আমি প্রশান্তির খোঁজ করতে ছিলাম, যেখানে আমি পূর্ণ চাঁদের আলো অনুভব করবো। চার দেয়ালে নিজেকে আটকে রেখে হতাশায় ভুগাতে চাইনা। একটা শান্তির জায়গা দরকার, যেখানে আলো প্রবেশ করতে কোনো বাঁধা থাকবে না। কৃত্রিম বাতাস নয়, সেখানে প্রাকৃতিক বাতাসে ভরপুর থাকবে। ইটের চার দেয়ালে বন্দী জীবনের চেয়ে খোলা আকাশের নিচে ভবঘুরের মত বেঁচে থাকা অনেক ভালো। আমি এখন প্রকৃতির খোঁজ করতেছি, যেখানে চোখ বন্ধ করলেই প্রকৃতির সুগন্ধি পাওয়া যাবে। সময়ের ব্যবধানে জীবনে নতুন মোড় নিয়েছে। যেটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। আমরা যতটা কৃত্রিম পরিবেশে থাকতে চেয়েছি, ততটাই পেয়েছি। আমার চারদিকে ঘিরে থাকা বন্দি দেয়ালগুলোও যেন কিছু বলতে চায়। দেয়াল গুলো যেন এখন আমাকে সূর্যের আলোর কাছে নিয়ে যেতে চান। অবাক হয়ে ভাবলাম আমি সবুজের কোন ছোঁয়া পাই না অনেকদিন। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি চারিপাশে কোন সবুজ বা সূর্যের আলো নেই। কিছুক্ষণ পরেই আমার ভাগ্নে এসে আমার আঙ্গুল ধরে বলল,
-ফুপি চলনা বাইরে যাই।
-এখন যাওয়া যাবেনা। বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে দেখ।
আমি এটা বলাতেই আমার ভাগ্নে দৌড়ে চলে গেলো জানালার কাছে, জানালা দিয়ে দেখছে বৃষ্টি। প্রতিদিনই সে বাইরে যেতে চায়, হয় ওর আম্মুর কাছে, না হয় আমার কাছে দৌড়ে আসে বাইরে যাওয়ার জন্য। আমি আর আমার ভাবী দুই জনই কোনো না কোনো অজুহাত দেখিয়ে বলতাম কালকে তোমায় বাইরে নিয়ে যাব। যখন পরেরিদন সকাল হয় তখন আবার একই আবদার নিয়ে আসে। আর আমরাও কোন না কোন অজুহাতে তার এই আবদার ভুলিয়ে দেই। ঈদের পরের দিন বোন আর দুলাভাইকে নিয়ে চলে গেলাম গ্রামের বাড়ি। যেহেতু আমার বোন মাত্র কয়েকদিন আগেই নতুন বাসা নিয়েছে। সেখানে হাজারো কাজ, চারতলায় বাসা আশেপাশে ইটের দেয়াল ছাড়া কিছু দেখা যায় না। আমি ঈদের আগেই চলে যেতাম কিন্তু আপু বলল তাদের সাথেই যেতে, তাই ঈদের পরদিনই গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। ভালোই সময় কাটছিল সেখানে। গ্রামের একটা মিষ্টি গন্ধ যেটা যে কাউকে থাকতে বাধ্য করবে। গ্রামের মানুষ গুলোকে দেখতে অন্যরকম ভাললাগা কাজ করে। গ্রামে গেলে মানুষের অভাব হয়না, আত্মীয়-স্বজন দিয়ে ভরে যায়। সেজন্যই কখনোই আপনার নিজেকে একা মনে হবেনা। আমার ভাগ্নি-ভাগ্নে সবাই বেশ আনন্দে ছিল। কারণ ওরা তিনজনই ছোটবেলা থেকেই একসাথে। যখনই তিনজন একসাথে হয়, দুষ্টুমিতে পুরো ঘর এলোমেলো করে রাখে। বেশিদিন হয়নি আমার মা-বাবা, ভাইয়া-ভাবী সবাই গ্রামে চলে আসে।
আর আমি আমার বোনের সাথে ঢাকাতে থাকি। যার কারণে এখন গ্রামে আসার আনন্দটা দ্বিগুণ হয়ে যায়। খুব বেশিদিন থাকতে পারেনি। দুলাভাইয়ের অফিসের কাজের জন্য, তিনদিন পরেই লকডাউনের মধ্যেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা করি আবার। ঢাকায় আসার সময় ভাগ্নে খুব কান্না করছিল তার ফুফুর সাথে ঢাকায় বেড়াতে আসবে। সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে আসার মুহূর্তে তাদের কেও নিয়ে রওনা হলাম। সবাই একসাথে আসার সময় ভাগ্নে,ভাগ্নি সবাই বেশ আনন্দে ছিলো। দুইদিন হল তারা ঢাকায়। কিন্তু এই চার দেয়ালের মধ্যে তাদের এখন আর ভালো লাগেনা সারাক্ষণই বলে যে বাসার বাইরে যাব, কারণ সূর্যের আলো দেখতে পারে না খেলার জন্য। কোন মাঠ নেই শুধু খেলার জন্য এ কথাটা বললে ভুল হবে স্বস্তি মতো রাস্তায় হাঁটার মতো কোন জায়গা নেই এখানে বাসা থেকে নিচে নামলেই গাড়ির শব্দ আর গাড়ির দেখা যায়। বন্দী শহরে থাকার অভ্যাসটা আমাদের কখনোই ছিল না । ছোটবেলা থেকেই আমরা সবাই গ্রাম্য পরিবেশে বড় হয়েছি। সবুজের সাথে আমাদের সম্পর্কটা ছোটবেলা থেকেই।
ভাগ্নের বাইরে যাওয়ার আবদারের পরেও তাকে বাইরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব না। কারণ আশেপাশেও কোন খোলা জায়গা নেই । যেদিকেই তাকাই ইটের দেয়াল দেখা যায়। আমাদের এখানে আশে পাশের ছোট বাচ্চারা যারা আছে তারাও কংক্রিটের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে। আবার নিজের বাসায় ফিরে যায় সন্ধার আগে । কারণ এখানে চাইলেও কোন খেলা জায়গা নেই, প্রাণ খুলে নিশ্বাঃস নেওয়ার জায়গা নেই। আমি জানালা দিয়ে যখনই বাইরে তাকাই, তখনই ভাবি দেয়ালের ওপাশে মানুষগুলোর কথা। তারা হয়তো বহু বছর ধরেই এমন বন্দি জীবন কাটাচ্ছে, তাদের এই জীবনটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে , হয়তো অভ্যাসের কারণে। একটা সময় মনে হতো এ দেয়ালের মানুষগুলো হয়তো অনেক ভালো থাকে। তাদের অনেক সুখ। তাদের রোদ-বৃষ্টি কোন কিছুই ছুঁতে পারে না। কিন্তু এখন ভাবনা গুলো পাল্টে গেছে। কোন পাখিকে আমরা যখন খাঁচায়বন্দি রাখি তখন সেটা প্রকৃতির খোলা মুক্ত পরিবেশের জন্য ছুটোছুটি করে। সারাক্ষণ খাঁচার ভিতর অপেক্ষা করে কখন সে মুক্ত হবে। আমরা এখন খাঁচায় বন্দী থাকা পাখির মত হয়ে গেছি।