শৈশবে যেমন অধিকাংশের জীবন বর্ণিল থাকে, হাজারো স্বপ্ন মনের আঙ্গিনায় এসে উঁকি দেয় এবং জীবনে আগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে সেগুলোকে বাস্তবে রুপ দেয়ার মাঝে ঠিক অকৃত্রিম আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় যা সব চাওয়া-পাওয়ার উর্ধ্বে, ঠিক তেমনই একটি চরিত্রের নাম নিলয়। শৈশব থেকেই তার কল্পনার জগতটা বেশ বিস্তৃত ছিল। যখনই তার সামনে একদমই নব্য কোনো জিনিস দৃশ্যমান হতো, সে তা নিয়ে তার বিস্তৃত কল্পনার জগতে ভাবতে ভীষণ পছন্দ করত। যেহেতু সে তখনও বয়সে বেশ নবীন, তার অবলোকন বা দৃষ্টিসীমার মধ্যে অধিকাংশই অজানা ছিল। আর যখনই কোনো নতুন কিছু তার জ্ঞানের সীমার মধ্যে প্রবেশ করত এবং যদি সে জিনিসটি তার একবার ভালো লেগে যেতো, তাহলে দিনের পর দিন তার কেটে যেতো তা ভাবতে ভাবতে।
পড়াশোনায় বেশ মনোযোগী ছিল সে, কখনো কারো বাসায় বেড়াতে গেলে সবার আগে তার চোখ যেতো সে বাড়ির পড়ার টেবিলটিতে। যেখানে তার বয়সীরা অবসরে গল্পগুজব বা লেখাধুলায় ব্যস্ত, সে বইয়ের পাতা উল্টিয়ে অজানা সব তথ্য জানায় ব্যস্ত। একদিন সে জানতে পারে, তার পরিচিত এক বড় ভাই উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানির কোনো এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপে যাওয়ার সুযোগ হয়ে যায়। সবাইকে উচ্ছ্বসিত দেখে তখন সে কিছুটা অনুমান করতে পারে যে হয়ত সে ভালো কোনো একটা অর্জন করেছে। আসলে জিনিসটা তার কাছে একদম নতুন ছিল, একদম অজানা ছিল।
আর তার একটা অভ্যাসই ছিল নতুন কোনো জিনিস পেলে, তা সস্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখা। এবারেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি, সে এব্যাপারে জানার জন্য তার বাবার কাছে প্রশ্ন করে বসে। তার বাবা ছেলের অগাধ কৌতূহল দেখে আর না বলে আর থাকতে পারলেন না। ছেলেকে বুঝিয়ে বললেন কাজিন উচ্চ শিক্ষার জন্য জার্মানিতে পড়ার সুযোগ পেয়েছে। নতুন এক দেশ, নতুন এক জায়গা, নতুন এক পরিবেশ, নতুন এক সংস্কৃতির মানুষের সাথে থাকার এক অন্যরকমের অভিজ্ঞতা, জিনিসটি ভীষণ কৌতূহল জাগায় তখন থেকেই তার মনে। সেও তার বাবাকে সাথে সাথে বলে বসে আমিও একদিন বড় হয়ে উনার মতো অন্য দেশে পাড়ি জমাবো।
স্কুলে যখন কোনো শিক্ষক জিজ্ঞাসা করে তাদের নিজ নিজ স্বপ্নের ব্যাপারে, কেউ কেউ বলে উঠে ডাক্তার হবে, কেউবা ইঞ্জিনিয়ার, কেউবা শিক্ষক কিন্তু যখন তার পালা আসে তার স্বপ্নের কথা শুনে তার সহপাঠীরা ক্ষণিকের জন্য বিষ্মিত হয়ে যেতো। এস্বপ্নকে আগলে তার দিন কাটতে থাকে। এদিকে তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার রেজাল্ট হাতে পাওয়ার পর সে বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য এক এক করে আবেদন করা শুরু করে দেয়। হঠাৎ মালয়েশিয়া একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পছন্দের বিষয় ডিজাইন এন্ড আর্কিটেকচার এর উপর আবেদন গ্রহনযোগ্যতা পায়।
কিন্তু তখন তার পারিবারিক অবস্থা মোটেও সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল না। সে সময়ে তার বাবা চাকরি থেকে অবসরে আসেন, হঠাৎ করে এতো টাকা যোগার করে ছেলেকে বিদেশে পাঠানো তার সাধ্যের বাইরের ছিল বেশ। কিন্তু ছেলের স্বপ্নকে ত আর এতো সহজে অপূর্ণ রাখা যায় না, পূর্ণতা দেয়ার এতো কাছে এসে। তাই অনেক কষ্ট করে টাকা যোগার করে ছেলেকে তার স্বপ্ন পূরণের সুযোগ করে দেন।
সে তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন হতে দেখে ভীষণ খুশি, এভাবে মাস ছয়েক ভালো যেতে থাকে সবকিছু, হঠাৎ তার বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে অর্থনৈতিক সংকটে পরে যায় পুরো পরিবার। এদিকে তার পড়ালেখার ব্যয় বহন করাও অসাধ্য হয়ে পরে। অবশেষে তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন আর ঘটে না, নিজের স্বপ্নকে তুচ্ছ করে পরিবারকে টিকিয়ে রাখার জন্য নিজেই পরিবারে অর্থের যোগান দেয়া শুরু করে। আর এছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিলো না। পরিবারে টিকিয়ে রাখতে নিজের স্বপ্ন বিলিনের দুঃখ, পরিবারকে সহযোগীতার মনোভাবের আত্মতৃপ্তিতে পূরণ করল।