মেয়েরা সাধারণত সব বাবাদের কাছেই খুব আদরের ও প্রিয় হয়ে থাকে। সত্তর বছর বয়সের জমিল মিয়া নামে এক ব্যাক্তি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার, কসবা উপজেলার জমশেদপুর গ্রামে বসবাস করেন। তিন মেয়ে ও চার ছেলের জনক তিনি। তার সব ছেলেমেয়েরাই যার যার জায়গায় সুপ্রতিষ্ঠিত। ছেলেমেয়েদের সুপ্রতিষ্ঠিত করার পিছনে বাবা হিসেবে তার অবদান অনেক বেশি ছিল।
ছোটবেলায় জমিল মিয়ার বয়স যখন এগারো বছর তখন তার মা মারা যায়। তার এক ছোট-বোনও ছিল। বোনের বয়স ছিল পাঁচ বছর। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবার বাধ্য হয়ে আরেকটি বিয়ে করতে হয়েছিল। দ্বিতীয় বিয়ের পর তার যে নতুন মা আসল সে আগের বৌয়ের সন্তানদের দেখতে পারত না। সারাদিনে তাকে বাড়ির কাজে লাগিয়ে রাখত। লেখাপড়ার প্রতি সে অনেক মনোযোগী ছিল। এমনকি রাতের বেলা বই নিয়ে পড়তে বসলেও বাতি নিভিয়ে দিত। তার উপর নতুন মার অবহেলার মাত্রা দিনকে দিন ক্রমশ বাড়তেই থাকল।
অবশেষে একদিন সে সহ্য করতে না পেরে বুকে অনেক কষ্ট নিয়ে নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে আসতে হয়। ফলে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করার পর আর লেখাপড়া করতে পারল না। সে গ্রাম ছেড়ে শহরের চলে গেলে। সেখানে গিয়ে চায়ের দোকানে কাজ পেল। এমনও অনেক রাত সে না খেয়ে কাটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যাক্তি ছিল। সে মনে প্রাণে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত যে সৎ থাকলে সে একদিন না হয় একদিন সফল হবেই।
তার কাজে-কর্মের মাঝে মানুষ তার সৎব্যাক্তিবান মানুষ খুঁজে পেত। কয়েকবছর চায়ের দুকানে কাজ করার পর সে ভালো একটি চাকরির পেল। সে চাকরির টাকা জমিয়ে সে তার ছোট বোনের বিয়ে দিল এবং তার নিজের পিতৃসম্পত্তি যা কিনা পিতৃসূত্রেই তার পাবার কথা বাবা মারা যাওয়ার পর সেই সম্পত্তি তার ভাইয়ের কাছ থেকে কিনে নিতে হয়েছিল।
আজ তার ছেলেরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। আর তিন মেয়ের সব জামাই নিয়ে ভালো অবস্থানেই আছে। ঈদের ছুটি ব্যতীত মেয়েরা তার বাপের বাড়ি আসতে পারত না। সব মেয়েকেও জমিল মিয়া ভালোবাসত। কিন্তু মেজো মেয়ে নিলিমার সাথে তার একটু বেশি ভাব। মেজো মেয়েও তার বাবাকে খুব ভালোবাসত, যখনই সময় পেত নিলিমা তার বাবার সাথে গল্প করত। জমিল মিয়া তার মেয়ের সাথে তার সব কথা বলত এবং নিমিমাও তার সব কথা তার বাবার সাথে বলত।তাদের একে অন্যের মাঝে খুবই ভালো বুঝা পড়া ছিল।
একদিন রোজার মাসে, যোহরের নামাজ পড়ে বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিতেছিল। হঠাৎ তার স্ত্রীর কাছে ফোন আসে যে এইবার নিলিমা নাকি গ্রামে তার বাবার বাড়িতে ঈদ করার জন্য আজই আসতেছে। এখবর শুনা মাত্রই জমিল মিয়া গায়ে পাঞ্জাবি পড়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে গ্রামের প্রধান সড়কের পাশের একটি চার দোকানে বসে তার মেয়ের আসার জন্য অপেক্ষা করতেছিল।
কিন্তু বিকাল শেষে সন্ধ্যা হয়ে আসল। কিন্তু তার মেয়েকে দেখতে পেল না। জমিল মিয়া মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন না। মাগরিব নামাজ মসজিদে পড়ার পর সে মন খারাপ করে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাটা শুরু করল। ঘরে গিয়ে সে তার মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে গেল। সে তাকে জিজ্ঞাসা করল," তুই কোন সময়, দিক দিয়ে আসলি? আমি ত তর আসার জন্য রাস্তায় দাড়িয়ে ছিলাম।" সে বলল," বাবা, আমি ত বিকালে, রমিজ চাচাদের বাড়ির রাস্তা দিয়ে সর্টকার্টে এসে পড়েছি।"
মেয়েকে কাছে পেয়ে তার বাবা অনেক খুশি হলো এবং রাতের খাবার একসাথে খাওয়া শেষে তারা গল্প করা শুরু করল।