আমরা সবাই জানি যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরের ভূমিকা বিশাল। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল সেক্টরের মাধ্যমে দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। বিশেষে করে মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সেক্টরের অবদান অনস্বীকার্য। যেসব মহিলাদের কোথাও চাকরি করার সুযোগ ছিল না, তারা এই সেক্টরে চাকরি করার সুযোগ পেয়েছে। ফলে নিজেদের অর্থনৈতিক সাবলম্বীতার পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও এরা অসামান্য অবদান রাখার সুযোগ পেয়েছে।
আমার কর্মজীবনের গত তিন বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গার্মেন্টস ক টেক্সটাইল সেক্টরের সাথে যুক্ত ছিলাম আমি। বিশেষ করে গত বছরের প্রায় পুরোটা সময় পুরো একটা প্রজেক্ট নিয়ে গাজীপুরের একটা ফ্যাক্টরিতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। করোনার কারণে ফ্যাক্টরিটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমি এবং আমাদের টিমের দায়িত্ব ছিল অউরো ফ্যাক্টিরিটাকে আবার নতুন করে শুরু করার জন্য। এজন্য শুরু থেকেই আমাদের নতুন নতুন পরিকল্পনা হাতে নিতে হয়েছিল।
শুরুর দিকে সবকিছু ঠিক ঠাক ছিল। আমরা চেয়েছিলাম বায়ারের পরামর্শ মোতাবেক ফ্যাক্টরির পরিবেশ পুরোপুরি চেইঞ্জ করে ফেলা। ফ্যাক্টরির ওয়ার্কাররা যেন কাজ করার জন্য সুন্দর ও নিরাপদ একটি পরিবেশ পায়, সেটা নিশ্চিত করা। সে মোতাবেক কাজও করছিলাম আমরা। কিন্তু শুরুর দিকে ঝামেলা না হলেও ধীরে ধীরে এসব নিয়ে ঝামেলা হওয়া শুরু করে। হেড অফিস থেকে একদিন এসব পরিকল্পনা আপাততর জন্য স্থগিত করার নির্দেশ আসলো। এধরনের নির্দেশ কেন এসেছিল, তার কোনো কারণ উল্লেখ না থাকলেও এতটুকু বুঝেছিলাম যে ম্যানেজমেন্ট এধরনের খাতে অর্থ খরচ করাকে অপচয় মনে করে।
যায় হোক, যেহেতু এই ম্যানেজমেন্ট এর অধীনেই কাজ করি, তাই তাদের সন আদেশ নিষেধ মেনে নিয়ে চলতে বাধ্য আমরা। কিন্তু এই নোটিশের পরপরই কোনো এক অদ্ভুত কারণে ফ্যাক্টরির পরিবেশ পুরোদমে চেইঞ্জ হয়ে যায়। শুরুর দিকে আমার সাথে যারা কাজ করা শুরু করেছিল, তারাও পিছু হাঁটতে বাধ্য হয়। বিষয়টা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। করোনার কারণে কম বেশি সবাই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সবারই অনেকটা সময় লাগার কথা। তাই হুট করে চাকরি হারালে বা চাকরি নিয়ে কোনো সমস্যা হলে যে কেউই বিপদে পড়বে। তাই কেউই আর এই বিষয়গুলো নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চাচ্ছিল না। যেমন ছিল, তেমনই থাক টাইপড একটা চিন্তা সকলের মাঝে ঢুকে গিয়েছিল।
বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টরে ওয়ার্কারদের বেতন নিয়ে টালবাহানা হয়, এইটা আমরা সবাই জানি। যদিও সব ফ্যাক্টিরিতে এমনটা হয় না। কিছু কিছু বড় ও নামকরা ফ্যাক্টরিতে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মাঝেই ব্যাংক একাউন্টে অটোমেটিক বেতন ট্রান্সফার করে দেয়া হয়। যে কোনো প্রতিষ্টানে ওয়ার্কার, স্টাফ বা এমপ্লয়িদের বেতন পরিশোধ করার জন্য এই ব্যাংক ব্যাবস্থা খুব সুন্দর একটা ব্যাবস্থা। ফলে এসব ফ্যাক্টরিতে বেতন নিয়ে তেমন একটা ঝামেলা কখনোই হয় না। বরং সময় বাঁচে সকলের।
(সোর্স: যুগান্তর পত্রিকা)
কিন্তু এসব ফ্যাক্টিরির বাইরে যেসব ফ্যাক্টরি আছে, সেগুলোতে এই ব্যাংক ব্যাবস্থার সুযোগ নেয়া হয় না। আমি প্রথমদিকে বুঝতে পারি নি যে এত সুন্দর ব্যাবস্থা থাকার পরেও এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো কেন এনালগ পদ্ধতিতে এখনো বেতন ও ভাতা পরিশোধ করে। কিন্তু পরে ঠিকই বুঝতে পেরেছিলাম যখন আমি আমাদের ফ্যাক্টরির জন্য এরকম সিস্টেমের প্রস্তাব করেছিলাম। আসলে এরকম ছোট ও মাঝারি মানের ফ্যাক্টরিগুলোতে নিয়মিত বেতন, ভাতা পরিশোধ করা হয় না। নানা রকম অযুহাত দেখিয়ে বেতনের টাকা কেটে রাখা হয়। মাঝে মাঝে দুই এক মাসেরও বেতন আটকিয়ে রাখে যেন ওয়ার্কাররা হুট করে চাকরি ছেড়ে যেতে না পারে। আর যদি কেউ যায়, সেক্ষেত্রে তার পাওনা বেতনের আশা ছেড়েই যেতে হবে।
প্রতি বছর ঢাকা ও গাজীপুরের বিভিন্ন ফ্যাক্টরিতেই এই বেতন নিয়ে ঝামেলার সংবাদ শোনা যায়। বেতনের দাবীতে ওয়ার্কারদের রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নিজেদের পাওনা বেতনের দাবীতে যখন মানুষকে আন্দোলন করতে হয়, তখন সেটা অবশ্যই আমাদের সকলের জন্য লজ্জাজনক।
(সোর্স: ঢাকা টাইমস)
যায় হোক, ম্যানেজমেন্ট এর সাথে আমার প্রথম সরাসরি বিরোধ তৈরি হয় এই বেতনকে কেন্দ্র করেই। আমার অবর্তমানে আন্ডারেইজড একজন ছেলেকে ফ্যাক্টরিতে হেল্পার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। যদিও কারখানায় আন্ডারএইজড কাউকে নিয়োগ দেয়া আইনত নিষিদ্ধ। ৪ দিন ডিউটি করার পর একদিন হুট করে আমার নজরে তা পড়ে। তা দেখে এমনিতেই আমি যথেষ্ঠ বিরক্ত হয়েছিলাম। কারণ একে তো আইনত নিষিদ্ধ, তার উপর যদি বায়ারের চোখে এগুলো ধরা পড়ে, তাহলে পেনাল্টি দিয়ে হবে। তাই স্বাভাবিক ভাবেই নিয়ম অনুসরন করে আমি ছেলেটাকে চাকরি থেকে সরিয়ে দিই এবং চার দিনের ডিউটির টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দিই। কিন্তু আমাদের কোম্পানি কর্তৃক সেই টাকা পরিশোধ করা হয় নি। কিন্তু মানবিকতার খাতিরে আমি ও আমার একজন কলিগ মিলে ব্যাক্তিগত ভাবে ছেলেটাকে তার পাওনা পরিশোধ করে দিই। পরবর্তীতে এটা নিয়ে ম্যানেজমেন্ট এর সাথে আমাদের বাকবিতন্ডাও হয়।
আমরা চেয়েছিলাম একটা সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখার জন্য। কিন্তু কোম্পানি সেটা চাচ্ছিল না। বরং আগের মতোই আর পাঁচটা ছোট ও মাঝারি মানের ফ্যাক্টরির মতোই সবকিছু চালাতে চাচ্ছিল। ফলে আমাদের মাজে আসতে আসতে দূরত্বের তৈরি হতে থাকে।
একটা সময় পর বুঝতে পারলাম, আমরা যে উদ্দেশ্যে এই কোম্পানিতে জয়েন করেছিলাম, সেগুলো সফল হচ্ছে না। উল্টো বায়ারের কাছে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে, তখন আমি কোম্পানি ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যদিও এই সিদ্ধান্ত যখন নিই, তখন কোম্পানির কাছে আমার তিন মাসের বেতন বকেয়া ছিল।
(সোর্স: RMG Bangladesh)
চাকরি ছেড়ে আসার পর আমাকে এক মাসের বেতন পরিশোধ করলেও বাকি দুইমাসের বেতন আমি এখনো পাই নি। আমাকে বলা হয়েছিল ইদের আগেই সমস্ত পরিশোধ করে দেয়া হবে। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতিও উনারা রাখেন নি। ফলে নিতান্তই বাধ্য হয়ে আমাকে পরবর্তী স্টেপ নিতে হয়েছে। শ্রম আইন অনুসারে শ্রম মন্ত্রনালয় বরাবর ইতিমধ্যেই আমি এই বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছি। আশা করি ইদের পরেই আমার সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে শ্রম মন্ত্রনালয় থেকে আমি কোনো জবাব পাবো।
যায় হোক, আমি আসলেও জানি না যে এভাবে এধরনের সমস্যার সমাধান করা যায় কিনা। কিন্তু গার্মেন্টস সেক্টরে এভাবে মানুষের বেতন আটকিয়ে রাখা ও বেতন পরিশোধ না করাটা একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে। যখন আমি কোনো ফ্যাক্টরিতে ভিজিটে যাই, তখন বেশিরভাগ সময়েই এধরনের অভিযোগ শুনে থাকি আমি। আর এবার নিজেই তার ভুক্তভোগী। এসবের বিরুদ্ধে সাধারণত কেউ কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে চায় না। ফলে দিন দিন এই সমস্যাটা বেড়েই চলছে।