পরীক্ষার আগের রাত।পড়ার মাঝখানে হঠাৎ মাথার মধ্যে কিছু চিন্তা ঘুরাফেরা করতে লাগলো।কাল যে পরীক্ষা, কালকের পরীক্ষায় যদি আমি না পারি তাহলে কি হবে!
মা-বোনের ইচ্ছা ছিলো আমি মেডিকেলে পড়বো।ডাক্তার হব।আব্বা বিদেশ চলে গিয়েছিলো,সেই ছোট বেলায়।তারপর আর তার কোনো খুঁজখবর ছিলো না।
আম্মা অনেক কষ্ট করে তার তিন মেয়েকে পড়ালেখা শিখিয়েছে।কষ্ট করে পড়ালেখা করিয়েছে, বেপারটা হচ্ছে, আমার দাদার অনেক জমিজমা ছিলো,কিন্তু আমার আব্বা আর কাকা সেগুলো বিক্রি করে দিয়ে,টাকা পয়সা সব উড়িয়ে দিয়েছে।
সে হিসাবে আম্মার জন্য তার মেয়েদেরকে পড়ালেখা শিখানোর মতো টাকা-পয়সা ছিলো না।অবশ্য খেয়ে পড়ে চলার মতো অবস্থা ছিলো।আর গ্রামে মেয়েদেরকে পড়ালেখা করানোর বেপারে সহায়তা খুব একটা পাওয়া যায় না।ইন্টারমিডিয়েট এর আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। অনার্স এর সমপর্যায়ে খুব কম মেয়েই যেতে পারে।
তো আমার আম্মার আশা ছিলো,আমার বোনদেরকে অনার্স পড়ানো।তাতে তিনি সফল হয়ছেন।তার জন্য অবশ্য তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।
সে যাই হোক,সেই পরীক্ষার আগের রাতে আমার এইসব কথা মনে পড়তে থাকলো।যে আমার মা তো অনেক কষ্ট করে আমাদের পড়ালেখা করিয়েছেন। এখন তার আশা আমি যাতে মেডিকেলে চান্স পাই।আম্মা বলেন,"বাবারে,টাকাতো অনেকভাবেই উপার্জন করা যায়, কিন্তু মানুষের সম্মান পাওয়া সহজ নয়,সুখে থাকতে হলে মানুষের কাছ থেকে সম্মান পাওয়া বড় প্রভাব ফেলে,যার মাধ্যমে মনের শান্তি পাওয়া যায় "।
তো সেই সম্মান যাতে বাড়ে তার জন্যই আমাকে ডাক্তারি পড়াতে চেয়েছেন।
আম্মার ঐ আশার কথা যতই মনে হচ্ছে, ততোই চিন্তা হচ্ছিল। যাইহোক,মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিলাম।ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম।পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা দুনিয়ার কঠিনতম কাজের মধ্যে একটি।
ফলাফল প্রকাশিত হলো।কিন্তু ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলাম না।আমি শুধু মেডিকেলেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম। আর কোথাও দেয় নি। সুতরাং আমার আম্মা-বোনদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো।এখন আমার কি হবে?এই চিন্তায়।তাদের আশা, নিরাশায় পরিবর্তিত হলো।আম্মার কখনো অসুখ হতে দেখিনি।তিনি কখনো অসুস্থ হননি।কিন্তু, হয়তোবা আমার চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়লেন।প্রেসার বেড়ে গেলো।আমার সামান্য ভর্তি পরীক্ষায় না পাড়ার কারণে,সমস্ত পরিবার নিরাশার সাগরে ডুবে গেলো।
যাই হোক,মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষা দ্বিতীয়বার দেওয়া যায়। আমি তার জন্য প্রস্তুত হতে থাকলাম।একবছর হয়তোবা নষ্ট হবে,তাছাড়া আবার আশা জাগলো।যদি এইবার সুযোগ পাওয়া যায়। তাহলে গতবার চান্স না পাওয়ার দুঃখ ভুলা যাবে।
পড়তে থাকলাম।কিন্তু আশা কে বাঁচিয়ে রাখার যে দায়িত্ব পড়েছে,তা শুধু চাপ দিতো মনের মাঝে।আবারও পরীক্ষার সময় কাছে চলে আসলো।বড্ড দুশ্চিন্তা, ভয় নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পরীক্ষা দিলাম।এইবার না হলে সব শেষ।আশা-ভরসা সব মাটির সাথে মিশে যাবে।কারণ,আর কোথাও পরীক্ষা দেয়নি।আর সুযোগও ছিলো না।
অবশেষে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দিলাম।পরীক্ষা মোটামুটি ভালো হলো।ফলাফল এর জন্য অপেক্ষা। ফলাফল দিলো।কিন্তু প্রথম মেধা তালিকায় জায়গা পেলাম না।অপেক্ষায় ছিলাম।মনে হলো,আবার বজ্রপাত।আশা আবার নিরাশার দাঁড়প্রান্তে।প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি দূরে থাক,এটার নাম নেওয়ার সামর্থ্যই আমাদের নাই।
যাইহোক পনের দিনের মতো অপেক্ষা করতে হয়েছিলো।তারপর সেই সুখবর টা পেলাম।বছরের পর বছর যেটা শুনতে চাচ্ছিলাম।অবশেষে উপরওয়ালার রহমতে সুযোগ পেলাম।সরকারিভাবেই ডাক্তারি পড়ার।
সবার আশা পূরণ হলো।বোনেরা প্রচুর খুশি।ছোট্র একটা কাজের মাধ্যমে নিরাশাকে সমাধি দেওয়া গেছে।ডাক্তারি পড়া শেষ করতে পারি না পারি,ঐটা উপরওয়ালার হাতে।কিন্তু ডাক্তার হওয়ার আশাটা এখন পাকাপোক্ত।এখন আম্মাকে কেউ যখন জিজ্ঞেস করে, আপনার ছেলে কিসে পড়ে।তখন আম্মার চোখে মুখে যে আনন্দ দেখা যায়,তা অকল্পনীয়।আর বলে,"আমার ছেলে ডাক্তারি পড়ে"।
ধন্যবাদ