তার পরিবার ছোট্ট একটি অজ পাড়া গ্রামে বাস করে। তার একমাত্র ছেলে আবির সেখানেই থেকে পড়াশোনা করে। তার একটি মেয়েও রয়েছেন। ছেলে এবং মেয়েদের তিনি খুব বেশি ভালোবাসেন। তাদের পড়াশোনা করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন , তিনি তার নিজে থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন তার ছেলেমেয়েকে সকল সুখ পূরণ করে দেওয়ার। গ্রামের অধিকাংশ মানুষই অশিক্ষিত । তিনি নিজেও খুব বেশী পড়াশোনা করেনি। কোন রকম ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ে শুধুমাত্র বাংলা ঠিকঠাক পড়তে পারে। তিনি এটা ভাবেন নিজ গ্রামে ভালো পড়াশোনার কোনো সুযোগ নেই । যার কারণে নিজের ছেলে, আবিরকে পড়াশোনার জন্য শহরে পাঠান। তিনি সব সময় আবিরকে একটা কথাই বলেছেন "আমার ছেলে আবির শিক্ষিত হয়ে সমাজে একটি ভাল অবস্থানে দাঁড়াবে" ।
বাবাকে অশিক্ষার অভিশাপ থেকে মুক্ত করবে। আবির প্রাথমিক শিক্ষার পর থেকেই শহরে অবস্থান করেন। এবং তারপর অনেক চেষ্টা করেন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার । কিন্তু চেষ্টা যখন ব্যর্থ হন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এর হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যায় আবির। আবিরের মতো হোস্টেল আরো অনেক ছেলেরাই ছিল। যাদের পরিবার আবিরের মতোই তাদেরকে নিয়ে স্বপ্ন পূরণের আশায় এখানে পাঠিয়েছেন।
আবিরের স্কুল জীবন এবং কলেজ জীবন হোস্টেলেই পার হয়। কলেজ লাইফে অনেক কঠোর নিয়ম কানুন এর মধ্য দিয়ে আবিরকে যেতে হতো। আবিরের কলেজ লাইফ শেষ হওয়ার পর, আবির এক মুক্তির সন্ধান পেল। তিনি হঠাৎ করেই একদিন আবিরের ফোন পায়। আবির ফোনে বলতে থাকলো:
-বাবা এখানে আমার একা থাকতে খুব অসুবিধে হচ্ছে। আমার ছোট বোন আমাকেও আপনি শহরে পাঠিয়ে দিলে বেশ সুবিধা হবে।
-কিন্তু শহরের তো ভালোই খরচ।
-বাবা তেমন খরচ না , স্বাভাবিক এর মতোই। আমরা একসাথে থাকলে খরচটা আরো কমে যাবে।
আবিরের এমন কথা শুনে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। তিনি চিন্তা করলেন ছোট মেয়েটাকে ও শহরে ভালো কোন জায়গায় ভর্তি করা যাবে । দুই-ভাই বোন একসাথে শহর পড়াশোনা করলে তাদের ভবিষ্যৎ আরো ভালো হবে। তিনি ছোট মেয়েটার কথা চিন্তা করে আবিরকে বলল একটা বাসা ভাড়া নিতে যাতে তারা তিনজন খুব সুন্দর ভাবে থাকতে পারে। এভাবেই শুরু হলো আবিরের শহরের মুক্ত বাতাসের বেড়ে উঠা। আবির এতদিন হোস্টেলে চার দেয়ালের ভেতর থেকে বেশ বিরক্ত। কিন্তু আবির এখন এই মুক্ত শহরে তার বিচরণ শুরু করেন। যত দিন যায় আবিরের দিন দিন নতুন নতুন বন্ধু-বান্ধবের গ্রুপও বেড়ে চলেছে।
এই বয়সে সব ছেলেমেয়েদের একটা আবেগ আসে। হয়তো আসে কারো প্রতি ভালোবাসার। কিন্তু আবিরের আবার ক্ষেত্রে ভালোবাসা টা মানুষের প্রতি না হয়ে চলে যায় বাইকের প্রতি। আবির যে বন্ধুবান্ধবের সাথে মিশে তাদের বেশিরভাগেরই বাইক রয়েছে। যারকারনে আবিরও বাইকের ভালোবাসায় আসক্ত। আবিরের এখন একটাই কথা। নিজের বন্ধুদের বাইক থাকতে পারে , আর আমার কি ইচ্ছে করবে নাহ? না তা হবেনা।
তারপর থেকেই আবির নিজের বাসায় ঝামেলা করতে শুরু করলো। খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়। রাগারাগি করে। নিজের বাবাকে হুমকিও দেয় বাইক কিনে না দিলে সে বাসা ছেড়ে চলে যাবে। আবিরের বাবা ও ছেলের এমন বায়না দেখে সখ পূরণ করার জন্য আবিরকে টাকা পাঠায়। সেই কাঙ্খিত দিন আবিবের জীবনে চলে আসেন নিজের পছন্দের বাইক কিনে ফেলে।
এই বয়সে একেকজন মানুষের নেশা থাকে একেকটার প্রতি। অনেকের থাকে ভালবাসার প্রতি। অনেকের থাকে পড়াশোনা, আবার অনেকের থাকে বন্ধু-বান্ধব ঠিক তেমন টাই আবিরের। বাইক কেনার কিছুদিন পরেই আবির বন্ধুবান্ধবের সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করে। আবির যখন বন্ধুবান্ধবের সাথে সেই স্থানে গিয়ে হাজির হয়। ফিরে আসার সময় আবির খেয়াল করে সকল বন্ধু-বান্ধবের বাইক থাকলেও আবিরের বাইক সেখানে আর নেই। আবির ভাবতে থাকে এটা কি করে সম্ভব। সকলের বাইক আছে আর আমার টা নেই। আবিরের মাথায় কেমন যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। আবির বাড়িতে গিয়ে মাকে বোঝালো তাকে ডাকাত ধরেছিল। যদি বাইক না দিতো তাহলে তাকে মেরে ফেলতো। আবিরের মা নিজের ছেলেকে সুস্থ ভাবে ফিরে পেয়েছেন তাই আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালো।
আবির বাইকের কাগজপত্র নিয়ে চেষ্টা করল পুলিশের কাছে রিপোর্ট করার। পুলিশকে রিপোর্ট করার প্রায় দুই মাস পরে আবির বাইকের ব্যাপারে একটি অবাক করা তথ্য খুঁজে পেল। পুলিশ আবির কে জানালো যে বন্ধুদের সাথে সে পাল্লা দিয়ে বাইক কিনে ছিল। সেই বন্ধুরাই তার বাইক গোপন করার পেছনে দায়ী। আবির এমন কথা শুনে কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারলো না। কিন্তু মুঠোফোনের একটা ভয়েস রেকর্ড আবিরকে দেয়া হলো। যেখানে তার বন্ধুরা তার বাইক চুরি করার একটি প্ল্যান করেছে । আবির নিজের কারণে অনুতপ্ত হচ্ছিল। যে বন্ধুদের কারণে নিজের বাবা মার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছিল সেই বন্ধুরাই মুখোশধারী হলো।