আমার বন্ধু রাসেদ।
বেস কয়েক বছর আগে, আমি আর আমার বন্ধু
ভাবলাম ভ্রমনে যাওয়া উচিত। অন্য কোন দেশে না, আগে নিজের দেশটাই ভালো ভাবে দেখি। যেই ভাবা সেই কাজ, আমাদের পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেলো। শুরু দিনাজপুর থেকে হবে। কারণ দিনাজপুরে আমাদের গ্রামের বাড়ি। এখনো অনেক জায়গা আছে যেগুলা আমাদের দেখা হয় নাই।
প্লানিংয়ের তিনদিন পরেই রেলওয়েতে টিকিট কাটলাম
আমার বন্ধু রাসেদ আমার মামাতো ভাই। বয়স একই হওয়ার কারনে আমাদের বন্ধুত্ব। সেটা যেনতেন বন্ধুত্ব না,,, উদাহরন হিসেবে ব্যাবহার করে আমাদের এলাকার লোকজন।
আমার মামারা থাকে মোহাম্মাদপুরে আর আমি ঢাকায় পড়ালেখা করার সুবাধে থাকতাম হোস্টেলে।
আমার মামা অনেক শক্ত মানুষ, পড়ালেখা বাদ দিয়ে এভাবে ঘুরাঘুরি উনি পচ্ছন্দ করেন না, তাই ওনাকে বলা হইলো বন্ধুর বোনের বিয়ের দাওয়াত খাইতে যাইতেছি।
আমাদের ভ্রমন শুরু হইলো, বাসে করে কমলাপুর স্টেশনে গেলাম। যাওয়ার পরেই শুনলাম ট্রেন আসতে দেরি আছে । আমাদের তখন বয়স কম ভাবলাম ট্রেন যখন আসার তখন আসবে আপাতত একটু এদিক সেদিক ঘুরে দেখি যদি কোন তরুণী থাকে। যার প্রেমে একটু হাবু ডুবু খাওয়া যায়।
কিন্তু যদি পোড়া কপাল হয় আপনার তাহলে সেই ইচ্ছা করে লাভ নাই।
স্টেসনের প্লাটফর্মে ঘুরতেছি কোথাও এমন কাউকে পাইলাম না ।
একটা বাচ্চা মে তার বাবার সাথে বসে আছে হাতে একখানা মোটা বই নিয়ে। ভাবলাম প্রাইমারীর কোন গাইড বই হবে। কিছুক্ষন পর পর মেয়েটি বই খুলতেছে আর কি জানি পড়তেছে। কখনো হাটতেছে আবার কখনো বসে বসে বই পড়ছে। আমরা ভাবলাম এই বয়সে যেভাবে পড়তেছে বড় হয়ে সাক্ষাত ভালো কিছু করবে।
প্লাটফর্মের গোল চত্বরে তারা যেখানে বসেছে আমরা ঠিক তার সামনেই বসলাম।
বসে বসে বাদাম খাওয়া আর সিগারেট ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না। সিগারেট খাওয়ার আগেও বাচ্চা মেয়েটা আমাদের দিকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছিলো।
আমাদের বললে একটু ভুল হবে, আমার মামাতো ভাইয়ের দিকে তাকাচ্ছিলো। চেহারা সুরত আমার থেকে একটু সুন্দর হওয়ার দরুন মেয়ে মানুষের দৃষ্টি তার দিকেই আগে এবং বেসি যায়।
বাচ্চা মেয়ে বলে খুব একটা সিরিয়াস হলাম না আমরা।
হঠাৎ করেই মেয়েটার বইয়ের দিকে চোখ গেলো ।
আমাদের দুইজনের চোখ কপালে উঠে গেলো, এ কি দেখছি আমরা ।। মেয়েটা ভার্সিটি এডমিসন গাইড পড়তেছে। ভাবা যায় এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়ে মনে হইলো সে কিনা ইন্টার লেভেলের ছাত্রী। আমরা দুইজনেই একটু নড়ে চড়ে বসলাম।
অবাক হওয়ার থেকে আমাদের মন ফুর্তিতে ভরে উঠলো সময়টা খারাপ যাবে না ভেবে।
তারপর থেকে রাসেদ আর সেই মেয়ের চোখ দিয়ে প্রেম খেলা চলতেই থাকলো। ইসারা করার সাহস হইলো না মেয়ের বাবাকে দেখে।
এই যুগের গাব্বার সিং বললে ভুল হবে না। লম্বা চওড়া একটা লোক খোচা দাড়ির সাথে মোচটা একটু বড়।
এইভাবে চোখে চোখে প্রেম, হাটা-হাটি, ইসারা ইঙ্গিত করতে করতে কখন রাত গভীর হয়ে গেলো বুঝতেই পারি নাই আমরা।
রাত তখন একটা বাজে।
চট্টগ্রামের ট্রেন আসলো। দেখলাম মেয়েটির বাবা আর ঐ মেয়ে ব্যাগ নিয়ে উঠে পড়লো । কপালটা পোড়া আমাদের একই ট্রেনে যাওয়া হল না।
তবে আমরাও হাল ছাড়ার পাত্র না। আমরাও শাহরুখ খানের ভক্ত,,, মেয়েটি রাসেদের দিকে একবার তাকিয়ে সোজা চলে গেলো।
আমি রাসেদকে বললাম মেয়ে যদি তোকে পচ্ছন্দ করে তাহলে অবস্যই পিছনে ফিরে তাকাবে।
সেই সময়ের পারিপার্সিক অবস্থা দেখে "দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে হাম"
মুভির কথা মনে পড়লো, আর কানের কাছে সেই মুভির মধুর সুর বাজতেছিলো।
মেয়েটি যাচ্ছে,,,,
তাদের বগির দিকে ঠিক ট্রেনে উঠার সময় পিছনে ফিরে তাকাইলো সাথে সুন্দর একটা হাসি। আমরা তারাতারি সেই বগির কাছে গেলাম । দেখলাম তাদের সিট জানালার পাসেই ছিলো। মেয়েটি জানালার পাসে বসে হাত ব্যাগ থেকে কি জানি বাহির করলো আর ওর বাবা অন্য ব্যাগগুলো উপরে উঠিয়ে রাখতেছে। এর মধ্যে মেয়েটি কি জানি লিখলো, তারপর সেই কাগজ আমাদের দিকে ছুড়ে মারলো।
রাসেদ কাগজ উঠাই দেখলো তাতে মোবাইল নাম্বার লেখা।
কাজলের কালি দিয়ে সেই নাম্বার লিখা ছিলো।
ট্রেন যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম মেয়েটার আর রাসেদের অবস্থা দেখে । তাদের দুইজনের চোখেই একটু করে পানি, মনে হচ্ছে জনম জনমের প্রেম তাদের।
কিছুক্ষন পর ট্রেন হুইসেল ছাড়লো আর আস্তে আস্তে ট্রেন যেতে লাগলো। ঐ সময়ের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিলো আমি সিমরানের বাবা আর রাসেদ সিমরান। সে বলে চল আমরা এই ট্রেনে উঠি, দিনাজপুরে অন্য কোনদিন যাবো......
যেই ভাবা সেই কাজ কোন কিছু চিন্তা না করেই উঠে পড়লাম ট্রেনে...
"ঝক ঝক ঝক ট্রেন চলছে
রাত দুপুরে অই
ট্রেন চলছে, ট্রেন চলছে,
ট্রেনের বাড়ি কই?"
- শামসুর রাহমান
ট্রেন চলতে থাকলো সাথে প্রেম ভালোবাসা চলতে থাকলো ডিজিটাল যুগের আবিস্কার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সাথে ভ্রমনের স্বাধ মিটে গেলো......