ভব ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই বিনা বেতনে ১ মাসের ছুটি নিয়ে আমি বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হই। আর এই সিদ্ধান্তটা যে মোটেও ভুল কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, তা বাড়ি আসার কিছুদিনের মাঝেই বুঝতে পারি। পরিবারের সবার সাথে সময় কাটানোর পর এখন আমার মানসিক উন্নতি কিছুটা হলেও হয়েছে। শরীরে যেন আগের মতো জোর ফিরে পাচ্ছি। তাই আপাতত আবার সেই পুরানো জায়গায় ফিরে যেতে মন কোনো ভাবেই সাঁই দিচ্ছে না।
তবে আগের মতো পালিয়ে যেতেও ইচ্ছে করছে না। তাই চিন্তা করলাম এবার ভিন্ন ভাবে নতুন কোনো পন্থায় সবকিছু শুরু করা যাক। আর সেই কারণেই প্রথমবারের মতো পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করে আসলাম আজ। যদিও শুরুতে কিছুটা ভয় পাচ্ছিলাম প্রসেসিং নিয়ে। কারণ বিভিন্ন সময় পত্রিকা, টিভি নিউজ বা পরিচিত মানুষদের কাছ থেকে পাসপোর্ট সংক্রান্ত নানা জটিলতার কথা শুনে আসছি বহুদিন ধরে। কিন্তু আজ নিজে যখন পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করে এলাম, তখন সবকিছু খুব সহজ বলেই মনে হয়েছে।
বিশেষ করে ই-পাসপোর্ট এর জন্য আবেদন করার পুরো প্রক্রিয়াটা এতটাই সহজ যে খুব অল্প সময়ের মাঝেই নিজে নিজে যে কেউ নিজের আবেদনটা করে ফেলতে পারবে। আর ই পাসপোর্ট এর ক্ষেত্রে আগের মতো বিভিন্ন ধরনের ডকুমেন্টস সংগ্রহ করা বা সেগুলো স্বত্তায়িত করার মতো ঝামেলাও নেই। যেহেতু অনলাইনেই সমস্ত ফর্ম পূরণ করা হচ্ছে, তাই অনলাইনেই সরকারি সার্ভার থেকে আপনার দেয়া বেশিরভাগ তথ্য অটোমেটিক্যালিই ভ্যারিফাইড হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টা সহজ ও সুন্দর।
তবে পাসপোর্ট পেতে কতদিন লাগবে জানি না। সবাই বলছে ১ মাসেরও বেশি সময় লাগতে পারে। আমিও ১ মাস সময় ধরে রাখছি। পাসপোর্ট এর ঝামেলা মোটামুটি শেষ আজ। এবার সেকন্ড স্টেজ এ আছি। মাস্টার্স এর জন্য বাইরে আবেদন করতে যাচ্ছি আমি। জানি না কতটুকু সফল হবো। তবে মনের ভেতর কোনো নেগেটিভ কিছু রাখছি না। চেষ্টা করতে তো দোষ নেই, তাই না? এই বছরটা আমি আমার ভবিৎষতের জন্য ইনভেস্ট করতে চাই।