ছেলেটা খুবই চুপচাপ, ভদ্র এবং শান্তশিষ্ট স্বভাবের। নাম তার অর্পণ, বয়স তেরো, সে তার পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য এবং তার একটি বড়বোন আছে যার সাথে সে প্রতি রাতের তার পড়ালেখা শেষ করে, রাতের খাবার সেরে, বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার আগে তার সারাদিনের ঘটে যাওয়া কোনো না কোনো মজাদার ঘটনা তার বোনের সাথে শেয়ার করত, এক কথায় বলতে গেলে তার বড়বোন তার প্রিয় বন্ধুর থেকেও প্রিয়।
সবকিছু ভুলে গেলেও সে তার বোনের সাথে বসে রাতে দশ মিনিট গল্প করতে কখনো ভুলে না এবং এজন্যই তার বোন তাকে খুবই ভালো বুঝে। স্কুলে শিক্ষকদের সামনে তার শান্তশিষ্ট ভাব যেন বেড়ে যায় স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। একদিন তার মা, তার লেখাপড়ার খবর নেওয়ার জন্য তার স্কুলে গেলে, তার শ্রেণি শিক্ষক হতে ছেলের এত প্রশংসা শুনে ত তিনি রীতিমতো অবাকই হয়ে গেছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন বাসায় ত আমি এর মধ্যে এত গুণ লক্ষ্য করি নি, যাইহোক মা হিসেবে তার ছেলের এত প্রশংসা শুনে তিনি নিজে গর্বিত বোধ করলেন।
অর্পণ তার কিছু কিছু বন্ধুদের দেখত যে তারা তার বাবা-মা এবং বড় ভাই-বোন যখন স্কুলে আসত তাদের সাথে দেখা করতে তখন তারা তাদেরকে তুমি বলে সম্মোধন করতে দেখত এবং যখন সে প্রথম প্রথম এসব লক্ষ্য করত তখন সে বড়দেরকে তুমি বলা নিয়ে রীতিমতো অবাকই হত। কিন্তু ধীরে ধীরে সময় যাওয়ার সাথে সাথে বড়দের তুমি বলা শব্দটা শোনার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল। শোনাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছিল কিন্তু বলাতে মোটেও নয়!
তারও খুবই ইচ্ছে করে তুমি বলে ডাকতে, তার কাছে মনে হতো তুমি বলে ডাকলে বুঝি বেশি কাছের মনে হয়। কিন্তু কখনো সাহস হয়ে উঠে নি তার বাবা-মাকে তুমি বলে ডাকবে। কারণ ছোট থেকে তাদের সে আপনি তে সম্মোধন করে অভ্যস্ত। আপনি তে হয়ত তুমি তুলনায় অধিক শ্রদ্ধা এবং সম্মান বিদ্যমান আর এজন্যই হয়ত বেশিরভাগ বাবা-মা তার সন্তানকে বড়দের আপনিতে সম্মোধনে বেশি উৎসাহিত করেন।
একদিন তার এক কাজিন বিদেশ থেকে ছুটিতে দেশে আসলে তার সাথে দেখা হয় এবং প্রথম দেখাতেই যেহেতু তার কাজিন তার থেকে বয়সে বড় তাই সে তাকে আপনি বলে সম্মোধন করল। বেশ ক'দিন যাওয়ার পর কাজিনের সাথে তার ভালো একটা সম্পর্ক হয়ে যায়। কারন তার কাজিন কোনো জায়গায় গেলে তাকেও সাথে করে নিয়ে যেত, একসাথে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যেত।
এতদিন ধরে সে বড়দের তুমি বলার বহু প্রচেষ্টা করার পরও তার কোনোদিন বড়দের তুমি বলে সম্মোধনের সাহস পায় নি। কিন্তু এবার তার মাঝে সে সাহস অল্প অল্প করে জন্মাচ্ছে এবং সে তার কাজিনকে আপনি বলার ফাঁকে ফাঁকে তুমি বলে ফেলত। অবশ্য তার কাজিন অর্পণের মধ্যে এদিকটা লক্ষ্য করেছিল কিন্তু সাথে সাথেই কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে নি।
এরকিছুদিন পর অর্পণ তার কাজিনের সাথে তার আরেকজন কাজিনের বাসায় বেড়াতে গেল এবং যার বাসায় বেড়াতে গেল সেও অর্পণের থেকে বড় কিন্তু তার সাথে যাওয়া কাজিনের থেকে ছোট, তাকে দেখা মাত্রই খুবই ভদ্রতারসহিত কথা বলল এবং তার কাজিনকে আপনি সম্মোধন করল। সেদিন রিকশা দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে তার কাজিন তাকে পরোক্ষভাবে তা বুঝাতে লাগল এবং সে বুঝতে পারল তার ভাই কেন তার সাথে এসব কথা বলছে। কারন সে তার ভাইকে তুমি বলে সম্মোধন করত।
রাতে বাসায় ফিরে অর্পণের মন খারাপ দেখে, তার বোন তাকে কি হয়েছে জিজ্ঞাসা করল! তারপর তার বোনকে সে সবকিছু বুঝিয়ে বলল। আর তা শুনে তার বোন বলল," তোর তাকে তুমি বলে বলা ঠিক হয়ে। এখানে সে কিছুটা তোমার মধ্যে কিছুটা অমায়িক ভাবের অভাব লক্ষ্য করেছে।"
মানুষ অন্যের কাছ থেকে শুধু একটি জিনিসই বেশি প্রত্যাশা করে আর তা হলো অন্যের থেকে সম্মান। আর যেহেতু বাংলা ভাষাতে তুমি, আপনি এবং তুই বলে সম্মোধনের আলাদা অর্থ রয়েছে। যেখানে মনে হবে একটির জায়গায় অন্যটি দিয়ে কাউকে সম্মোধন করলে কাউকে ছোট করা হবে বা কাউকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শনে অপ্রতুল হলে তা না ব্যবহার করাই শ্রেয়।