নিঃসঙ্গ এক মানুষ, যে কিনা নিঃসঙ্গতার আগুনে দগ্ধ হয়ে নিজেকে শেষ করে দিতেও কার্পণ্য বোধ করছিল না, সে কিনা শেষ মুহুর্তে এসে বেঁচে থাকার এক তীব্র আক্ষেপ নিয়ে হাহাকার করে যাচ্ছে। মাঝখানের এই সময়টুকুতে কিভাবে বদলে গেল তার জীবন? কিভাবেই বা বেঁচে থাকার প্রতি তার এই তীব্র আকর্ষণ তৈরি হল? এটা জানার জন্য হলেও দেখতে হবে "দ্যা ডিভোশন অফ সাস্পেক্ট এক্স।"
নিঃসঙ্গ জীবন যে কতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা আমাদের জানা নেই। পুরো একটা জীবন যারা নিঃসঙ্গ ভাবেই কাটিয়ে দিয়েছেন, শুধুমাত্র তারাই হয়তো এই বেদনাটা বুঝতে পারবেন। উপমহাদেশে আমরা পরিবারের সাথেই আমাদের জীবনটা কাটাতে পরি৷ আমাদের আশেপাশে আত্মীয় স্বজনের কোনো অভাব নেই৷ এদিক দিয়ে আমরা অনেকটাই সুখী। কিন্তু কিছু কিছু দেশে ভিন্ন কোনো চুত্র দেখা যায়। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবার নিয়ে গড়ে উঠা শহরগুলোতে সবাই একলা। সবাই যে যার মতো ব্যাস্ত। এসব ব্যাস্ততা কী সবসময় জীবনে সুখ নিয়ে আনতে পারে?
ছাত্রজীবনে তুখোর এক ছাত্র, বর্তমানে একজন স্কুল শিক্ষক। ম্যাথ তার প্রিয় সাবজেক্ট। ম্যাথ আর স্কুল নিয়েই তার জীবন৷ এর বাইরে আর কিছু নেই, কখনোই ছিল না। ভয়ংকর রকমের নিঃসঙ্গ এই মানুষটার জীবনে হুট করে একদিন বসন্ত এসেছিল। ডিপ্রেশনে ভোগা মানুষটাকে দিয়েছিল নতুন করে বাঁচার আবেদন৷ কিন্তু সবার জীবনে বসন্ত তো চিরজীবন থাকে না। অথচ সেই বসন্তকে টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষটার কী আপ্রান চেষ্টা। কিন্তু তবুও শেষে পর্যন্ত হারিয়ে ফেলতে হয়। শূন্য থেকে শুরু, শূন্যতেই শেষ। মাঝখানে কিছু সময়ের রয়ে যায় রেশ!
বলছিলাম জাপানিজ মুভি Suspect X এর কথা। ২০০৫ সালে প্রকাশিত হওয়া কেইগো হিগাশিনো (Keigo Higashino) এর লেখা বিখ্যাত উপন্যাস The Devotion of Suspect X থেকে অনুপ্রানীত হয়ে এই মুভিটি নির্মিত হয়েছে। পরিচালক হিরোশি নিশিতানি (Hiroshi Nishitani) ২০০৮ সালে এই মুভিটি তৈরি করেছিলেন৷ এই মুভিটি ক্রাইম থ্রিলার জনরার মুভি হলেও মুভিটি এমন কিছু আছে, যা আপনাকে অনেক কিছু ভাবতে শেখাবে৷
আজকে অবশ্য আমি কোনো মুভির রিভিও করতে আসি নি। সাস্পেক্ট এক্স দেখে শেষ করার পর মাথার ভেতর কিছু কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। মূলত সেসব কথাগুলো নিয়েই টুকটাক কিছু ব্যাক্তিগত চিন্তাভাবনা লিখে রাখার জন্য নোটপ্যাড হাতে এই মধ্যরাতে বসে পড়লাম।
মুভি শেষে আপনাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি অনুধাবন করাবে, তা হল সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা৷ একাকীত্ব গভীর যন্ত্রনার এক বিষয়। আমি আমার আগের কোনো এক লেখায় বলেছিলাম আমার নিজের একাকীত্ব পছন্দ৷ আমি একাকী একটা জীবন কাটাতে চাই, যেখানে কোনো মানুষ থাকবে না৷ আমার সেদিনের কথাটা আজ ভুল মনে হচ্ছে। একাকী আমি বেশিদিন এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে পারব না৷ পরিবার কিংবা প্রিয় মানুষ ছাড়া বেঁচে থাকা সম্ভব? বেঁচে থাকার জন্য তো একটা অবলম্বন দরকার, সেটাই যদি না থাকে?
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের "নিঃসঙ্গতার একশো বছর" উপন্যাসটা পড়া হয়েছে কখনো? এই বইটার জন্য লেখক নোবেল পুরষ্কারও পেয়েছিলেন। বইয়ের নামটা শুনেই কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি তৈরি হয় না মনের ভেতর? যেদিন থেকে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম, সেদিন থেকে মনের ভেতর অদ্ভুত এক কারণে ডিপ্রেশনের সূচনা হয়েছিল। এক পাতা, দুই পাতা করে অনেক কষ্টে বইটা শেষ করেছিলাম৷ শেষ করার পর বুকের ভেতর পাথরের মতো কি যেন একটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। এরকম হয় মাঝে মাঝে।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুতুল নাঁচের ইতিকথা বইটা শেষ করার পরেও একই রকমের অনুভূতি তৈরি হয়েছিল৷ আসলে এই গল্পগুলোর মাঝখানটা হয়তো আলাদা, কিন্তু শেষটা ঘুরে ফিরে এক। কাছের প্রিয় মানুষদের হারিয়ে ফেলার যন্ত্রনাটা যে কতটা কঠিন, সেই বিষয়টায় এসব গল্পে উঠে এসেছে৷
নিঃসঙ্গতা নিয়ে লিখতে গেলে নিজেকেও নিঃসঙ্গ বানাতে হবে৷ কিন্তু আমি তো নিঃসঙ্গ না। আমার সবাই আছে৷ নিঃসঙ্গতার যে কষ্ট, যন্ত্রনা, তা আমার লেখায় আসবে না৷ আর সেজন্যই হয়তো লিখতে বসে মাথাটা একেবারেই ব্ল্যাংক হয়ে গিয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও বিশেষ কিছু লিখতে পারছি না। হতাশ লাগছে খুব৷ এধরনের হতাশা অবশ্য এবারই প্রথম না৷ আগে যখন নিয়মিত ব্লগে লেখালেখি করতাম, তখন মাঝে মাঝে রাইটার্স ব্লক হত। কম্পিউটারের সামনে বসে কিবোর্ডে আঙুল রেখে চুপচাপ বসে থাকতাম। একটা শব্দও লিখতে পারতাম না মনমতো৷ এই ব্লক কাটিয়ে উঠার জন্য দূরে কোথাও চলে যেতাম প্রকৃতির মাঝে। কিছুদিন এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে এসে আবার নতুন উদ্যোমে সবকিছু শুরু করতাম।
অনেকদিন পাহাড়ে যাওয়া হয় না৷ ব্যাক্তিগত কিছু কাজে বান্দরবান যেতে হত। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে সুযোগ করে উঠতে পারছি না৷ কিন্তু যাওয়াটা খুব জরুরী৷ কাজের জন্য তো অবশ্যই, পাশাপাশি নিজের মনের খোঁড়াকের জন্য হলেও যেতে হবে।
যায় হোক, আজ আর কথা না বাড়াই৷ যদি বান্দরবান যাওয়া হয়, তাহলে সেসব গল্প তো অবশ্যই সকলের সাথে শেয়ার করব। আর না যাওয়া হলে তো কিছুই করার নেই৷ অপেক্ষার মাত্রাটা শুধু বাড়বেই...